• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
কৃষি উৎপাদনে নতুন আশা

ড. সত্যেন মণ্ডল

ছবি : বাংলাদেশের খবর

কৃষি অর্থনীতি

কৃষি উৎপাদনে নতুন আশা

  • ড. সত্যেন মণ্ডল
  • প্রকাশিত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সাধারণত চর দুই ধরনের হয়ে থাকে- ১. অস্থায়ী চর, বর্ষা মৌসুমে প্লাবিত হয় ও স্বল্প সময়ে নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে; ২. স্থায়ী চর, বর্ষা মৌসুমে তেমন প্লাবিত হয় না ও সহজে এমনকি কয়েক দশকেও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা কম (সূত্র : কধৎরস বঃ ধষ. ২০১৭; ঞৎড়ঢ়. অমৎ. উবাবষড়ঢ়. ৬১, ২ ঃ ৭৭-৯৩)। ব্রহ্মপুত্র বিশ্বের নবম বৃহত্তম ও পনেরোতম দীর্ঘতম নদ, যা চীন ও ভারতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চল প্রায় ৪০ বর্গকিলোমিটার (২০১৫ সাল পর্যন্ত)। এই চরাঞ্চল দিন দিন বাড়ছে। বাড়ার অন্যতম কারণ, নদীভাঙন, বন্যা, নদীর বুকে পলি জমে যাওয়া বা পলি ঠিকমতো অপসারিত না হওয়া প্রভৃতি। যাহোক, এই বিশাল চরাঞ্চলই হতে পারে আমাদের কৃষি বা কৃষি উৎপাদনের জন্য আশীর্বাদ। এককালের খরস্রোতা এই ব্রহ্মপুত্র নদ ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার চর আলগী, টাঙ্গাব, পাঁচবাগ ও দত্তের বাজার ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। বর্তমানে এই নদের আদিরূপ অনেকটাই ক্ষীয়মাণ। এখন সামান্য জল বুকে ধারণ করে মরার মতো বেঁচে আছে। স্থানীয় কৃষক তাদের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে, জেগে ওঠা চর এলাকায় চাষাবাদ করে ফসল ফলিয়ে যাচ্ছেন। শুকনো মৌসুমে এর বুকে চলে রকমারি ফসলের চাষ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিনিধি দল সংশ্লিষ্ট উপজেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনকালে টিমের সদস্যরা স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করেন এবং সরেজমিনে ফসলের মাঠ অবলোকন করেন। আলাপকালে কৃষকরা জানান, বিভিন্ন ফসলের বীজ তারা মূলত স্থানীয় কৃষি অফিস, বিএডিসি ও বীজ ডিলারদের কাছ থেকে লাভ করেন। বর্তমানে তারা নিজেরাও তাদের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ করে আবাদ করছেন। তারা ধান আবাদের পাশাপাশি চরের বিস্তীর্ণ এলাকায় চিনাবাদাম, মাশকলাই ইত্যাদির আবাদ করছেন। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি বিশেষ করে বেগুন, টমেটো, পেঁয়াজ, আলু, মিষ্টিকুমড়া, ক্ষিরা আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন। ধান আবাদের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষকরা বোরো মৌসুমে ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯ এবং এসএল৮ সহ বিভিন্ন কোম্কানির হাইব্রিড বীজ ব্যবহার করেন। আমন মৌসুমে বেশিরভাগ কৃষক ব্রি ধান৪৯ আবাদ করেন তবে চর আলগী এলাকার বেশকিছু কৃষক ব্রি ধান৫২ আবাদ করেন। চর এলাকায় আউশ মৌসুমে রোপা আউশ ধানের আবাদ ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে কৃষকরা স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে ব্রি ধান৪৮ এর বীজ সংগ্রহ করে চাষাবাদ করছেন। কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, মৃত্তিকা সম্কদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ভ্রাম্যমাণ মৃত্তিকা পরীক্ষা টিম চর এলাকার মাটি পরীক্ষা করেছে। পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, ওই এলাকার মাটি অধিক অম্লীয়, তাই স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের ডলোচুন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া অন্যান্য পুষ্টি উপাদান যেমন- নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরনের মাত্রা নিম্ন থেকে অতিনিম্ন উর্বরতা শ্রেণিতে রিপোর্ট করা হয়েছে।

গফরগাঁও উপজেলার চর আলগী, টাঙ্গাব, পাঁচবাগ ও দত্তের বাজার ইউনিয়নের কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে জানা যায়, তাদের এলাকায়ও দুই ধরনের চর বিদ্যমান, স্থায়ী চরাঞ্চলের প্রধান প্রধান শস্য বিন্যাস হচ্ছে, বোরো-পতিত, রোপা আমন, বোরো-আউশ, রোপা আমন, পতিত-আউশ, রোপা আমন, ডাল-পাট-রোপা আমন, সবজি-সবজি-সবজি। গফরগাঁও উপজেলার শস্য বিন্যাসগুলোর মধ্যে বোরো-পতিত-রোপা আমন প্রায় ৪৭% এলাকাজুড়ে চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া অস্থায়ী চর এলাকায় মূলত মাশকলাই ও বাদাম চাষাবাদ হয়ে থাকে। সমস্যা হলো কৃষক ফসলের উন্নত ও ভালো বীজ সময়মতো পায় না। তা ছাড়া চরাঞ্চলের মাটি অম্লীয় হওয়ায় অনেক সময় ফসলের স্বাভাবিক ফলন ব্যাহত হয়। যেসব চর সড়ক থেকে দূরে সেখানে উচ্চ মাত্রায় সংগ্রহোত্তর ক্ষতি (২০ থেকে ৩৫%) হয়ে থাকে। উপযুক্ত কৃষি উপকরণ এবং যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত না থাকায় ফসল চাষাবাদ ব্যাহত হয়। সারা দেশের মতো এখানেও বিপণন জনিত সমস্যা রয়েছে, তবে প্রধান সমস্যাগুলো যেমন আলু জাতীয় ফসল সংরক্ষণের জন্য হিমাগারের অভাব, ফসল (যেমন টমেটো, কলা) পাকাতে মাত্রাতিরিক্ত ইথিলিন জাতীয় পদার্থ (জরঢ়বহরহম ঐড়ৎসড়হব) ব্যবহার করে। সবজি জাতীয় ফসলগুলো পচনশীল হওয়ায় অল্প দামে কৃষকদের স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হয়। সংগ্রহোত্তর কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাত করার লক্ষ্যে উদ্যোক্তার অভাব রয়েছে। গফরগাঁও উপজেলায় বেশিরভাগ কৃষকরা বিভিন্ন ফসলের বীজ স্থানীয় বীজ ডিলার, কৃষি অফিস থেকে সংগ্রহ করে থাকে। এ ছাড়া কোনো কোনো ফসলের বীজ তারা নিজেরা উৎপাদন করে, বিশেষ করে মাশকলাইর বীজ। ধান বীজের ক্ষেত্রে তারা মূলত বীজ ডিলার ও কৃষি অফিস থেকে পায়, পাশাপাশি নিজস্ব উৎপাদিত বীজও ব্যবহার করে। কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বীজ সরবরাহ প্রক্রিয়াটি আরও আধুনিকীকরণ করা উচিত।

সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ফসলের উন্নত ও ভালো মানের বীজ সময়মতো কৃষকের মাঝে পৌঁছে দিতে হবে। তাছাড়া মানসম্কন্ন বীজ উৎপাদনের জন্য কৃষকদের  প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। জৈব সারের ব্যবহার বাড়িয়ে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। মাটির অম্লতা দুর করার জন্য জমিতে কৃষি বিভাগের পরামর্শ মোতাবেক ডলোচুন ব্যবহার করতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকরা বিভিন্ন রবি ফসল উৎপাদন করে থাকে। এক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন বালাই নাশক অধিক মাত্রায় ব্যবহার করে। জৈব বালাই নাশক (ফেরোমন টিউব) ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন শাকসবজিতে বিষ প্রয়োগের মাত্রা কমিয়ে আনার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সঠিক মাত্রায় ইথিলিন জাতীয় পদার্থের (জরঢ়বহরহম ঐড়ৎসড়হব) ব্যাবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং এ বিষয়ে বিক্রেতা ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার স্থাপন করা যেতে পারে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ে প্রণোদনা প্রদান এবং স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

satyen1981@gmail.com

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads