• বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬
ads
কর কাঠামোয় বাড়ছে আর্থসামাজিক বৈষম্য

বাড়ছে আর্থসামাজিক বৈষম্য

প্রতীক ছবি

রাজস্ব

কর কাঠামোয় বাড়ছে আর্থসামাজিক বৈষম্য

# পরোক্ষ করে বাড়ছে বৈষম্য # ধনী দরিদ্রের কর সমান # আড়াই কোটি হতদরিদ্রের ওপর করের বোঝা

  • মো. রেজাউর রহিম
  • প্রকাশিত ০১ এপ্রিল ২০১৯

দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। বিদ্যমান কর কাঠামোর কারণে দেশে আর্থসামাজিক বৈষম্য আরো বাড়ছে। বিদ্যমান কর ব্যবস্থায় একজন ধনী এবং দরিদ্র উভয়কেই সমপরিমাণ কর দিতে হচ্ছে। বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেও ধনাঢ্যদের সমান কর দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে নিপীড়নমূলক কর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। দ্রব্য কর, বিক্রয় কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক), আমদানি শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক নামে আমদানি, উৎপাদন, বাজারজাত, ভোগ এবং ব্যবহার পর্যায়ে পরোক্ষভাবে করারোপ হচ্ছে। ধনী-দরিদ্রে বৈষম্য রোধকল্পে বিদ্যমান কর ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেও মনে করেন তারা।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আমদানি পর্যায়ের পণ্য ও কাঁচামাল বন্দরে খালাসের সময় আরোপিত শুল্ক আমদানিকারক পরিশোধ করলেও সংশ্লিষ্ট পণ্যের মূল্যের পরিবর্তন ঘটিয়ে পরে তা পুষিয়ে নিচ্ছে। একইভাবে উৎপাদন, বাজারজাত এবং বিক্রয় পর্যায়ে ধার্যকৃত ভ্যাট উৎপাদক বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার দায়ভার এসে পড়ছে ক্রেতা-ভোক্তা ও ব্যবহারকারীর ওপরই। এটি শুধু কোনো একটি পণ্য বা সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খাদ্য ও বস্ত্রসামগ্রী থেকে শুরু করে বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ধরনের, পণ্য, ভোগ, সেবা এবং বিনোদনের মধ্যেই পরোক্ষ করজালের বিস্তার ঘটেছে। প্রতিবছর বাজেটে এর হ্রাস-বৃদ্ধিও করা হচ্ছে। কিন্তু করহার কত বাড়ালে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার দামস্তর কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে রাজস্ব ব্যবস্থায় কোনো নির্দেশনা রাখা হচ্ছে না। আবার লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আদায়ে চাপাচাপি থাকলেও মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগও তেমন একটা নেই। আর এ সুযোগ নিচ্ছে করপোরেট ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ দৌড়ে মধ্যস্বত্বভোগী ট্রেডাররাও কম যাচ্ছে না। ফলে বাজেট ঘোষণার পরপরই পণ্য ও সেবার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। অন্যদিকে, দেশের বিদ্যমান অর্থনীতির নানা সীমাবদ্ধতার ফলে সবার জন্য কর্মসংস্থানও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। আর যারা কর্মসংস্থানে আছেন তাদের সবার আয়-উপার্জনও সুষমহারে বাড়ছে না। 

সমজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তামূলক যেসব কর্মসূচি রয়েছে তাও পর্যাপ্ত নয় এবং সবার কাছেও যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্ন-আয়ের এবং আড়াই কোটি হতদরিদ্রকে জীবনধারণে প্রতিনিয়ত পণ্য ও সেবা ভোগের জন্য ধনীদের মতো করে তাদেরও প্রকৃত মূল্যের পরোক্ষ করের বোঝা বইতে হচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় সঙ্কোচনের পাশাপাশি বৈষম্যও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামাজিক শ্রেণি কাঠামোতে। এতে শুধু নিম্নবিত্ত নয়, সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ স্তর বলে পরিচিত নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেও ধাক্কা সইতে হচ্ছে। যার প্রভাবে ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে আর্থ-সামাজিক কাঠামো। ধকল সইতে না পেরে সমাজের নিম্ন-মধ্যবিত্তরা দরিদ্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর দরিদ্ররা হতদরিদ্রের বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছে। অর্থ বিল-২০১৮-এর তথ্যমতে, সাবান একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। পণ্যটির স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ধার্য রয়েছে। এ হিসাবে একটি কাপড় কাঁচা সাবানের বাজার মূল্য ২০ টাকা হলে তার ৭ টাকাই যাচ্ছে সরকারের ঘরে। কিন্তু এ কর ব্যবস্থাটি পরোক্ষ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর বাড়তি দামের দায়ভার ক্রেতাকেই নিতে হচ্ছে। অথচ করটি প্রত্যক্ষ হলে এটা ওই সাবান কোম্পানিরই দেওয়ার কথা।

সূত্র জানায়, দেশের মোট রাজস্ব আয়ের ৬৬ শতাংশ আয়ের উৎস হিসাবে বেছে নেওয়া হচ্ছে এই পরোক্ষ করের খাত। তবে আগের তুলনায় আয়কর, করপোরেট কর ও সম্পদ করের মতো প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়লেও তা বিদ্যমান অর্থনীতি ও কর প্রদানে ব্যক্তির সামর্থ্য অনুযায়ী এখনো কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছেনি। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটেও লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আয়ে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ কর বেশি রাখা হয়েছে। এতে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ আগের ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে বর্তমানে ৩৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অথচ আধুনিক কর ব্যবস্থা প্রচলনের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া মোট রাজস্বের ৭৫ শতাংশ ও ভারত ৫৬ শতাংশ প্রত্যক্ষ কর খাত থেকে আহরণ করছে।

জানা গেছে, যে করের আপাত ভার ও চূড়ান্ত ভার করদাতার ওপরই পড়ে তাকে প্রত্যক্ষ কর বলে। আর যেসব করের করঘাত ও করপাত ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে তা হচ্ছে পরোক্ষ কর। অর্থাৎ যার ওপর কর আরোপিত হয় প্রাথমিকভাবে আপাত ভারবহন করলেও করের চূড়ান্ত ভার অন্যের ওপর চেপে বসে। অন্যদিকে আয়কর, সম্পত্তি কর যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপ করা হয় তাকেই চূড়ান্তভাবে তা পরিশোধ করতে হয় বলে সামাজে এটা বৈষম্য দূর ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১১০০ ধরনের পণ্য আমদানি হয়। যেখানে ভ্যাট দিতে হয়। এর বাইরে দেশীয় উৎপাদিত ও বাজারজাতকৃত বেশিরভাগ পণ্যেই ভ্যাট ধার্য রয়েছে। অর্থাৎ দেশে এখন গুটিকয়েক নিত্যপণ্য ছাড়া বাকি সব খাদ্যপণ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার ব্যবহার্য উপকরণ, চিকিৎসাসামগ্রী, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ সব ধরনের ভোগ, সেবা এবং বিনোদনে চেপে আছে পরোক্ষ করের বোঝা। 

এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য করের আওতা তথা কর রাজস্ব বাড়াতে হবে। তবে এর জন্য পরোক্ষ করের তুলনায় প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর ওপরই মনোযোগী হতে হবে। কারণ জনকল্যাণমূলক কোনো রাষ্ট্রে পরোক্ষ কর আদায়ের হার কোনোভাবেই ৫০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। তাহলে সামাজিক কাঠামোর ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কম বা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অসমতা হ্রাস, ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, দরিদ্র্য নিরসন ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আর তা প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে ভ্যাট ও ট্যাক্স আদায়ের বর্তমান কাঠামো পরিবর্তিত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশে আর্থসামাজিক বৈষম্য দূর করতে বিদ্যমান কর ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। আধুনিক ও সময়োপযোগী কর ব্যবস্থা প্রচলন এবং বেশিহারে সক্ষম মানুষকে অর্থাৎ ধনীদের করের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি ধনী শ্রেণির কর ফাঁকি রোধ এবং যাদের ক্ষেত্রে আয়কর প্রযোজ্য-তাদের করের আওতায় আনা। এতে রাজস্ব আদায়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ কমবে। এর মাধ্যমে দেশে ধনী-দারিদ্র্যের মধ্যে বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক বৈষম্য অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলেও মনে করেন তারা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads