• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৫
ads
অবহেলায় ঝিমিয়ে পড়ছে পশুবর্জ্য রপ্তানি আয়

ছবি : সংগৃহীত

আমদানি-রফতানি

অবহেলায় ঝিমিয়ে পড়ছে পশুবর্জ্য রপ্তানি আয়

  • আজাদ হোসেন সুমন
  • প্রকাশিত ১৬ আগস্ট ২০১৯

প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আহরিত বর্জ্য বিদেশে রপ্তানি করে চট্টগ্রামের একাধিক প্রতিষ্ঠান। বিদেশের মাটিতে গরুর একটি পেনিসের মূল্য কমপক্ষে ১০ ডলার। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সাপোর্ট, সংরক্ষণাগার ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দিন দিন ঝিমিয়ে পড়ছে সম্ভাবনাময় এ খাত। এ ব্যাপারে প্রায় ৩০ বছর ধরে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম। তিনি দেশের স্বার্থে এ বিষয়ে পৃষ্ঠপোষকতার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বহু চিঠি দিয়েছেন; কিন্তু কোনো জবাব মেলেনি।

জানা গেছে, কোরবানির গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার হাড়, শিং, অণ্ডকোষ, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রথলি, পাকস্থলী ও চর্বি এখন আর ফেলনা নয়। এসব বর্জ্যেই হচ্ছে কোটি টাকার বাণিজ্য। বর্জ্যের মধ্যে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, জাপান ও চীনে গরু-মহিষের পেনিস বা লিঙ্গ অত্যন্ত দামি বস্তু। এ দিয়ে তৈরি স্যুপ ওইসব দেশে খুবই জনপ্রিয় ও দামি খাবার। ব্যবহার করা হয় ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও। এসব দেশে পশুর একেকটি লিঙ্গ ৮-১০ ডলারে বিক্রি হয়। এছাড়া গরু-মহিষের দাঁত ও হাড় থেকে তৈরি হয় ক্যাপসুলের কাভার। প্রতি বছর  কোরবানির সময় এসব বর্জ্য সংগ্রহ করেন ব্যবসায়ীরা। পরে প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করেন। কোরবানির সময়  ফেলে দেওয়া গরু-মহিষের এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ডাস্টবিন থেকে সংগ্রহ করে এক  শ্রেণির শিশুশ্রমিক। পরে তারা নির্দিষ্ট স্থানে বিক্রির জন্য নিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে রবিউল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, অবহেলিত অথচ সম্ভাবনাময় এ খাতটির দিকে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ৩০ বছর ধরে চেষ্টা করছি। বহু চিঠি দিয়েছি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখেছি, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে কোনো সাড়া পাইনি। সাড়া তো দূরের কথা, তারা যদি একবারের জন্য আমাদের কথাগুলো শুনত তাহলে অন্তত সান্ত্বনা পেতাম। পশুর বর্জ্য মানুষ ফেলে দেয়। এর বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে পরিবেশ দূষণ করে এবং মানুষের নানা রোগব্যাধির কারণ হয়। অথচ সরকার এদিকে দৃষ্টি দিলে, পরিকল্পিতভাবে এগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা গেলে এ খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রামভিত্তিক মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান এগুলো খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করে নিজস্ব ব্যাবস্থাপনায় রপ্তানি করে থাকে।

সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা  থেকে তিন টাকা কেজি দরে পশুর হাড়, ৩০-৩৫ টাকা দরে পশুর অণ্ডকোষ, ১২০ টাকা দরে পাকস্থলী, শিং ১০০ টাকা,  চোয়ালের হাড় তিন টাকা কেজি দরে কিনে নেন ব্যবসায়ীরা। টোকাইদের কাছ থেকে কিনে নেন ইসলামবাগের সালাউদ্দিন মিয়া। তিনি গতকাল এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, এটা আমাদের মৌসুমি ব্যবসা। কোরবানির ঈদের সময় মাঠপর্যায় থেকে যারা সংগ্রহ করে তাদের কাছ থেকে আমরা কিনে নিই। পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে রেখে দিই। আমাদের কাছ থেকে ফড়িয়ারা কিনে নিয়ে রপ্তানিকারকের কাছে বিক্রি করে। তিনি আরো বলেন, এসব বর্জ্য একসময় একেবারে ফেলে দেওয়া হতো। এখন সংগ্রহ করে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব বর্জ্যের দাম বিদেশে নাকি অনেক। তিনি আরো বলেন, এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা দরকার। সাধারণ মানুষ এর কিছুই জানে না। ফলে তারা এর কদর না করে তুচ্ছ ভেবে পুকুর ও ডোবা-নালায় ফেলে দেয়। সচেতনতা সৃষ্টি করা গেলে, সরকার এগিয়ে এলে এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করা সম্ভব। আর বাংলাদেশেও এটা একটা শিল্প হিসেবে দাঁড়াবে এবং প্রচুর বেকার লোকের কর্মসংস্থান হবে।

জানা গেছে, গরুর হাড়, শিং, চামড়া, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রনালি, চর্বি, রক্তের মতো বর্জ্যগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা গেলে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্র ২০০ কোটির স্থলে ৫০০ কোটি করা যেত। পশুর বর্জ্যের বড় বাজার হলো থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন ও জাপান।

এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রচার নিশ্চিত করা গেলেই কোরবানির পশুর বর্জ্য হয়ে উঠতে পারে দেশের অর্থনীতির অন্যতম একটি খাত।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর পশুর বর্জ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৭০ কোটি টাকারও  বেশি। আশা করা হচ্ছে, এ বছর এর পরিমাণ ২০০  কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এ বছর কোরবানির পশু  থেকে  দেড়  থেকে দুই হাজার মণ বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। খাওয়ার পর ফেলে দেওয়া হাড় ডাস্টবিনসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহের জন্য কোরবানির সময় অতিরিক্ত শ্রমিক নেওয়া হচ্ছে গত বছর থেকে। এছাড়া চামড়ার বর্জ্য সংগ্রহ করা হবে বিভিন্ন ট্যানারি থেকে। ট্যানারি থেকে পাওয়া উচ্ছিষ্ট চামড়া দিয়ে তৈরি জুতার  সোল ও প্রক্রিয়াজাত করা চামড়ার ফেলে  দেওয়া অংশ থেকে শিরিসকাগজ তৈরি হয়। পশুর রক্ত সংগ্রহের পর তা সিদ্ধ করা হয় এবং শুকিয়ে গুঁড়ো করা হয়। পরে  সেই গুঁড়োর সঙ্গে শুঁটকি মাছ, সয়াবিন তেল ও যব মিশিয়ে তৈরি দানাদার মিশ্রণ ব্যবহার করা হয় মুরগি ও পাখির খাবারের জন্য। পশুর চর্বি দিয়ে তৈরি হয় সাবান। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে এ খাতের ভবিষ্যৎ ভালো। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা গেলে নিঃসন্দেহে ২০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ৫০০ কোটিতে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads