• সোমবার, ১৮ মার্চ ২০১৯, ৪ চৈত্র ১৪২৪
ads
রাসায়নিকে বাড়ে ভয়াবহতা

রাসায়নিকে বাড়ে আগুন

ছবি : সংগৃহীত

দুর্ঘটনা

চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি

রাসায়নিকে বাড়ে ভয়াবহতা

  • রানা হানিফ
  • প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সরকারি হিসাবে ৬৮ জনে। গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। তবে আগুনের উৎপত্তি ও উৎস নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। তবে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত যে কারণই হোক না কেন ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে সেখানকার রাসায়নিক দ্রব্যকে। ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গঠিত তদন্ত কমিটি সেখানে রাসায়নিক দ্রব্য মজুত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দাহ্য রাসায়নিক দ্রব্য থেকে অগ্নিকাণ্ড এমন ঘটনা ও অভিজ্ঞতা ‘চুড়িহাট্টার’ ট্রাজিডির মাধ্যমেই প্রথম নয়। ২০১০ সালে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দেশের অগ্নিনির্বাপন সংস্থা বা ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর বড় অভিজ্ঞতা হয়ে রয়েছে। সেখানে ‘হেরিটেজ’ বা ঐতিহ্য ঘোষিত জনপদে দ্বিতীয়বার এমন ঘটনা ঘটায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমত রাজধানীর ‘হেরিটেজ’ ঘোষিত জনপদের মধ্যে কিভাবে রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম থাকে সেটাই আশ্চার্যজনক বিষয়। এতে প্রমাণিত হয় হেরিটেজ ঘোষণার মাধ্যমেই সব দায় শেষ করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর বা সংস্থা। পরবর্তীতে তা তদারকি বা রক্ষার বিষয়ে কোনো কার্যক্রম থাকলে চকবাজারের মত পুরান ঢাকার কোনো এলাকাতেই ঝূঁকিপূর্ণ কিছু থাকতে পারে না।

তারা বলছেন, হেরিটেজ অঞ্চল হওয়ার পরও ২০১০ সালের নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকা্লের পর তদন্ত কমিটি যেসব সুপারিশ করেছিলো সেগুলোও বাস্তবায়ন করা হয়নি। ৯ বছরেও পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের কারখানা কেরাণীগঞ্জের রাসায়নিক পল্লীতে স্থানান্তর করতে পারেনি সরকার।

রাসায়নিক বাড়িয়েছে ক্ষয়ক্ষতি : রাসায়নিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরান ঢাকার চকবাজার, নিমতলী এলাকায় মূলত পারফিউমিনারি জাতীয় রাসায়নিকের কারখানা ও রাসায়নিক দ্রব্যে গুদাম গড়ে উঠেছে। এসব রাসায়নিক দ্রব্যের অধিকাংশই হল রেকটিফাইট স্পিরিট জাতীয় দাহ্য পদার্থ। আর দ্রুত বাতাসে মিশে যেতে সক্ষম এসব রাসায়নিক পদার্থ এতোটায় দাহ্য যে তা ১৫৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। যেখানে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটন্ত পানি যে কোনো প্রাণীর প্রাণনাশের জন্য যথেষ্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশের খবরকে বলেন, পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায় যেসব কেমিক্যাল কারখানা ও গোডাউন রয়েছে তার অধিকাংশই হল তরল রিকটিফাইট স্পিরিট জাতীয় পদার্থ। এই পদার্থগুলো এতটাই দাহ্য যে, আমরা পরীক্ষাগারে এগুলো বুনসেন বার্নারে ব্যবহার করি কাচের মত শক্ত পদার্থকে তাপ দিয়ে নরম করার জন্য। স্বাভাবিকভাবে এসব বুনসেন বার্নারে ১৫৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা পাওয়া যায়। আর সেখানে এমন পদার্থে গোডাউনে বা কারখানায় আগুন লাগলে সে তাপমাত্রা ১৬০০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে। আর এসব পদার্থ যেমন দাহ্য তেমন উদ্বায়ী। দ্রুত তা বাতাসে মিশে গিয়ে দাহ্য গ্যাসে পরিণত হতে পারে।

তিনি বলেন, ২০১০ সালে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ড আর এবারের চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আগুনের উৎস ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতি ও ভয়াবহতা একই রকম ছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ঘটনাস্থলের শুধু ভবন বা কোনো অবকাঠামোতে আগুন ছিল না, সেখানকার বাতাসেও আগুন লতে দেখা গেছে।

তিনি বলেন, মানুষ কিংবা যেকোনো প্রাণীির প্রাণনাশের জন্য ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটন্ত গরম পানিই যথেষ্ট। আর সেখানে প্রায় ১৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকলে মানুষ না যে কোনো কিছু পুড়ে ভ হতে তাতে আগুন লাগাবার প্রয়োজন নেই মাইক্রোওভেনে যেভাবে পোড়ানো হয় তেমনটিই ঘটেছে।

৯ বছরেও সরেনি রাসায়নিক কারখানা : ২০১০ সালের ৩ জুন ছোট কাটরার নিমতলী এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন নিহত হয়। তদন্তে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পেছনে সেখানকার রাসায়নিক পদার্থে কারখানা ও গুদামকে দায়ী করে ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বাধীন কমিটি। কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনে পুরান ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য আবাসিক এলাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এমন শিল্পকে আলাদা অঞ্চলে স্থানান্তরেরও সুপারিশ করে। ঘটনার পরপর কয়েক মাস ধরে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, বিএসটিআইসহ সরকারের বেশ কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু কারখানা ও গুদাম সেখান থেকে উচ্ছেদ করে। পাশাপাশি শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত কেরানীগঞ্জের বিসিক এলাকায় কেমিক্যাল পল্লীতে সব রাসায়নিক কারখানা ও গোডাউন স্থানান্তরের জন্য সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়। প্রথমে ৬ মাসের মধ্যে স্থানান্তরের কথা থাকলেও কেমিকল ব্যবসায়ীরা প্লট বুঝে না পাওয়া ও অবকাঠামো তৈরিতে সময় লাগার বিষয়টি সামনে আনলে তা এক বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে গত নয় বছরেও এসব ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প সরাতে সফলতা নেই সরকারের।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, রাজউকের নেতৃত্বে নগর উন্নয়ন কমিটি নামের একটি কমিটি পুরান ঢাকার অধিকাংশ অঞ্চলকে ২০০৯ সালে হেরিটেজ ঘোষণা করে। যার অর্থ ওইসব অঞ্চল ও সেখানকার অবকাঠামো, খোলা জায়গা সব কিছুর ব্যক্তি মালিকানা থাকলেও তা রাষ্ট্রিয় সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে। সরকারের নির্ধারিত সংস্থার অনুমতি ছাড়া সেখানে কোনো কিছুই করা সম্ভব না। তাই যদি হয় তাহলে এখানে কীভাবে রাসায়নিকের কারখানা থাকে, কীভাবে রাসায়নিকের গোডাউন গড়ে ওঠে। এতে প্রমাণ হয়, সরকারের ও সরকারি সংস্থাগুলো ঘোষণা দিয়ে খালাস।

তিনি বলেন, কোনো সম্ভব ও পরিকল্পিত নগরীতে আবাসিক এলাকার মধ্যে ভারী তো দূরে থাক হালকা শিল্প কারখানাও কল্পনা করা যায় না। সেখানে রাজধানীর শহরের একটি জনপদের মধ্যে এমন ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প কীভাবে থাকে। যেখানে ২০১০ সালে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আসলে এখানে শুধু ব্যবসায়ীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তারা তো নিজেদের মুনাফার চিন্তা করবেন, কিন্তু দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর চোখের সামনে ৯টা বছর কীভাবে এসব রাসায়নিক কারখানা সেখানে থাকে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads