• সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

আমদানি-রফতানি

পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির নানামুখী উদ্যোগ

  • মো. রেজাউর রহিম
  • প্রকাশিত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশের ‘সোনালি আঁশ’-খ্যাত পাট এবং পাটশিল্পের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পাটের কদর থাকায় পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি আরো বাড়ানোর জন্যও নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। এ লক্ষ্যে নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং পাটপণ্যে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, পাট ও পাটজাত পণ্য একসময় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে শীর্ষস্থানীয় থাকলেও বর্তমানে এর অবস্থান তিন নম্বরে। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকায় বিষয়টি নিয়ে সরকারি নীতিনির্ধারক মহল থেকে পণ্যটির রপ্তানি কীভাবে আরো বাড়ানো যায়, সে জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এদিকে পাটের দাম না বাড়লেও উৎপাদন খরচ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যেও  পাট চাষের প্রতি অনীহা  দেখা দিয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাট রপ্তানিতে আয়ের পরিমাণ ১০২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় আয় কমেছে ৮১ কোটি ডলার। ইপিবির তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে কাঁচা পাট রপ্তানি কমেছে ২৭ শতাংশ, আর পাটপণ্য রপ্তানি কমেছে ৩২ শতাংশ।

পাট বপ্তানি বৃদ্ধির সরকারি উদ্যোগ ও পদক্ষেপ প্রসঙ্গে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. বেলায়েত হোসেন বাংলাদেশের খবরকে জানান, পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধিকল্পে পাটপণ্যে আরো বৈচিত্র্য আনার জন্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভারতের অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্কের জন্য পাট রপ্তানিতে সমস্যা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছি এবং বিষয়টি নিয়ে ডিপ্লোম্যাটিক লেভেলে কাজ চলছে। এছাড়া সুদানের কাছে বাংলাদেশের পাট রপ্তানি বাবদ আড়াই হাজার কোটি টাকা এবং ইরাকের কাছে প্রায় ১৭২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানান তিনি। এসব পাওনা আদায়েও কূটনৈতিকভাবে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বস্ত্র ও পাট সচিব বলেন, আজ বৃহস্পতিবার এ বিষয়গুলো নিয়ে ডিপ্লোম্যাটিক কর্মপন্থা নির্ধারণে পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আমরা বৈঠকে বসব।

তিনি আরো বলেন, আফ্রিকার সুদানসহ বেশ কয়েকটি দেশে এবং ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল, চিলি, আর্জেন্টিনাসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশে পাট ও পাটজাত পণ্যের নতুন বাজার সম্প্রসারণে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সরকারের বিভিন্নমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি অনেকাংশে বাড়বে এবং পাটের সুদিন ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন সচিব। এছাড়া পাট উৎপাদনকারী কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পাট কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে রপ্তানিকারকরা বলছেন, উৎপাদন খরচ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি, ভারতের অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্কসহ নানা কারণে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি সংকটের মুখে পড়েছে। এ সংকট উত্তরণে পণ্যে বৈচিত্র্য আনাসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। রপ্তানিকারকরা আরো জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের পাট রপ্তানি কমেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলেও অন্যান্য কারণে চীনসহ কয়েকটি দেশে পাট রপ্তানি কমছে বলে জানান তারা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান বলে জানান রপ্তানিকারকরা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার পাশাপাশি পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন, অধিক পরিমাণে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন, উৎপাদন খরচ কমানো প্রয়োজন। এর পাশাপাশি রপ্তানিবাজার সম্প্রসারণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন জরুরি। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে পাট রপ্তানিসংক্রান্ত বাজার গবেষণা, পরিসংখ্যান ও উন্নয়ন কাউন্সিল গঠন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, পাটপণ্যের বৈচিত্র্যে ঘাটতি, আধুনিক যন্ত্রাংশের স্বল্পতা, নতুন বাজার সম্প্রসারণ না হওয়া এবং দক্ষ জনবলের অভাবে পাট শিল্প দিন দিন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে রপ্তানিবাজারে বাংলাদেশ দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। এজন্য রপ্তানি বাড়াতে পণ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি নতুন বাজার সৃষ্টি জরুরি। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য নতুন বাজার সৃষ্টির প্রচেষ্টা চলছে। এছাড়া রপ্তানি বাড়াতে প্রচলিত রপ্তানি বাজারের পাশাপাশি ভারতের অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্কের বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা চলছে।

বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, নানাবিধ জটিলতাও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ঋণের অপ্রতুলতা, পণ্যের জাহাজীকরণ, পূর্ববর্তী ঋণ, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের পণ্য জাহাজীকরণকৃত বা জাহাজীকরণ পরবর্তী যথাযথ রপ্তানি বিল লেটার অব ক্রেডিটের বিপরীতে ক্রয়ের অর্থ না দেওয়া। এর ফলে রপ্তানিকারক ও পাটকলগুলোকে আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয়। রপ্তানি নীতিমালায় এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অনুসরণ করে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে আরেকটি সম্যস্যা হিসেবে রয়েছে অগ্রিম কর কর্তন। ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ছে এ পণ্যের রপ্তানি।

উল্লেখ্য, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জাপান, কোরিয়া, ইতালি, কানাডা, সৌদি আরব, ইরাকসহ বিশ্বের ৫০টি দেশে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ।  বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি বাড়াতে প্রচলিত বাজারে রপ্তানির পরিমাণ আরো বৃদ্ধির জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান ও সৃষ্টির পাশাপাশি পাটপণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads