• মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬
ads

দুর্ঘটনা

বাড়ছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা

অপমৃত্যু মামলা হলেও সাজার নজির নেই

  • এমদাদুল হক খান
  • প্রকাশিত ০২ নভেম্বর ২০১৯

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণে প্রায়ই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। বিস্ফোরণে প্রাণ হারাচ্ছে শিশুসহ নানা বয়সী নারী-পুরুষ। কোনো কোনো ঘটনায় পুরো পরিবারই ধ্বংস হয়ে গেছে। গ্যাস বিস্ফোরণে বেঁচে যাওয়া দগ্ধদের অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছেন। ভুক্তভোগীদের কাছে গ্যাস সিলিন্ডার আবির্ভূত হচ্ছে ‘মৃত্যুদূত’ হয়ে। তবে গ্যাস বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনার দায় নিচ্ছে না কেউ। এসব ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা হলেও কারো সাজা হওয়ার নজির নেই। এর জন্য ব্যবহারকারীর অসচেতনতাকেই দায়ী করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে শুধু অসচেতনতাই নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ, মানহীন সিলিন্ডার তৈরি ও সরবরাহ, সিলিন্ডারের সঙ্গে চুলার সংযোগ পাইপ সঠিক ফিটিংস না হওয়া এবং নিয়মিত মনিটরিং না করাকেও দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া খাবারের রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, সিএনজিচালিত গাড়িতে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহারকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

চলতি বছরের শুরুতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডিতে ৭৮ জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা শুধু বাংলাদেশ নয়, কাঁদিয়েছে পুরো বিশ্বকে। চলতি মাসের মধ্যভাগে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সিলিন্ডারবাহী অ্যাম্বুলেন্সে বিস্ফোরণ ঘটে নিহত হয় তিনজন। সর্বশেষ গত বুধবার রাজধানীর রূপনগরে বেলুনে গ্যাস ভরার সময় বিস্ফোরণে প্রাণ ঝরে সাতজনের।

পরিসংখ্যান বলছে, গেল পাঁচ বছরে কেমিক্যাল বা সিলিন্ডার বিস্ফোরণের এমন ঘটনা ঘটেছে কম করে হাজারটি, যাতে প্রাণ গেছে আড়াই শর বেশি মানুষের। কিন্তু একের পর এক মানবিক বিপর্যয়ের পরও কতটা তৎপর হয়েছে প্রশাসন।

১৯ বছর আগে পরিবেশ রক্ষায় সিএনজি সুবিধা চালু হওয়ার পর ব্যবহার করা গাড়ির সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এরই মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে এসব যানবাহনের অধিকাংশ সিলিন্ডার। তাই সামনের দিনগুলোতে ঝুঁকি দেখছেন তারা।

তারা বলেন, এলপিজি, সিএনজিসহ সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে, তাই এখনই ব্যবস্থা না নিলে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর আগামী।

ফায়ার সার্ভিস সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ বলেন, এগুলো দেখভাল করার কেউ নেই। যদি বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিস থেকে সার্টিফিকেট নিয়েও থাকে দেখভাল করছে কি না সেটাই প্রশ্ন জাগায়।

তিনি বলেন, যারা সিএনজিগুলো ইনস্টল করেন তারা এটিকে রিটেস্ট করেন। যারা এগুলো লাগাচ্ছে তারা কেউ কিন্তু সার্টিফায়েড না।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. সামসুল আলম বলেন, তারা কাজ করছেন। সিলিন্ডারের সমস্যার খোঁজ নেওয়া আমাদের কাজ না। এলপিজি সিলিন্ডারগুলো টেস্ট করবে বোতলিং প্ল্যান। আর সিএনজির ক্ষেত্রে আমরা কিছু তৃতীয় পক্ষের কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছি। দেশে বছরে এলপিজি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় দেড় লাখ টন। শিল্পায়ন, আধুনিকায়নের ফলে ক্রমেই বেড়ে চলছে এ চাহিদা। যদিও সিলিন্ডার ব্যবহার বা মান নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো নীতিমালা।

এদিকে মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকায় বেলুনে গ্যাস ফোলানোর সময় বিস্ফোরণে সাত শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর টনক নড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এখন থেকে প্রকাশ্যে আর কেউ বেলুনে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস ভরে বিক্রি করতে পারবে না। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে গত বৃহস্পতিবার এক জরুরি বৈঠকে সব থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, গ্যাস ফোলানোর সময় বিস্ফোরণে শিশু মৃত্যুর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি যাতে আর ঘটে সেটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। এভাবে প্রকাশ্যে বেলুনে গ্যাস ভরে বিক্রি করলে তার আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এই সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক সামসুল আলম বলেন, এটি আসলে সিলিন্ডার নয়, গ্যাস প্রডিউসিং রিঅ্যাক্টর। গ্যাস সিলিন্ডারকে মোডিফাই করে সিলিন্ডারের ভেতরেই হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করার পদ্ধতি বানিয়েছে। সিলিন্ডারের ভেতরে কস্টিক সোডা ও অ্যালুমিনিয়াম পাউডার দিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করতে থাকে। এর সাহায্যে বেলুন ফোলাতে থাকে। এর মধ্যে কিছুক্ষণ ফোলানোর পরে কোনো কাস্টমার না থাকলে সাধারণত সিলিন্ডারের চাবিটি বন্ধ করে রাখে। এই সময়ের মধ্যে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি হতে থাকে। এতে সিলিন্ডারের ওপর গ্যাসের চাপ বাড়তে থাকে। আর তাতে ভেতরে ক্ষয় হতে থাকে। এক পর্যায়ে গ্যাসের চাপ বেশি বেড়ে গেলে সিলিন্ডারটি গরম হয়ে নরম হয়ে যায়। এ অবস্থায় যখন আবার বেলুনে গ্যাস ভরার জন্য চাবি খোলা হয়, তখনই বিস্ফোরণ ঘটে।

তিনি আরো বলেন, এ ধরনের রিঅ্যাক্টর একেবারে নিষিদ্ধ। এ ধরনের সিলিন্ডার যার কাছে দেখবে, তাকেই পুলিশের ধরা উচিত। অথচ এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। পুলিশ প্রশাসনকে আমরা বহুবার চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে জানিয়েছি। কিন্তু পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads