• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
বাঁচানো গেল না কোলের শিশুটিকে

কুষ্টিয়া শহরে বাসের ধাক্কায় মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত শিশু আফিফা খাতুন গতকাল বৃহস্পতিবার ভোররাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়

ছবি: বাংলাদেশের খবর

দুর্ঘটনা

বাঁচানো গেল না কোলের শিশুটিকে

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৩১ আগস্ট ২০১৮

দুর্ঘটনায় কোনটি মৃত্যু আর কোনটি হত্যা- এ নিয়ে সড়ক আইনকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সরাসরি সড়কমন্ত্রীর কাছে এ প্রশ্নের জবাব চেয়েছেন বাসচাপায় সন্তান হারানো এক বাবা। ‘বাসটিকে থামা অবস্থায় দেখতে পেয়েই তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বাসের সামনে দিয়ে পার হচ্ছিলেন। কিন্তু চালক না দেখেই চালিয়ে দিলেন। তার মানে চালক ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দিয়েছেন। যোগাযোগমন্ত্রী (সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী) বলুক এটি ইচ্ছাকৃত কি না?’- মন্ত্রীর কাছে এ প্রশ্ন রেখেছেন

হতভাগ্য বাবা হারুন অর রশীদ। শুধু তাই নয়, এটা হত্যা কি না তা নিশ্চিত হতে মর্মন্তুদ এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজটিও মন্ত্রীকে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

গত এপ্রিল মাসে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুই বাসের রেষারেষিতে চাপা পড়ে হাত হারিয়ে মারা যাওয়া যুবক রাজীবের মৃত্যুর ঘটনায় চালককে একতরফা দোষ দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। হারুন অর রশীদ বাসের ধাক্কায় মেয়ে হত্যার জন্য গঞ্জেরাজের বাসটির চালক ও সহকারীর বিচার দাবি করেছেন।

গত মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে সন্তান আকিফাকে কোলে নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস মোড় এলাকায় হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছিলেন তার মা রিনা খাতুন। রাস্তার অপর প্রান্তে থেমে থাকা গঞ্জেরাজ নামের একটি বাসের সামনে এলে বাসটি কোনো হর্ন না বাজিয়েই আচমকা মা-সন্তানকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। এতে মায়ের কোল থেকে রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয় শিশু আকিফা। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় রক্তাক্ত মা-মেয়েকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায় জনতা। সেখানে শিশুটির অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ওইদিনই সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। গত বুধবার বেলা ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে শিশু আকিফার অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু রাত থেকে তার অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার  ভোর পৌনে ৫টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শিশুটি।

ওই রাস্তার পাশের একটি জুয়েলারি দোকানের সিসি ক্যামেরায় এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ধারণ হয়। ফুটেজে দেখা যায়, রাজশাহী থেকে ফরিদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে আসা গঞ্জেরাজ পরিবহনের বাসটি রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে যাত্রী তুলছিল চালক। অন্যান্য যানবাহন ওই বাসের পাশ কাটিয়ে সামনে নিয়ে চলে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে রাস্তার উল্টো দিক থেকে শিশু কোলে আসা এক নারীকে দাঁড়িয়ে থাকা ওই বাসের সামনে দিয়ে পার হতে দেখা যায়। ঠিক তখনই বাসটি চলতে শুরু করে এবং ওই নারীকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়।

এই ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ভাইরাল। গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে স্থানীয় বাসিন্দাসহ স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করে। দোষী বাস চালকের শাস্তির দাবিতে ফুঁসে ওঠে স্থানীয় জনতাসহ ওই এলাকার মানুষ।

শিশুটির চাচা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, বাসটি থেমে আছে দেখে আকিফার মা হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছিল। প্রথম ধাক্কার পরও বাচ্চার মা সামলে নিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ধাক্কায় আর হাতে ধরে রাখতে পারেনি। প্রথম ধাক্কা দেওয়ার পর দুর্ঘটনা ঘটে গেছে ভেবে চালক জোরে গাড়ি টান দিয়ে দ্বিতীয় দফার ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন সিদ্দিক।

কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, এরই মধ্যে বাসের মালিক, চালক ও সহকারীর নাম, ঠিকানা, বাসের নম্বর সংগ্রহ করা হয়েছে। শিশুটির পরিবারের সবাই এখনো ঢাকায়। তারা ফিরলে আমরা মামলার প্রক্রিয়া শুরু করব।

আইন পাসের পরও সড়কে চাপাপড়া লাশের মিছিল

গত ৬ আগস্ট ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ অনুমোদন দেয় মন্ত্রিপরিষদ। সেই আইনেও চালকদের শাস্তির ধরন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। দুর্ঘটনায় কোনটি মৃত্যু আর কোনটি হত্যা তা নিয়ে আইনে ধোঁয়াশা আছে বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। প্রশ্ন ওঠে হত্যাকাণ্ড প্রমাণে থানা-পুলিশসহ অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও।

গত ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলায় জাবালে নূর পরিবহনের তিনটি বাসের রেষারেষিতে একটির চাপায় নিহত হয় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া ও করিম। এর প্রতিবাদে চালকের বিচার ও নৌপরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবিতে দেশ জুড়ে আন্দোলনে নামে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এ সময় চালকদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সহজে লাইসেন্স পাওয়ার বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। এ আন্দোলনের মধ্যেই গত ৫ আগস্ট রাজধানীর মগবাজারে এসপি গোল্ডেন লাইন বাসের চাপায় নিহত হন মোটরসাইকেল আরোহী মেডিকেল কর্মী সাইফুল ইসলাম রানা। এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন মেডিকেলের শিক্ষার্থী।

পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সড়ক পরিবহন আইন সংস্কার ও অনুমোদনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ওই আইনে দায়ী চালকদের যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে জনমনে।

অনুমোদিত আইনটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই গত ২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের সিটি গেটসংলগ্ন কালীরহাট এলাকায় ভাড়া নিয়ে বিতণ্ডার জেরে রেজাউল করিম রনি নামে এক যুবককে নিউমার্কেটগামী ৪ নম্বর রুটের সিটি সার্ভিস বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর তাকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলে চালক। পরে যাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে চালক ও তার সহকারী দুজনেই পালিয়ে যায়। একই দিন দুপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার ধূল্লী এলাকায় এমএম লাভলী পরিবহনের বাসের চাপায় নিহত হন পুলিশ কনস্টেবল আতাব আলী (৪৫)।

এছাড়া গত ১৭ মে রাজধানীর মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে বাসের ধাক্কায় নিহত হন ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ নাজিম উদ্দিন। একই দিন ভোরে রাজধানীর উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে বিজিবি মার্কেটের সামনে বাসের ধাক্কায় নিহত হন জাকির নামে এক যুবক। গত ২৮ এপ্রিল বিকালে যাত্রাবাড়ীর দোলাইরপাড় এলাকায় হানিফ ফ্লাইওভারের ঢালে ক্ষিপ্ত হয়ে রাসেল সরকার নামে প্রাইভেটকার চালককে বাসচাপা দেয় গ্রিন লাইন পরিবহেনর চালক। ফলে ওই যুবকের বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রসঙ্গত, নৌপরিবহনমন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান ২০১১ সালে বলেছিলেন, রাস্তায় নেমে গরু-ছাগল চিনতে পারলেই তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া যাবে। শুধু বিবেচনাতেই ২৪ হাজার চালককে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল ওই সময়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads