• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
লবণ আমদানি কালবৈশাখী ও দরপতনের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত চাষিরা

লবণের দরপতনের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাষিরা

ছবি : সংগৃহীত

কৃষি অর্থনীতি

ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না লবণ চাষিরা

লবণ আমদানি কালবৈশাখী ও দরপতনের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত চাষিরা

  • মাহাবুবুর রহমান, কক্সবাজার
  • প্রকাশিত ১২ এপ্রিল ২০১৯

সারা দেশে লবণের চাহিদা মেটাতে প্রচণ্ড গরম ও রোদে পুড়ে প্রায় ৬০ হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদন করলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না কক্সবাজার জেলার সাড়ে ২৭ হাজার চাষি। কুচক্রী মহলের লবণ আমদানি, দফায় দফায় কালবৈশাখী ও দরপতনের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাষিরা।

মাঠ পর্যায়ে লবণের কেজি ৪০ টাকা কিন্তু মাঠের লবণ এক মণ (৪০ কেজি) ৩০০ টাকা। যা হিসাব করলে প্রতি কেজির মূল্য দাঁড়ায় মাত্র সাড়ে ৭ টাকা। অথচ কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকায় উৎপাদিত লবণ ক্রয় করে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো প্রতি কেজি প্যাকেটজাত লবণ বিক্রি করছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা।

প্রাকৃতিক বৈরী আচরণের কারণে গেল বছর লবণ উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় অজুহাত দেখিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করেছে বেশির ভাগ মিল মালিক কর্তৃপক্ষ। তাদের গুদামে এসব বিদেশি লবণ এখনো মওজুদ আছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া কর ফাঁকি দিয়ে চীন থেকে চোরাপথে আসছে সোডিয়াম সালফেটন ও ক্লোরাইড নামের খাবারের লবণ, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে জানান ইসলামপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম আজাদ।

এসব কারণে দেশে উৎপাদিত লবণ কিনতে তারা তেমন একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো আয়োডিন মিশ্রিত লবণের নাম দিয়ে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করলেও সরাসরি লবণ উৎপাদন কাজে জড়িত চাষিদের পেটে ঠিকমত মোটাচালের দুবেলা ভাতও জোটছে না। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এসব প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে গেলেও লবণ চাষিরা কোনো ধরনের ব্যাংক ঋণ পায় না বললেই চলে।

তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেই ওইসব প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো লবণ উৎপাদনের ঘাটতি দেখিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির তোড়জোড় শুরু করবে। বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করলেই মাঠ পর্যায়ে উৎপাদিত লবণ মাঠের গর্তেই পড়ে থাকে। গত বছর লবণের বাজার দাম ভাল ছিল বলে বেশিরভাগ চাষি লাভের আশায় ব্যাপক লবণ চাষ করেছে এ মৌসুমে ।

জানা যায়, দেশের বৃহত্তম লবণ উৎপাদন জোন কক্সবাজারে প্রায় ৬০ হাজার একর জমিতে ২৭ হাজার ৫০০ জনের মত চাষী চলতি মৌসুমে লবণ চাষ করছে। গত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে। দেশের এক তৃতীয়াংশ লবণের চাহিদা পূরণ করে কক্সবাজার সদর, চকরি তথা কক্সবাজারের উৎপাদিত লবণ। বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে গত মৌসুমে লবণের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকায় দেশের একমাত্র লবণ উৎপাদনকারী জেলা কক্সবাজারের প্রান্তিক বেশিরভাগ চাষি লাভের আশায় এ মৌসুমে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে মাঠে নেমেছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় চলতি উৎপাদন মৌসুমে প্রচুর পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে মজুদ রয়েছে বিপুল পরিমাণ লবণ। তবে এবার লবণের দাম কম থাকায় ও দফায় দফায় কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে চাষিদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। জানুয়ারি মাস থেকে লবণ উৎপাদন শুরু হয়ে ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তবে আবারো টানা কালবৈশাখী শুরু হলে নিমিষেই শেষ হবে সেই আশা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রান্তিক চাষিরা প্রতি কানি লবণ মাঠ বর্গা নিয়েছেন সর্বনিম্ন ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকায়। তারপর রয়েছে শ্রমিকের মজুরি, পলিথিন ক্রয়সহ আনুষঙ্গিক ১৫ হাজার টাকা খরচ।

গত বছরের এই সময়ে প্রতি মণ লবণের দাম ছিল সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কিন্তু মৌসুম শুরুতেই লবণের দাম ৩৫০ টাকা থাকলেও বর্তমানে ৩১০ থেকে ৩১৫ টাকায় নেমে এসেছে। গত সাড়ে তিন মাসে লবণ উৎপাদন হয়েছে ১৩০ থেকে ১৪০ মণ, যার আনুমানিক মূল্য ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা। মৌসুম আছে আর মাত্র এক মাসের মতো। এতে উৎপাদন হতে পারে আরো ১৩০ থেকে ১৪০ মণ।

স্থানীয় লবণ চাষি জামাল উদ্দিন জানান, গত বছর প্রতি মণ লবণ বিক্রি হয়েছিল ৫০০ থেকে সাড়ে ৬০০ টাকায়। এ মৌসুমে শুরুতে মণ প্রতি লবণের দাম ছিল ৩৫০ টাকা, এখন তা ৩১০ থেকে ৩১৫ টাকায় নেমে এসেছে।

তাদের আরো অভিযোগ, আমদানি করা ও আমদানির গুজব ছড়িয়ে চাষি পর্যায়ে লবণের দাম কমিয়ে দিয়েছে একটি মহল।

শাহজাহান নামের অপর এক চাষি বলেন, বিগত বছরের তুলনায় এই মৌসুমে লবণের দাম অনেক কম। প্রতি বছর মূলধন ছাড়া প্রতি কানিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাভ থাকে, আর এই মৌসুমে লাভ তো দূরের কথা, মূলধন রক্ষারই নিশ্চয়তা নেই। বর্তমান বাজারদরে লবণ বিক্রি করতে পারছি না। ফলে শ্রমিকের মজুরিও চালাতে পারছি না।

উপকূলীয় লবণ চাষি সমিতির এক নেতা বলেন, দেশের একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ খাতটি ধ্বংস করার জন্য কিছু মিল মালিক এবং দালাল চক্র ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। তারা বিদেশ থেকে ক্ষতিকর লবণ আমদানি করে দেশের এই প্রধান উৎপাদন খাতটিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার যড়যন্ত্র চালাচ্ছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র রুখে দিতে আমরা সবাই এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ আছি।

তিনি আরো বলেন, নীতিমালা না থাকার কারণে দেশের অন্যতম স্বনির্ভর লবণ খাতটি এখন হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এ ব্যাপারে জানতে বাংলাদেশ লবণ শিল্প উন্নয়ন প্রকল্প (বিসিক) কক্সবাজারের উপ-মহাব্যবস্থাপক দিলদার আহমদ চৌধুরী বলেন, এখন বৃষ্টির সময়। সুতরাং সমস্যা কিছু হতেই পারে। তবে ইতোমধ্যে বেশিরভাগ লবণ মাঠ থেকে উঠে গেছে।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads