• সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৫
ads
মাছের উৎপাদন বাড়ছে

সংগৃহীত ছবি

কৃষি অর্থনীতি

বাংলাদেশে মৎস্য বিপ্লব

মাছের উৎপাদন বাড়ছে

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ৩১ জুলাই ২০১৯

মৎস্য উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বাংলাদেশে। জানা গেছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বে যে চারটি দেশ মাছ চাষে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশের পরিবেশ মিঠা পানির মাছ চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। দেশের জনগণ নিজেদের প্রয়োজনে মাছ চাষের প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসেছেন। নিজেদের পুকুরের মাছ খাওয়ার পাশাপাশি বাজার থেকে মাছ কেনার প্রবণতা বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের আমিষের চাহিদা পূরণে দেশের জলাশয়গুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৯’র উদ্বোধনকালে তিনি আরো বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি- আমাদের যত জলাশয়, পুকুর, খাল, বিল রয়েছে সেগুলোকে আমরা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনবো, যাতে করে আমাদের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে।’ একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশের ডোবা, পুকুর ও জলাশয়কে ফেলে না রেখে মাছ চাষ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা খাদ্যের চাহিদা পূরণ করেছি। এখন দৃষ্টি পুষ্টির দিকে। বিল, ঝিল, হাওর, বাঁওড়, নদীনালায় পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করতে হবে। মাছের চাইতে এত নিরাপদ আমিষ আর নেই।’

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) সর্বশেষ সমীক্ষায় অনুযায়ী উৎপাদিত মাছের ৭৫ শতাংশই এখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করছেন মাছ চাষিরা। সমীক্ষায় আরো বলা হয়েছে, বাড়তি চাহিদা, প্রযুক্তির উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো, লাখ লাখ পুকুরমালিক এবং ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন দ্রুত বেড়েছে। বাংলাদেশ সরকার ভিশন ২০২১-এ দেশের মাছের উৎপাদন ৪৫ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে যা বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে ১০ লাখ টন বেশি। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ আহরণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ২৫তম। বঙ্গোপসাগরে ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি ছাড়াও প্রায় ৫০০ প্রজাতির অর্থকরি মাছ রয়েছে। এ মাসের অতি সামান্যই মাত্র আহরিত হয়। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরার আইনগত অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে মৎস্য আহরণ পর্যায়ক্রমে বাড়বে। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় উৎপাদিত মাছের একটা বড় অংশ, প্রায় ১০ লাখ টন নষ্ট বা অপচয় হয়ে যায়। এটা রোধ করতে পারলে মাছ উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হবে।

বেড়েছে মাছ খাওয়ার পরিমাণ

মাছের দাম সাধারণ ক্রেতাদের সামর্থ্যের মধ্যে থাকায় গত ১০ বছরে দেশে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ প্রায় শতভাগ বেড়েছে। ২০১০ সালের সর্বশেষ খানা জরিপ অনুযায়ী বছরে বাংলাদেশের মানুষ প্রায় ১২ কেজি মাছ খায়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায় ‘দেশের বিলুপ্তপ্রায় ছোট মাছগুলো আবারো সাধারণ মানুষের খাবারের টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তাদের উদ্ভাবিত চাষপদ্ধতির কারণে আজ টেংরা, গুলশা, পাবনা, শিং ও মাগুর মাছের উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে। এসব মাছের কেজি আগে ৮০০ টাকার নিচে পাওয়া যেত না। এখন তা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। এমন আরো ১৮টি মাছের আধুনিক চাষ পদ্ধতি ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে গবেষণা করছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ মৎস্য ইনস্টিটিউট মৎস্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক ৬০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। যার মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ১৮টি মাছের পোনা উৎপাদন করেছে প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা। তারা কই মাছের রোগ প্রতিরোধে টিকা উদ্ভাবন করেছেন। সূত্র জানায়, ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত এসব প্রযুক্তি মৎস্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে দেশে মাছের উৎপাদন অনেক বেড়েছে। শুধু তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ (প্রায় ৪ লাখ টন) এবং এশিয়ায় তৃতীয়। এই সফলতা অবশ্যই গৌরবের।

মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়

মাছ উৎপাদনে ক্রম সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে বিশ্বে পঞ্চম থেকে চতুর্থ স্থান অর্জন করে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়। বাংলাদেশের আগের দুটি অবস্থানে রয়েছে চীন ও ভারত। দেশে মোট কৃষিজ আয়ের ২৩ দশমিক ৮১ শতাংশ আসে মৎস্য খাত থেকে। জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান এখন তিন দশমিক ৫৭ শতাংশ। কৃষিজ জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের বেশি ১ দশমিক ৮২ কোটি মানুষ মৎস্য আহরণে সম্পৃক্ত। যার মধ্যে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ লাখ নারী। দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, চাষের ও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ। চার বছর ধরে বাংলাদেশ এই অবস্থানটি ধরে রেখেছে। আর শুধু চাষের মাছের হিসাবে বাংলাদেশ পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সাতটি দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের অর্ধেকেরও বেশি আসে মাছ থেকে। প্রাণিজ আমিষের ৫৮ শতাংশ মাছ দিয়ে মিটিয়ে শীর্ষস্থানীয় দেশের কাতারে এখন বাংলাদেশ।

স্বয়ংসম্পূর্ণ মাছে দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য সেক্টরের অবদান অসামান্য। উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় দেশের মানুষ গড়ে ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম মৎস্য গ্রহণ করছেন। জাটকা নিধন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ায় ২০১৭-১৮ সালে প্রায় পাঁচ লাখ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ২০১৭-১৮ সালে প্রায় ৬৯ হাজার টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।

নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুরসহ জলাধারের সংখ্যা হ্রাস পেলেও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য উৎপাদন বিস্ময়করভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। রূপকল্প-২০২১ অনুযায়ী মাছের উৎপাদন ৪২ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং মৎস্য অধিদপ্তর যৌথভাবে কাজ করছে। আমাদের দেশে মোট বদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ ৪ লাখ ১২ হাজার ৩৪১ হেক্টর। তার মধ্যে ২৬ হাজার হেক্টর পুকুর, ৫ হাজার ৪৮৮ হেক্টর বাঁওড় এবং ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৫৩ হেক্টর চিংড়ি খামার। বিভিন্ন উপাত্ত থেকে জানা যায়, দেশের প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ বা ১১ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্যখাতে জীবিকা নির্বাহ করে। বছরে প্রায় ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে এই মৎস্য সেক্টরে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের যথাযথ উদ্যোগে ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৬৮ হাজার ৩০৫ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে আয় হয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর আগে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছিল ২৭ লাখ ৪১ হাজার টন। সরকারের উন্নয়নমুখী বহুবিধ উদ্যোগ ও সেবার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫-১৬ অর্থবছর মাছ উৎপাদন ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মধ্যেই বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসর্ম্পূণতা অর্জন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা সরকারের।

বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন

প্রতিবছরই বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন। বিবিএস জরিপ অনুযায়ী, মাছের সামগ্রিক উৎপাদনে দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়ার প্রভাবও পড়ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ টন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮৬-৮৭ সালে দেশে ইলিশ উৎপাদন হতো ১ লাখ ৯৫ হাজার টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার টন। দেড় দশকের ব্যবধানে এ সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২ লাখ টনে। ইলিশ রফতানির মাধ্যমে আসে দেড়শ থেকে তিনশ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, যার অর্থমূল্য আনুমানিক সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। এছাড়া ভারতে ২০ শতাংশ, মিয়ানমারে ১৫ শতাংশ এবং আরব সাগর, প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোতে বাকি ৫ শতাংশ ইলিশ ধরা পড়ে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদনদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার নদনদীতে এই মাছ পাওয়া যাচ্ছে।

উৎপাদন বৃদ্ধিতে নতুন আশা

মাছের উৎপাদন-সাফল্য উৎসাহজনক হলেও উৎপাদন সম্ভাবনা রয়েছে এর চেয়ে বহুগুণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে লবণাক্ত পানিতে মাছের উৎপাদন ছিল ছয় লাখ ৯৭ হাজার টন, মিঠা পানির মাছের উৎপাদন ছিল ৩৩ লাখ ২০ হাজার টন। আবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের ভিশন ২০২১-এ দেশের মাছের উৎপাদন ৪৫ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে ১০ লাখ টন বেশি। বিবিএসের সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী দেশে গড়ে মাছের বার্ষিক উৎপাদন সাড়ে ৩৫ লাখ টন। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চাষ করা মাছের পরিমাণই প্রায় ২০ লাখ টন। জাটকা সংরক্ষণের ফলে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে এখন সাড়ে ৩ লাখ টন। দেশের প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমিতে সামাজিকভাবে প্রচলিত পদ্ধতিতে ৩৫ হাজার টনের চিংড়ি উৎপাদিত হয়। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সঠিকভাবে চিংড়ি চাষ করা সম্ভব হলে দেশের প্রায় ২ লাখ ৩০ হেক্টর জমিতে থাইল্যান্ডের মতো অর্থনৈতিক ও পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আড়াই লাখ টন চিংড়ি উৎপাদন করা সম্ভব। শুধু ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রতিবছর ৫ হাজার কোটি টাকার চিংড়ি উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট মৎস্যসম্পদের উৎপাদন ও প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণায় ১৬ শতাংশ অধিক উৎপাদনশীল রুইজাতীয় মাছের নতুন জাত এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে চাষ ব্যবস্থাপনা ও প্রজননবিষয়ক ৪৯টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

মাছ চাষে বিপ্লব প্লাবন ভূমিতে

১৯৮৬ সালে দাউদকান্দিতে প্রথম প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ শুরু করেন ধানুয়াখোলা গ্রামের সুনীল কুমার রায়। প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ প্রকল্পের ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, দাউদকান্দির সবচেয়ে বড় খামারগুলোর মধ্যে এশিয়া, প্রশান্ত, পানকৌড়ি ও খিরাই মৎস্য প্রকল্প ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। জানা গেছে, দাউদকান্দির বিভিন্ন গ্রামের ৬০ হাজার পরিবার চলছে মাছ চাষের আয় দিয়ে। এসব খামার থেকে বছরে লাভ হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৩ হাজার মানুষের। দাউদকান্দি উপজেলার ২০ হাজার বিঘা জমির প্লাবন ভূমিতে উৎপাদিত হয় ৮২ হাজার ৭৬৭ টন মাছ। প্রতি মৌসুমে উৎপাদন হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকার মাছ। মাছের চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে দূর হচ্ছে বেকারত্ব। এ ছাড়া মেঘনা, হোমনা, মুরাদনগর, তিতাস, মনোহরগঞ্জ, লাকসাম ও নাঙ্গলকোট উপজেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাছ উৎপাদন হচ্ছে। চাষ হচ্ছে নানা রঙের দেশীয় মাছ- সরপুঁটি, তেলাপিয়া, রুই, মৃগেল, সিলভার কার্প ও কৈ মাছ।

সম্ভাবনাময় ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ

চাঁদপুর জেলার ডাকাতিয়া নদীতে থাইল্যান্ডের প্রযুক্তি অনুকরণে ২০০২ সাল থেকে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় মেঘনা নদীর রহমতখালী চ্যানেলে সাড়ে চারশ এবং পাঁচশ খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া করা হচ্ছে; যা থেকে উৎপাদিত হচ্ছে বছরে ৭০০ টন রপ্তানিযোগ্য তেলাপিয়া। আনুমানিক ৭৫০ বছর আগে চীনের ইয়াংঝি নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ শুরু হয়। তবে আমাদের দেশে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় খাঁচায় মাছ চাষ ক্রমাগতভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আমাদের দেশের নদী কিনারায় বসবাসরত জনগণ বিশেষ করে দরিদ্র জেলেগোষ্ঠী শুধু নদী থেকে প্রাকৃতিক মাছ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এসব মৎস্যজীবীকে সংগঠিত করে মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, সেই সঙ্গে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ করে নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজাতিগুলোর প্রজনন মৌসুমে তাদের নিবৃত্ত করে নদীর প্রাকৃতিক মাছের মজুত বাড়ানো ও বিভিন্ন মাছের প্রজাতি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

রপ্তানি আয়ের অবারিত দিগন্ত

মৎস্য উৎপাদন ও রফতানিতে নতুন আশাবাদে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাছের ফেলে দেওয়া অংশ দিয়ে তৈরি স্যুপ বিক্রি হচ্ছে পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নামিদামি রেস্তোরাঁয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, অপ্রচলিত এই পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে আয় করছে শত কোটি টাকা। ইউরোপসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এসব অপ্রচলিত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। রপ্তানিকারকদের সূত্রে জানা যায়, কার্প জাতীয় মাছের আঁশ, চিংড়ির মাথা ও খোসা, কাঁকড়ার খোলস, মাছের বায়ু থলি, হাঙরের লেজ, ডানা, চামড়াসহ বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হচ্ছে ইতালি, জাপান, কোরিয়া, চীন, জার্মানি, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, হংকংসহ বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশ থেকে চীন ও ভিয়েতনামে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ টন চিংড়ির খোসা, মাথা এবং প্রায় ৫০ টন কাঁকড়ার খোলস রপ্তানি হয়। এছাড়া কোরাল, লাক্কা, ঘোড়া মাছ, আইড়, বোয়াল, কামিলা, রুই, কাতলাসহ বিভিন্ন মাছের বায়ু থলি রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি মাসে ১০০ টন মাছের ফোৎনা রপ্তানি করে আয় করছে ২০ লাখ ডলার। এ ছাড়া প্রায় ২০০ টন মাছের আঁশ রপ্তানি হচ্ছে ইতালি, জার্মানি, কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামে। প্রতিমাসে গড়ে ৮টি কন্টেইনারে প্রায় ৮০ টন হাঙর জাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আয় হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ ডলার।

লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads