• সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
ads
৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পথে বহু চ্যালেঞ্জ

বিশ্বব্যাংক

ছবি : সংগৃহীত

রাজস্ব

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস

৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পথে বহু চ্যালেঞ্জ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৫ এপ্রিল ২০১৯

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে উঠে এসেছে। অবশ্য এবার ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এর এক দিনের মাথায় বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি চাইলে বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে।

জিডিপির আকার ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বাড়ার আভাস দিলেও বিশ্বের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ উঠে আসবে বলে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট শীর্ষক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর রবার্ট জে. শোমের উপস্থিতিতে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সংস্থাটির লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। এতে বলা হয়েছে, মূলত রফতানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির সুবাদে এবার ৭ দশমিক ৩০ প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে। বিশ্বের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হবে পঞ্চম। শীর্ষে থাকা ইথিওপিয়ায় এবার প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। এর বাইরে বাংলাদেশের সামনে থাকা রুয়ান্ডায় ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, ভুটানে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ভারতে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে।

এর আগের দিন প্রকাশিত এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনাকে বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ ছোঁয়াচে রোগ। একে প্রশ্রয় দিলে অন্যরাও সেই সুযোগ চাইবে। খেলাপিদের বার বার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলে অন্যরাও সেটি দাবি করবে। পুনঃতফসিলিকরণ ছোঁয়াচে রোগকে বাড়িয়ে দেয়।

টেকসই প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে খেলাপি ঋণসহ পুরো ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ব্যক্তি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না আসা ও সক্ষমতার তুলনায় রাজস্ব আদায় না হওয়াকেও দায়ী করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তি খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, রাজস্ব আয়ে দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে আসা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় আর্থিক এবং রাজস্ব খাত, অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক বিধিনিয়মের ক্ষেত্রে সংস্কারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।

বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর রবার্ট জে শোম বলেন, চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বর্তমান বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় অর্জন। বিশ্বে যে পাঁচ দেশের জিডিপি সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে সংস্কারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল খাত। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে এ খাতের পরিস্থিতি উন্নত হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সরকারি ব্যাংকগুলোর মালিক হিসেবে কাজ করলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। এতে মেঘ ঘনীভূত হবে। খেলাপি ঋণ ৩ শতাংশ বাড়লে ৬টি ব্যাংক, ৯ শতাংশ বাড়লে ২৯টি ব্যাংক এবং ১৫ শতাংশ বাড়লে ৩৫টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়বে। এছাড়া সর্বোচ্চ বড় তিনজন ঋণ গ্রহণকারী যদি তাদের ব্যবসায় বিপর্যয়ের শিকার হয় তাহলে ২১টি ব্যাংক, ৭ জন ঋণ গ্রহণকারীর ক্ষেত্রে ৩১টি ব্যাংক এবং ১০ জন ঋণ গ্রহণকারীর বিপর্যয় হলে ৩৫টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়বে।

ড. জাহিদ হোসেন আরো বলেন, যারা ঋণখেলাপি তারা কারণ দেখান যে, তাদের ব্যবসায় লস হয়েছে। এক্ষেত্রে যখন লাভ হয় তখন কী হয়? লাভ হলে আমরা, লস হলে তা জনগণের- এই রকম কোনো তন্ত্র তো কোথাও নেই। এটা সুবিধাতন্ত্র। ব্যাংক তো একটি ব্যবসা। যে মুরগি বার বার ডিম দেয় তাকে একবারেই খেয়ে ফেললে হবে না। বার বার পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলে এক সময় দেখা যাবে কোনো ঋণই পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মানবসম্পদে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাতে পারলেই কেবল প্রবৃদ্ধি বাড়বে। এসব কাজ যত দ্রুত করা যাবে তত দ্রুতই প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ধারাবাহিকভাবে ৭ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন অনেক বড় বিষয়। কিন্তু একে ধরে রেখে টেকসসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই চ্যালেঞ্জ। তবে দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশের অর্জনের প্রশংসা করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিদেশি বিনিয়োগও আসছে না প্রত্যাশিত হারে। বিনিয়োগ না হলে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান হবে না। প্রতিষ্ঠান না হলে পুরনো প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মসংস্থান বাড়বে না। এক্ষেত্রে শ্রমনিবিড় শিল্প প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রফতানিপণ্য বহুমুখীকরণ করতে হবে। ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে ডুয়িং বিজনেস পরিবেশ উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপগুলো কার্যকরভবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে রাজস্ব আদায় সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশ। গত ১৬ বছরে রাজস্ব আদায়ে এত কম প্রবৃদ্ধি হয়নি। সমান সক্ষমতার অন্যান্য দেশের তুলনায় রাজস্ব আদায় কম। সক্ষমতার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। অন্যদিকে সক্ষমতা তুলনায়  রাজস্ব আদায়ে ভালো করছে ভারত ও ভিয়েতনাম।

তিনি আরো বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি সংশোধন করে ৮ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে এডিপিতে খরচ বাড়ছে। এক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় বাজেট ঘাটতি বাড়বে। যদিও তা ৫ শতাংশের নিচেই থাকবে। তাছাড়া ঘাটতি অর্থায়ন পূরণে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিলেও সঞ্চয়পত্রের নির্ভরতাও বেড়েছে। তিনি বলেছেন, ভ্যাট আইন কার্যকর হলে রাজস্ব কিছুটা বাড়বে। তাছাড়া আয়কর আইন যুগোপযোগী করা, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে।

ড. জাহিদ জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমছে। এক্ষেত্রে দামের ক্ষেত্রে যেমন সক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যের ক্ষেত্রের সক্ষমতা কমছে। এজন্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads