• রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

কৃষি অর্থনীতি

ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সুনজর প্রয়োজন

আলু নিয়ে স্বপ্ন দেখছে কৃষক

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ০৯ জানুয়ারি ২০১৯

আলুচাষে জমির পরিমাণ কমবেশি- ৫ লাখ হেক্টর, আলুর হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন- ২০ টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আলু উৎপাদন হয়- ১ কোটি ২ লাখ টন, আলু উৎপাদনের দিক দিয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে মুন্সীগঞ্জ জেলা- ১২ লাখ ৪২ হাজার ৩২৯ টন, আলুচাষের দিক দিয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে বগুড়া জেলা- ৫৯ হাজার ৩২৭ হেক্টর, উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে বগুড়া জেলা- ১০ লাখ ৪৬ হাজার ৪৫৭ টন, আলুচাষে দ্বিতীয় অবস্থানে রংপুর জেলা- ৫০ হাজার ৫৪৮ হেক্টর। দেশে আলু সংরক্ষণে হিমাগারের সংখ্যা- ৩৬৩টি, ধারণক্ষমতা প্রায় ২৮ লাখ টন

 

বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আলু। মাথাপিছু আলু খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ১০ গুণ। ভাতের পর এখন দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশক্তির উৎস আলু। অন্য যেকোনো শস্যের চেয়ে আলুর ফলন বেশি হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা কেন্দ্রের (ইফপ্রি) এক যৌথ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে নীরব আলু বিপ্লব ঘটেছে। উৎপাদন বেড়েছে ২৬ গুণ। জানা গেছে, ১৯৮০ সালে আলু উৎপাদন হতো নয় লাখ টন। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক কোটি টন।  সে হিসেবে আলু এখন আশার আলো দেখাচ্ছে। কিন্তু প্রায় প্রতিবছরই আলু অবিক্রীত অবস্থায় হিমাগারে পড়ে থাকার খবর শোনা যায়। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আলুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও কৃষককে গুনতে হয় লোকসানের গ্লানি। কৃষক পায়না ন্যায্যমূল্য। নেই পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার। আছে ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা।

বর্তমানে বাংলাদেশে অবমুক্ত প্রায় ৪০টি জাতের উন্নত আলুর চাষাবাদ হচ্ছে কৃষক পর্যায়ে। উচ্চ ফলনশীল জাতের আলুবীজ সম্প্রসারিত হয়েছে শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি আবাদি এলাকায়। এক দশক আগেও উৎপাদন ছিল ৫০ হাজার টনের নিচে। এখন তা কোটি টন ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিপণন অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৭৬ হেক্টর জমিতে ৯৪ দশমিক ৫৪ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৯৬ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন বেড়ে ১০৩ দশমিক ০৪ লাখ টনে দাঁড়ায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আলু চাষ হয় ৫ দশমিক ২৮ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয় ১১৩ দশমিক ৩৩ লাখ টন। তথ্য-উপাত্তই বলে দিচ্ছে আলুর উৎপাদন বাড়াতে সরকার নানাভাবে উৎসাহিত করায় আলু উৎপাদনে বিপ্লবের সূচনা হয়েছে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুনজর প্রয়োজন।

আলু উৎপাদনের এ সাফল্যের মূল কারিগর কৃষক। মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, নাটোর, নওগাঁ, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নীলফামারী, রংপুরের বদরগঞ্জ, পঞ্চগড়, যশোর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ ও লালমনিরহাট জেলায় বাংলাদেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ আলু উৎপাদিত হয়। জানা গেছে, বাংলাদেশ আলু উৎপাদনে বর্তমানে প্রায় সাড়ে সাত লাখ কৃষক সরাসরি জড়িত, যার মধ্যে ৩০ শতাংশ নারীসহ সংরক্ষণ ও সরবরাহ খাতে আরো বিশাল সংখ্যক মানুষ জড়িত।

 

সুনজর দিতে হবে আলু প্রক্রিয়াজাত পণ্যতে

আশির দশকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা নেদারল্যান্ডসের জাতগুলোকে উন্নত করে দেশের আবহাওয়া উপযোগী করা শুরু করে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত আলুর নতুন জাত কৃষকরা চাষাবাদ শুরু করেন। দেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত তিন মাসে ফলন হয় এমন আলুর জাত উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করে। বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা ছাড়া দেশের সব স্থানেই কমবেশি আলু চাষ হচ্ছে। গত এক যুগে দেশে আলু প্রক্রিয়াজাত পণ্য যেমন চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইসহ অন্যান্য খাদ্য ও পণ্য উৎপাদন বাড়ছে। দেশে এপর্যন্ত ১৫টি আলু প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদন কারখানা স্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি কোম্পানি আলু থেকে উৎপাদিত চিপস ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বিদেশে রফতানি করছে।

 

উৎপাদন ও উদ্ভাবনে এগিয়ে বাংলাদেশ

আলু উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ইন্টারন্যাশনাল পটেটো কাউন্সিলের তথ্যমতেও, বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী দেশ এবং এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়। বাংলাদেশে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন এবং কৃষকের অক্লান্ত চেষ্টায় আলু উৎপাদনে ব্যাপক সফলতা এসেছে। ইউরোপে যেখানে আলু পরিণত হতে পাঁচ থেকে ছয় মাস লাগে, সেখানে বাংলাদেশে আলু পরিপক্ব হতে তিন মাস লাগে। গত এক যুগে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কৃষিবিজ্ঞানীরা ৬১টি আলুর নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। দেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত জাতগুলো থেকে দেশের ৭৫ শতাংশ আলু উৎপাদিত হচ্ছে। বারি আলু-৪৬ ও বারি আলু-৫৩ নামে নতুন দুটি জাত উদ্ভাবন করেছেন আলু গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা, যাতে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হবে না। এসব আলু বিদেশে রফতানি করতেও সুবিধা হবে। অধিক ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে ফসলের উন্নত জাত ও প্রযুক্তিসহ নানা খামার যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) মেশিনারিজ বিভাগ। আলু তোলার যন্ত্র পটেটো হারভেস্টার উদ্ভাবন করেছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। সারা দেশে আলু তোলায় এই যন্ত্র ব্যবহার করলে প্রতিবছর কৃষকের সাশ্রয় হবে প্রায় পাঁচশ’ কোটি টাকা।

 

বাড়ছে রফতানির সম্ভাবনা

আলু উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আলু রফতানির সুযোগ অবারিত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে আলু রফতানি অন্তত দশগুণ বেড়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ও কৃষি বিপণন অধিদফতরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৭ হাজার ৫৭৮ টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৯৮৪ টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ৯৪ হাজার ৬১৪ টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪০ হাজার ২২৯ টন এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫৫ হাজার ৬৫২ টন আলু রফতানি হয়েছে। তারমানে বিদেশে আলু রফতানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অথচ আমাদের দেশে ১৯৯১ সালের আগে ২০টি দেশ থেকে আলু আমদানি করতে হতো। এখন বাংলাদেশ থেকে ২৭টি দেশে আলু রফতানি হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। এর সঙ্গে আবার যোগ হয় আগের বছরের উদ্বৃত্ত আলু। ফলে প্রতিবছর অন্তত ১৬ লাখ টন আলু রফতানি করা সম্ভব। আশার খবরটি হচ্ছে, ৪০ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, দুবাই, ওমান, কুয়েত, কাতার, হংকং, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ব্রুনাইয়ে আলু রফতানি শুরু করেছে প্রাণ কোম্পানি। বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোবেন গ্রানুলা ও কার্ডিনাল জাতের আলু মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কা যাচ্ছে।

 

ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ জরুরি

কৃষি বিপণন অধিদফতরের গতবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিকেজি আলু উৎপাদনে খরচ ৭ টাকা ৪০ পয়সা।  সে হিসেব বিবেচনা করে কৃষকের লাভ নিশ্চিত করেই যেন কৃষি বিভাগ আলুর বাজারদর ঠিক করে- এটা কৃষকের প্রত্যাশা।  এজন্য যা যা করা যেতে পারে-

*    আলুচাষিদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে সরকার ধান-চালের মতো আলু কিনতে পারে। * সরকার মানুষের খাদ্যাভ্যাসে আলুর ব্যবহার বাড়ানোর জন্য প্রচারাভিযান চালাতে পারে।

*    হিমাগারের সংখ্যা বাড়ানো এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।

*    বাংলাদেশে অন্যান্য খাদ্যশস্য যেমন চাল-গমের মতো ফসল উত্তোলনের মৌসুমে আলুর সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

*    হিমাগারে অবিক্রীত আলু দুর্যোগে ত্রাণ হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। যেমন  বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ হিসেবে আলু দেওয়া যেতে পারে।

*    সরকারি বিভিন্ন বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার রেশনে আলু সংযুক্ত করলে বিপুল পরিমাণ আলু সরকারি ক্রয় খাতে চলে আসবে।

*    আলু চাষাবাদ, সংরক্ষণ ও প্রসেস ফুডের শিল্প স্থাপনে ব্যাংকগুলো লোন সহায়তা দিলে উদ্যোক্তারা উৎসাহী হবেন।

 

লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

writetomukul36@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads