• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
ads
ধান ও ভুট্টার দাম না পেয়ে তামাকে ঝোঁক

ছবি : সংগৃহীত

কৃষি অর্থনীতি

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালন

ধান ও ভুট্টার দাম না পেয়ে তামাকে ঝোঁক

  • লালমনিরহাট প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ০২ জুন ২০১৯

সারা দেশের মতো লালমনিরহাটেও গত শুক্রবার নানা আয়োজনে পালিত হয়েছে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট শস্য ভান্ডারের খ্যাতি অর্জনকারী একটি জেলা। গত তিন দশকে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমি গ্রাস করেছে। বছরের পর বছর ধান ও ভুট্টার দাম না পাওয়ায় জেলার কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকেছেন। ফলে কৃষিজমিগুলো তামাক চাষের দখলে যাওয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে। আর এখনো কৃষকদের মাঝে বেড়েই চলেছে তামাক চাষের প্রবণতা।

জানা গেছে, খরস্রোতা তিস্তার তীরবর্তী চর ও বোরো চাষের জমিতে বোরো ও রবিশস্য চাষের পরিবর্তে তামাক চাষ করেছেন কৃষকরা। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর তামাক চাষের কারণে এলাকার কৃষিজমিগুলোর উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া হুমকির মুখেও পড়েছে এখানকার জীববৈচিত্র্য।

জানা গেছে, তামাক শুকানোর জন্য জেলার তামাক ক্ষেত ও বসতভিটার পাশে তৈরি করা হচ্ছে তামাক চুল্লি। এ কারণে এলাকায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের গাছ। এ কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বনায়ন প্রকল্প। স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকদের ভাষ্যমতে, তামাক চাষের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষিজমির বর্গামূল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। যে জমি গত কয়েক বছর আগে বর্গা হতো ৪-৫ হাজার টাকায়; সে জমি এখন বর্গা হচ্ছে ১০-১৫ হাজার টাকায়।

লালমনিরহাট মসলা গবেষণা উপকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মোস্তাক আহমেদ জানান, মসলা জাতীয় ফসল শাকসবজি বাহারি ফুল চাষের জন্য এ জেলার মাটি অত্যন্ত উপযোগী। তাই তামাকের বদলে মসলা জাতীয় ফসল চাষ করলে এখানকার কৃষকেরা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। আর এজন্য কৃষকদের মাঝে সচেতেনতা বাড়ানো বিশেষ প্রয়োজন। যদি কৃষকদের মাঝে এ ব্যাপারে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়, তাহলে কৃষকরা তামাকের বদলে এসব ফসল চাষ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এ ব্যাপারে তিনি সরকারি বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের ঢঢোগাছ গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, রবিশস্য আবাদ করার পর তা বাজারজাতকরণে রয়েছে নানা সমস্যা। অপরদিকে তামাক চাষে পুঁজিবাদী তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের আগাম টাকা ঋণ ও নানা ধরনের উপকরণের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে। যেটা আমরা রবিশস্য চাষ ও বাজারজাতকরণে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে আমরা সহজে কোনো কিছুই পাই না।

একই এলাকার কৃষক মজিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, কৃষি উপকরণের মূল্য অনুযায়ী ইরি, বোরো ধান ও রবিশস্য চাষ আমাদের জন্য অধিক খরচ। একই অভিযোগ করেন সাপ্টিবাড়ি এলাকার রাশেদ আলী ও আবুল কাশেম। তারা বিভিন্ন তামাক কোম্পানির লোভনীয় অফার নিয়ে তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। পুঁজিবাদী বিভিন্ন কোম্পানি এ অঞ্চলের কৃষকদের আগাম টাকা, সার, বীজসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ায় কৃষকরা রবিশস্যের পরিবর্তে এখন তামাক চাষ করছেন। তামাক চাষ করায় মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ মান নষ্ট হচ্ছে এবং জমির জন্য উপকারী পোকামাকড়ও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে যা এই অঞ্চলের জন্য কৃষির ক্ষেত্রে মোটেও ভালো খবর নয়।

লালমনিরহাট কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ৯৮ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমি আবাদি রয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে তামাক আবাদ করা হয়েছে। অন্যান্য বারের চেয়ে এবার আলু আবাদ তুলনামূলক ভাবে অনেক কমেছে। ৪ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষাবাদ করা হয়েছে বলে জেলা কৃষি বিভাগ নিশ্চিত করেছে। আর যেসব জমিতে আলুর আবাদ হয়নি, সেসব জমিতে এবার তামাক চাষ হয়েছে।

লালমনিরহাট কৃষি অধিদপ্তরের জেলা কর্মকর্তা বিধূ ভূষণ রায় জানান, শুধু জনসচেতেনতার অভাবেই জেলার সাধারণ কৃষকরা তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছে। এ ছাড়া তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের আগাম টাকা ঋণ ও নানা ধরনের উপকরণের লোভনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার জন্য চাষিরা তাদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। কিন্তু এতে করে পরিবেশ ও জমির কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছেন না তারা। তবে কৃষকরা যেন তামাকের বদলে অধিক মুনাফার ফসল ভুট্টা আবাদের দিকে ঝোঁকে সেজন্য সরকারিভাবে আমরা চেষ্টা করছি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads