• সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
ads
খরা কাটছে না ব্যক্তিখাতে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)

রাজস্ব

সরকারের বড় ব্যয়

খরা কাটছে না ব্যক্তিখাতে

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ০৫ এপ্রিল ২০১৯

২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ বিনিয়োগ এসেছিল সরকারের পক্ষ থেকে। চলতি অর্থবছরে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে উন্নীত হচ্ছে বলে দাবি করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ১০ বছরে সরকারের বিনিয়োগ ৩৭ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ১১৯ কোটি টাকায়। সরকারের বিনিয়োগ সাড়ে পাঁচ গুণের বেশি বাড়লেও এ সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাবনা সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।

ব্যক্তিখাতে প্রত্যাশিত হারে বিনিয়োগ না বাড়লেও বছর বছর বাড়ছে জিডিপির আকার। চলতি অর্থবছর বাজারমূল্যে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে জিডিপি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৭ কোটি টাকায় উন্নীত হচ্ছে বলে প্রাথমিক হিসাবে জানিয়েছে বিবিএস। আর স্থিরমূল্যে ১০ লাখ ২২ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে জিডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ১১ লাখ ৫ হাজার ৫১৪ কোটি টাকায়। সব মিলে এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় জিডিপির বাড়তি প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকার বেসরকারি খাতের জন্য পথ তৈরি করে দিয়ে থাকে। এরই অংশ হিসেবে গত কয়েক মাসেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বড় আকারের বেশ কিছু প্রকল্প। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করছে সরকার। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) গলদ রয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় এডিপিতে প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয় না। ফলে ঝুলে থাকা প্রকল্পের ব্যয় বেড়েই চলেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে সরকারি বিনিয়োগের মান বাড়ানোর তাগিদ দেন তারা।

এডিপি ঘিরেই সরকারের বিনিয়োগের বড় অংশ পরিচালিত হয়ে থাকে। আর বাংলাদেশে গুণগত এডিপি বাস্তবায়ন বরাবরই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে থাকে। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়নে ব্যয় হয় ১৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। আর শেষ মাস জুনে ব্যয় হয় ৪৯ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। শেষদিকে বাড়তি ব্যয়ের কারণে কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। আট মাসে বরাদ্দের ৩৯ শতাংশ ব্যয়ের পর বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে এডিপিতে। এ ধারা চলতে থাকলে সরকারি বিনিয়োগের মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০০৯-১০ অর্থবছরে জিডিপির ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ বিনিয়োগ এসেছিল সরকারের পক্ষ থেকে। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে। ২০১১-১২ অর্থবছর জিডিপির ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ, পরের বছর ৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ বিনিয়োগ করেছিল সরকার। ২০১৩-১৪ অর্থবছর সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে এলেও পরের অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৮২ শতাংশে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর সরকারের পক্ষ থেকে জিডিপির ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ, পরের অর্থবছর ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ ২০১৭-১৮ অর্থবছর ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়। এবারই ৭ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে প্রথমবারের মতো জিডিপির ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে উঠছে সরকারি বিনিয়োগ।

সরকারি খাত ধারবাহিকভাবে বাড়লেও প্রত্যাশিত হারে সাড়া দিচ্ছে না ব্যক্তি খাত। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে জিডিপির ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ বিনিয়োগ হলেও পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ দশমিক ১৪ শতাংশে। ২০১১-১২ অর্থবছর জিডিপির সাড়ে ২২ শতাংশ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হলেও পরের অর্থবছর তা ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে আসে। সামান্য বেড়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে ও পরের অর্থবছর ২২ দশমিক ০৭ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশে ও পরের অর্থবছর তা ২৩ দশমিক ১০ শতাংশে উন্নীত হয়। গত অর্থবছর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আসে জিডিপির ২৩ দশমিক ২৬ শতাংশ। নামমাত্র বেড়ে চলতি অর্থবছর তা ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত হচ্ছে।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বর্তমান বিনিয়োগের হার সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে অন্তত জিডিপির ৩৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে। অথচ সরকারি আর বেসরকরি খাত মিলে বিনিয়োগ হচ্ছে ৩১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। তিনি আরো বলেন, সরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি খাতের জন্য পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে না। চলতি বছর বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সাড়ে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ কমছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে বলেও মনে করেন তিনি।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, সরকারি অর্থায়নে অবকাঠামো খাতের বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের উন্নতি হবে। ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ শেষ হলে শিল্পায়নে জমির সঙ্কট কমে আসবে। তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আগামীতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বাড়বে বলেও তিনি মনে করেন।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সিনিয়র গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, চলমান প্রকল্পে অর্থব্যয় সরকারের বিনিয়োগ হিসেবে দেখানো হয়ে থাকে। তবে প্রকল্পের কাজ শেষ না হলে ব্যক্তি খাত এর সুফল পায় না। আবার আগে কম মূল্যে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে একই কাজে সরকারের তহবিলের কয়েকগুণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। এর ফলে সরকারের বিনিয়োগ বাড়লেও সুফল আসছে না। অন্যদিকে অবকাঠামো ছাড়াও বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে পরিবেশের উন্নতি করতে হবে। সুশাসন, দক্ষ জনবল ও বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে না। দীর্ঘমেয়াদে  জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে বেসরকারি খাত এগিয়ে আসবে না বলেও মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads