• সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
ads
বাস্তবায়নে ধীরগতি

ছবি : সংগৃহীত

রাজস্ব

এডিপির প্রকল্প

বাস্তবায়নে ধীরগতি

বড় প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ১৬ এপ্রিল ২০১৯

১৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। ২০১৭ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি এখনো ঝুলে আছে। ৪৫১ কোটি ৪৬ লাখ টাকায় ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করে স্থবির প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে গত অর্থবছর এতে কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। সমান বরাদ্দের বিপরীতে চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের পরিমাণ শূন্য। প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ের অদূরদর্শিতার কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অনেক প্রকল্পই এভাবে ঝুলে আছে। বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকল্পে ধীর গতির জন্য তুলে ধরছেন পৃথক কারণ। বছরের পর বছর ধরে এসব কারণ নিয়ে পর্যালোচনা হলেও সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। ফলে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন থেকে সুফল পেতেও বাড়তি সময় লাগছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) আয়োজিত এক সভার কার্যবিবরণীতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সূত্র জানায়, এডিপির শতভাগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে সব মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার বৈঠক ডাকেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কার্যপত্র সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে জানা গেছে, সরকারি কাজের সুফল যথাসময়ে জনসাধারণের কাছে পৌঁছাতে চলমান প্রকল্প সংশোধন ও মেয়াদ বৃদ্ধি যথাসম্ভব পরিহারের নির্দেশ দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। বিদেশি সহায়তায় চলমান প্রকল্পের শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঋণচুক্তি, দাতাদের অর্থছাড়, অবমুক্তি ও ব্যয়সংক্রান্ত সমস্যায় পরিকল্পনা কমিশন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বাস্তবায়নে শেষের দিকে থাকা ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে থাকা রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সভায় জানানো হয়েছে, মন্ত্রণালয়টির মোট ৩৭ প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ৭৬৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও মাত্র দুটিতে বরাদ্দ রয়েছে ৬২ শতাংশ অর্থ। এর মধ্যে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ও রামু থেকে মিয়ানমার সীমানের ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা ও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ৫ হাজার ৩৩০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে। ৬ হাজার ৭৮০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দের দুই প্রকল্পে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় মন্ত্রণালয়ের সার্বিক অগ্রগতি পিছিয়ে আছে বলে বৈঠকে জানান রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন।

মন্ত্রীর পক্ষ থেকে কারণ জানতে চাইলে সভায় রেল সচিব আরো জানান, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে সহায়তার বিষয়ে চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়েছে বিলম্বে। অন্তত পাঁচটি জেলায় প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হয়েছে। তা ছাড়া ডিজাইন পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্প বিলম্বিত হয়েছে। অন্যদিকে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার ও রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত রেল প্রকল্পেও ভূমি অধিগ্রহণে সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সচিব। বন বিভাগের সঙ্গে জমি সংক্রান্ত জটিলতা ও বিদ্যুতের লাইন স্থানান্তরেও বাড়তি সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ অবস্থায় এডিপি বাস্তবায়নের সার্বিক অগ্রগতি ধরে রাখতে বড় প্রকল্পে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় সভা থেকে।

সভাসূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকা ১০ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের কাছে সভায় কারণ জানতে চেয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান। এর জবাবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সভায় জানান, এনবিআর ভবন নির্মাণ প্রকল্পে জটিলতা থাকায় বরাদ্দ অর্থ যথাসময়ে ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরো জানান, উন্নয়ন প্রকল্পে বিপরীতে পূর্ণকালীন কোনো পরিচালক নেই। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্পে কাজ করছেন। এর ফলে প্রকল্পের কাজ দ্রুত করা সম্ভব হয় না।

সভায় সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিনিধি বিভাগের পক্ষ থেকে জানান, মেট্রোরেল প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের বড় একটা অংশ ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সচিব জানান, প্রকল্পের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় দক্ষ পরিচালকের অপ্রতুলতা রয়েছে। প্রকল্পে গতি আনতে প্রয়োজনে অবসরে থাকা কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি।

সভায় সেতু বিভাগের সচিব জানান, চীনের সঙ্গে প্রকল্প সহায়তার বিষয়ে চুক্তি হলেও যথাসময়ে অর্থছাড় হয় না। ফলে অনেক সময় প্রকল্প বিলম্বিত হয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর এমন পরিস্থিতি এড়াতে তিনি বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাতে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব দেন তিনি।

সাত মাসে সাড়ে ২৩ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করা শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব সভায় জানান, এডিপির আওতায় নেওয়া মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা নেই। জননিরাপত্তা বিভাগের প্রতিনিধি সভায় জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জাতীয় নির্বাচনে ব্যস্ত থাকায় প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সভায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব জানান, ভ্যাকসিনের অভাব, অর্থায়ন সংস্থা জাপানের জাইকার পক্ষ থেকে পরামর্শক নিয়োগে বিলম্ব ও ভারতীয় ঋণ সহায়তায় জটিলতার কারণে প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সভায় পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের প্রধান জানান, অনুমোদনের পর বাস্তবায়নকালে প্রায় সব প্রকল্পই এক বা একাধিকবার সংশোধন করা হয়ে থাকে। এতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সুফল পেতেও বাড়তি সময় লাগে। একান্ত অপরিহার্য না হলে প্রকল্প সংশোধন পরিহার করা আবশ্যক। বিশেষ কারণ ছাড়া প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন এবং ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ বৃদ্ধি পরিহারে ইতোমধ্যেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন অনেকটাই সম্ভাব্য সমীক্ষার ওপর নির্ভরশীল। তিনি প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্য সমীক্ষা পরিচালনার অনুরোধ জানান।

সভায় আইএমইডির সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না করলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে ডিজাইন পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সমস্যা শুরু হয়। তিনি আরো জানান, প্রকল্প নেওয়ার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও মাটির গুণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক সময় ডিজাইন পরিবর্তন করতে হয়। এ অবস্থায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের আরো সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সভায় মন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, এক ব্যক্তিকে একাধিক প্রকল্পে পরিচালক নিয়োগ যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। পরিচালকদের প্রকল্প এলাকায় অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা অবসানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।

প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার এডিপি প্রণয়ন করে সরকার। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। আর প্রকল্প সহায়তা হিসেবে বিদেশি উৎস থেকে বরাদ্দ ছিল ৬০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সম্প্রতি ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। সংশোধিত এডিপিতে সরকারের নিজস্ব তহবিলের ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ও প্রকল্প সহায়তা বাবদ ৫১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। সব মিলে এডিপির আকার কমছে ৮ হাজার কোটি টাকা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads