• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
আশা জাগাচ্ছে চরাঞ্চলের কৃষি

আশা জাগাচ্ছে চরাঞ্চলের কৃষি

ছবি : বাংলাদেশের খবর

কৃষি অর্থনীতি

আশা জাগাচ্ছে চরাঞ্চলের কৃষি

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

চরে এখন আর অভাবী মানুষ নেই। চাষাবাদ করে চরের বাসিন্দারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন। নদী অববাহিকায় জেগে ওঠা চর কৃষি অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে চরাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের জীবনমান ক্রমেই উন্নত হচ্ছে। চরবাসীর এই উন্নয়নে কৃষি কর্মসূচি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। একসময়ের চর নিয়ে দখলবাজদের ক্ষমতার লড়াইয়ের অন্ধকার পথ পাড়ি দিয়ে চরাঞ্চলে এখন কেবলই আশার আলো। অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় চরের কৃষকরা মনে করলেন, চরে যদি কাশফুল জন্মে তাহলে শস্যও ফলানো যাবে। শুরু হলো সবজি ও ফসল ফলানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পরীক্ষা সফল প্রমাণিত হওয়ার পর প্রথম চরে বোনা হলো সরিষা, পরে ভুট্টা, ধনিয়া ও মরিচসহ বিভিন্ন সবজি শস্য ও মশলা। এভাবে কৃষকের প্রচেষ্টায় দেশের একেকটি চর এখন যেন একেকটি শস্যভান্ডার। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার দেশের চরগুলোতে কৃষির উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ, কৃষিঋণ, বীজ ও সার সহায়তা পাচ্ছেন চরের কৃষকরা। এভাবেই গত এক দশকে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা নিজেদের প্রয়োজনে চরের দৃশ্যপট এখন অনেকটাই পাল্টে দিয়েছেন। অথচ এক দশক আগেও চরের মানুষ বলতে অতি দরিদ্রদের বোঝাতো। কারণ তখন তারা ছিল রিলিফনির্ভর। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। চরাঞ্চলের জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে বিভিন্ন জাতের ফসল। জেগেওঠা পলিমাটি, বালুচর কিংবা চরের অনাবাদি ভূমি এখন সুষ্ঠুভাবে ব্যবহূত হচ্ছে কৃষির অবারিত ক্ষেত্র হিসেবে। সারা বছরই কোনো না কোনো ফসল ও সবজির আবাদ হচ্ছে। এর ফলে বেশিরভাগ চরেই দেখা দিয়েছে কর্মচাঞ্চল্য। কৃষকদের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে কৃষির এই সফল বিবর্তন।

 

বদলে যাচ্ছে জীবনধারা

চরাঞ্চলে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন কৃষি। বেশিরভাগ চরে ধান, ভুট্টা, পাট, গম, বাদাম, পেঁয়াজ, মরিচ, কুমড়া, টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি উৎপাদিত হয়। চরাঞ্চলে গো-পালনের খরচ অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক কম বলে এখানে গরু পালনের হার বেশি। সিরাজগঞ্জ ও পাবনার সব চরই এখন গরু পালনের জন্য আদর্শ এলাকায় পরিণত হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলায় প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ ১৬টি নদনদীর অববাহিকার চার শতাধিক চরে বাদামের চাষ হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলগুলোয় ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে চিনাবাদামের চাষ হয়। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ও কালিহাতী উপজেলায় যমুনা নদীর বুকে গড়ে ওঠা বালুচরে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ হচ্ছে। বাদাম ছাড়াও চরের এসব জমিতে অন্যান্য ফসল আবাদের উপায় খুঁজতে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা চালু রয়েছে। রংপুর ও কুড়িগ্রামের তিস্তা নদীর পাড়ে মিষ্টি কুমড়া আবাদের উপায় বের করেছে কেয়ার বাংলাদেশ ও প্রাকটিক্যাল অ্যাকশন। তিস্তা চরের বালিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্রাকটিক্যাল অ্যাকশনের সহায়তায় চরের চাষিদের বিশেষ পদ্ধতিতে কুমড়া উৎপাদন বিশ্বখ্যাতি পেয়েছে। এছাড়া পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় গড়ে ওঠা ছোট-বড় বিভিন্ন চরে এখন অক্সফাম জিবির সহায়তায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে গরু, ছাগল, ভেড়া ও হাঁস-মুরগির অসংখ্য খামার গড়ে উঠেছে। এসব কার্যক্রম থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে চরের দরিদ্র মানুষ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ছাড়াও দেশের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের প্রায় সব চরাঞ্চলেই সবজি ও ফসলের উৎপাদন বেশ ভালো। কিছু ফসলের বাম্পার ফলন এবং প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন ধরনের সবজি, যেমন- ক্যাপসিকাম, স্কোয়াশ চাষে ব্যাপক সাফল্যে নতুন আশায় দিনবদলের স্বপ্ন দেখছেন চরাঞ্চলের জনগণ। চরাঞ্চলের উৎপাদিত সবজি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে পরীক্ষামূলক আবাদ করা কয়েকটি সবজির ফলনে আশাতীত সাফল্য পাওয়ায় দেশের চরাঞ্চল নিয়ে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দেশের সব চরাঞ্চলের উপযোগী ফসল চাষাবাদে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্প।

 

সবজি চাষে অবারিত ক্ষেত্র

দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে অপার সম্ভাবনা জাগিয়েছে চরাঞ্চলের কৃষি। কুমড়া, মরিচ, বাদাম, স্কোয়াশসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ভূমি হলো চরাঞ্চলের জমি। অর্গানিক সবজির অন্যতম ভান্ডার হিসেবেও সম্ভাবনা জাগিয়েছে চরাঞ্চল। এখানকার জমিগুলোয় এখন ভেষজ চাষও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এছাড়া পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন জাতের ডাল ও বাড়ির আঙিনায় সবজি আবাদের মাধ্যমে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণে চরাঞ্চলকে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। গবাদিপশু পালন এবং দুধের চাহিদা পূরণেও এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় জায়গাগুলোর অন্যতম হলো চরাঞ্চল। চর এলাকায় ফসলের নিবিড়তা ১৫০-১৮৫ শতাংশ। মূল ভূখণ্ডের চেয়ে অস্থায়ী চর সাধারণত কম উৎপাদনশীল। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে অধিকাংশ চরের জমি আকস্মিক বন্যাকবলিত হয়ে ভেঙে, বালিমাটি দ্বারা ঢেকে বা ক্ষয় হয়ে যাওয়ায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। দেশের বিভিন্ন চরে পরিবেশসম্মতভাবে সবজি চাষ বর্তমানে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চরের জমিতে সবজি চাষ করে কৃষকদের অভাব দূর হচ্ছে। প্রতিবিঘা জমিতে বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করে বছরে ২৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি লাভ করতে পারছেন। এর বাস্তব চিত্র দেখা যাবে সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার দুর্গম যমুনার বিভিন্ন চরে। সেখানে হচ্ছে আধুনিক পদ্ধতিতে মাচায় সবজি চাষ। এই চাষের মধ্য দিয়ে তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, সবজি উৎপাদন চরের কৃষকদের মাঝে নতুন এক উদ্দীপনা তৈরি করেছে। কৃষকরা সবজি বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি লাভবান হচ্ছেন। অক্সফাম ইন বাংলাদেশের পলিসি, অ্যাডভোকেসি, ক্যাম্পেইন অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স ম্যানেজার এস এম মনজুর রশীদ বলেন, দেশের চরগুলো চাষাবাদের অপার এক সম্ভাবনার জায়গা। কিন্তু বহুবিধ কারণে চরের উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনায় এখনো নানা ধরনের জটিলতা বিদ্যমান। চরের কৃষিসেবা ও ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকীকরণের মধ্য দিয়ে অধিক হারে খাদ্য উৎপাদনের প্রচেষ্টা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরো জোরদার করা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় ও কৃষকদের উদ্যোগে চরের কৃষির অগ্রযাত্রার নতুন নতুন সংবাদ এখন দারুণ আশার সঞ্চার করছে।

বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

চরের কৃষিতে অধিক হারে বিনিয়োগ করা হলে দেশের খাদ্য চাহিদার বিরাট অংশ পূরণ করা সম্ভব। চরের কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নকে একটি অগ্রগণ্য এজেন্ডা হিসেবে নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞদের মতে, চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিকে জাতীয়ভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। দেশের চরাঞ্চলের কৃষি ও প্রাণিসম্পদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পিকেএসএফ মডেলের একটি চর উন্নয়ন ফাউন্ডেশন গঠন এবং কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন তথা পিকেএসএফের মডেলে চরের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন কৃষিতে বেশি বেশি বিনিয়োগ করা হলে দেশের খাদ্য চাহিদার বিরাট অংশ পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা। পাশাপাশি এর মাধ্যমে দেশের কর্মসংস্থানের সমস্যা কাটানো সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফ্যামের সহযোগিতায় এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন সমন্বয়ের উদ্যোগে দেশের চরাঞ্চলে কৃষি খাতের উন্নয়ন সংক্রান্ত এক জাতীয় সংলাপে বক্তারা বলেছেন, ‘চরের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কৃষি খাতের ওপর জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

 

সম্ভাবনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন গবেষণা

দেশের একেকটি চর এলাকা যেন কৃষি-অর্থনীতির অবারিত সম্ভাবনার ক্ষেত্র। পরিকল্পনা মাফিক অগ্রসর হলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিরাট ভূমিকা রাখবে চরাঞ্চল। চরাঞ্চলের জমি এবং কৃষক সমাজ অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলার শিকার। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর তাই চরের কৃষিজমি এবং কৃষকের প্রতি আরো নজর দেওয়া এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে। চরে কৃষির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আরো যা যা করণীয় হতে পারে— লবণাক্ত এলাকার চরগুলোতে পাটসহ লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসল উৎপাদনের চিন্তাভাবনা করা দরকার। চরাঞ্চলে আরেকটি সম্ভাবনার জায়গা হলো গবাদি পশুপালন। কিন্তু দেশের সব চরে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উৎপাদিত পণ্যের বিপণন প্রক্রিয়ায় এখনো নানাবিধ সমস্যা বিদ্যমান। ফলে চরে যে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি রয়েছে, সেখানে সেই মাত্রায় অধিক ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ চরাঞ্চলে নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তির অভাব, উন্নতমানের বীজের সঙ্কট, উন্নত জাতের ফসল চাষের প্রচলন না থাকা, সেচ সঙ্কট এবং উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বিপণন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা এবং কৃষকদের দ্রুত ঋণ সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা না থাকা।

 

 লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

writetomukul36@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads