• বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
রুপালি ইলিশে সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি

কৃষি অর্থনীতি

ফিরে আসছে প্রাচুর্য

রুপালি ইলিশে সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশ

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ১৮ নভেম্বর ২০২০

অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় এ বছর আকারে বড় বড় ইলিশ ধরা পড়ছে। মৌসুমে বাজারে ছিল ইলিশের সরগরম উপস্থিতি। সাগর থেকে ট্রলারভরতি ইলিশ নিয়ে তৃপ্তির হাসিতে ঘাটে ফিরেছেন জেলেরা। আড়তে, বাজারে, পাড়ার অলিতে-গলিতে ভ্যানে করে বিক্রি হতে দেখা গেছে বড় বড় ইলিশ। দামও ছিল হাতের নাগালে। দক্ষিণের সব ইলিশ মোকামে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য। করোনার এই দুঃসময়ে ইলিশের দাপট ছিল মাছের বাজারে। অনলাইনের মাধ্যমে ইলিশ বাসায় বাসায় পৌঁছে দিয়ে জমজমাট ব্যবসা করেছেন অনেকে। বহু বছর পর ইলিশের প্রাচুর্য দেখে ভাবতে ইচ্ছে করছে সত্যিই কী ফিরে আসছে রুপালি ইলিশের ঐতিহ্যের দিন! দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠা ইলিশের সরবরাহ এবার বেড়েছে। ইলিশের উৎপাদন বাড়িয়ে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে বিশ্ব উদাহরণ। গবেষকরা বলছেন, ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ প্রথম। মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ইলিশ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশই উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে। মাত্র চার বছর আগেও এই উৎপাদনের হার ছিল ৬৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ইলিশের খ্যাতি তার অসাধারণ স্বাদ ও গন্ধের কারণে। তবে এর পুষ্টিগুণও যথেষ্ট। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ইলিশে রয়েছে পর্যাপ্ত প্রোটিনের পাশাপাশি ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড যা রক্তের কোলেস্টেরল কমিয়ে হূৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখে। ইলিশে রয়েছে শিশুদের মেধাবর্ধক উপাদান ডেকাসো হেক্সানয়েড এসিড। এছাড়াও রয়েছে আয়োডিন, ফসফরাস, ক্যালশিয়াম, নিয়াসিন, ট্রিপ্টোফ্যান, ভিটামিন বি-১২ ভিটামিন ডি, জিংক জাতীয় উপকারী খাদ্য উপাদান।

সৌরভে গৌরবে বাংলার ইলিশ

ইলিশ নিয়ে গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছড়া, কবিতা, শ্লোক, প্রবাদ, কথকতা, উপকথা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ববাংলায় একটি ছড়া বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল- ‘ইলিশ মাছের তিরিশ কাঁটা, বোয়াল মাছের দাড়ি/ ইয়াহিয়া খান ভিক্ষা করে/ শেখ মুজিবের বাড়ি।’ জাতীয় মাছ ইলিশ বলে কথা। এক হিসাবে দেখা গেছে, মৌসুম ছাড়া এক জোড়া ইলিশ কিনতে প্রথম শ্রেণির একজন কর্মকর্তার বেতনের ১০ শতাংশ ব্যয় করতে হয়। স্বাদে-গন্ধে এর অতুলনীয় স্বাতন্ত্র্যের জন্যই বাঙালির রসনা-পার্বণে ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে ঠাঁই নিয়েছে ইলিশ। বাংলার মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের সংসারে এক মাসে এক হাজার টাকার বেশি মাছ কেনার সামর্থ্য কটি পরিবারের আছে। উৎপাদন বাড়লেও দিন দিন সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে বাঙালির প্রিয় মাছ ইলিশ।

ইলিশ পরিযায়ী মাছ

ইলিশের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ইলিশের চেয়ে অনেক বড় মাছ আছে, তারপরও মাছের রাজা ইলিশ। মজার বিষয় হলো, ইলিশের স্থায়ী ঠিকানা নেই। এরা পরিযায়ী মাছ। আন্তর্জাতিক মাছও বলা যায়। কারণ সারা বিশ্বের মহাসাগর, সাগর, উপসাগরে নানা নামে ইলিশের বিচরণ। ইলিশের বিচরণও বেশ মজার। সাগরের লোনাপানি থেকে নদীর মিঠা পানিতে। সেখান থেকে ফের সাগরের লোনাপানিতে। প্রজনন মৌসুমে বা ডিম ছাড়ার মৌসুমে স্ত্রী-পুরুষ ইলিশ ঝাঁক বেঁধে অনুকূল পরিবেশের জন্য সমুদ্র থেকে বের হয়ে পড়ে। নদীর মোহনায় মিঠা পানিতে ডিম ছাড়ে। মিঠা পানিতে শিশু ইলিশ জন্মে সাগরের পানিতে ফিরে যাওয়ার পর্যায়ে বড় হতে থাকে। ব্রিটিশ গবেষক হ্যামিল্টন বুকানন ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গোপসাগরে মাছ নিয়ে গবেষণার পর্যায়ে ইলিশকে হিলসা নামকরণ করেন। পরবর্তী সময়ে ফিসার ও বিয়ানিক নামের দুই গবেষক ইলিশকে ‘টেনুয়ানোসা’ ভুক্ত করেন। বিশ্বে পাঁচ প্রজাতির টেনুয়ানোসা পাওয়া যায়। যার মধ্যে তিন প্রজাতি বাংলাদেশে মেলে। ইলিশ (টি-ইলশা), চন্দনা ইলিশ (টি-টলি) ও গুর্তা ইলিশ (এইচ-কি-লি)। এর মধ্যে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশ বিশ্বখ্যাত ইলিশ।

ইলিশ ধরার গল্প

ইলিশ নিয়ে এত কথা, এত নাম-ডাক। কেমন আছেন ইলিশের জেলেরা, সে খবর কি কেউ রাখেন? ইলিশ মাছ সাধারণত দুভাবে ধরা হয়- নৌকা বা ট্রলারে করে। ট্রলারযাত্রায় নদীতে একটানা ১০-১৫ দিন থাকতে হয়, তাই মাঝনদীতে যাওয়া-আসা আর থাকার বন্দোবস্ত করা লাগে। অন্যদিকে নৌকায় ইলিশ ধরতে গেলে ৩-৪ ঘণ্টা পর ফেরত আসা যায়। মাছ বিক্রির টাকা থেকে নৌকা বা ট্রলারের মালিক পায় ৩৮-৪০ ভাগ, বাকিটা জেলেরা ভাগাভাগি করে নেয়। জেলেদের থেকে মাছগুলো নৌকা বা ট্রলারের মালিক কিনে নেয়। সেখান থেকে আবার কিছু মাছ ফাও দিতে হয়। জেলেদের অভিযোগ, যখন তারা বেশি মাছ ধরে, ব্যবসায়ীরা তখন ইচ্ছে করে মাছের দাম কমিয়ে দেয়। অবশ্য মালিকপক্ষ বলে, ট্রলারের মেরামত, নদীতে থাকা-খাওয়ার খরচ, জালের খরচ সবই তাকে বহন করতে হয়। তার ভাগে যে বেশি পড়ে এ অভিযোগ সত্য নয়। তাছাড়া ইলিশ ধরার জাল দুই বছরের বেশি টেকেও না। মৎস্যজীবীদের ইলিশ ধরার নিজস্ব ধর্মীয় রীতির আচার অনুষ্ঠানও আছে। মুসলমান জেলেরা নতুন নৌকা বা ট্রলার নামানোর আগে কোরআন খতম দেয়, মিলাদ পড়ায়। আর হিন্দু জেলেরা নৌকায় জল ছিটিয়ে পূজার মতো আয়োজন করে। প্রথম ইলিশ ধরা পড়লে থালায় সিঁদুর দিয়ে সাজিয়ে বরণ করে নেয়। জেলেরা মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার নিয়ে নৌকা বা ট্রলার নামায় নদীতে, এটাকে বলা হয় দাদন। অনেক সময় দাদনের সুদের ভার প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহন করতে হয়।

ইলিশের বাঁচামরা

জেলেদের জালে ধরা না পড়লে একটি ইলিশ সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। প্রতিটি ইলিশ গড়ে ১০-১২ লাখ ডিম ছাড়ে। তবে একটি ইলিশের সর্বোচ্চ ২১ লাখ ডিম ছাড়ার প্রমাণ রয়েছে গবেষণায়। যে পরিমাণ ডিম দেয় তার মধ্যে মাত্র ১০ ভাগ ইলিশ উৎপাদন হয়, অবশিষ্ট ডিম নষ্ট হয় নতুবা অন্য মাছে খেয়ে ফেলে। সে হিসাবে প্রতি লাখ ডিমে ১০ হাজার ইলিশ জন্মে। নদীতে ডিম ছাড়ার ৭০ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এক সেন্টিমিটার আকৃতিতে ইলিশ বাচ্চার জন্ম হয়। এক মাসে সেটি আড়াই সেন্টিমিটারে পরিণত হয়। মা ইলিশ জেলেদের জালে ধরা না পড়লে প্রজনন করা বাচ্চা নিয়ে তিন মাস পর্যন্ত নদীতে ঘোরাঘুরি করে। এ সময়ের মধ্যে ইলিশের বাচ্চার আকৃতি হয় ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত। এগুলো বড় হওয়া নিশ্চিত করতে দেশের নদনদীর পাঁচটি অভয়াশ্রমে পর্যায়ক্রমে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস করে ইলিশসহ সব মাছ নিধন নিষিদ্ধ থাকে। এর পরই মা ও বাচ্চা ইলিশ যে যার মতো স্বাধীনভাবে ঘোরাঘুরি করে একপর্যায়ে গভীর সাগরে চলে যায়। সেখানেও তাদের জীবনায়ু বৃদ্ধিতে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত গভীর সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এক বছর পর ফের পেটে ডিম এলে মা ও আগের বছরের বাচ্চা ইলিশ প্রজননের জন্য আবারও আগের নদীতে চলে আসে, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল।

হাওরে ‘সুস্বাদু ইলিশ’

জাতীয় মাছ ‘ইলিশ’ এখন হাকালুকি হাওরে। স্থানীয় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে উঠে এসেছে বাঙালির অতিপ্রিয় ইলিশ। স্থানীয় মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, সিলেটে ফেঞ্চুগঞ্জ এবং গোপালগঞ্জ উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওর। প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর আয়তনের এ হাওরটি দেশের বৃহত্তম হাওর। সম্প্রতি জেলেদের জালে ধরে পড়েছে ইলিশ। অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামার কারণে পরিপূর্ণ হাওরে স্থানীয় জেলেদের জালে দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছের সঙ্গে উঠে আসে ইলিশ। ২০১৬ সালেও এ হাওরে ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল বলে স্থানীয় মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়।

সারা বছর পাওয়া যাবে ইলিশ

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২৫০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সরকার। এটি বাস্তবায়ন হলে সারা বছরই ইলিশ পাওয়া যাবে। চলতি সময় থেকে ২০২৪ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় মা-ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে মৎস্য সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।  জেলেদের ১০ হাজার বৈধ জাল বিতরণ ও প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হবে।  প্রকল্পের আওতায় ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রমে সুরক্ষা দেওয়া হবে। নিম্ন মেঘনা নদী, তেঁতুলিয়া নদী, আন্ধারমানিক নদী, নিম্ন পদ্মা নদীতে নির্দিষ্ট সময়ে মা ইলিশ আহরণ বন্ধ করা হবে। ইলিশ মাছ বাংলাদেশের প্রায় সব প্রধান নদ-নদী, মোহনা এবং উপকূলে ডিম ছেড়ে থাকে। তবে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে ইলিশের চারটি প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে।  সেগুলোতে পাহারা দেওয়া হবে। মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ইলিশের ৬টি অভয়াশ্রম পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করা হবে। ইলিশ অভয়াশ্রম সংলগ্ন ১৫৪টি ইউনিয়নের জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১ হাজার ২৩২টি সভার আয়োজন করা হবে। এছাড়া ৬০টি নানা ধরনের কর্মশালার আয়োজন করা হবে। অভিযান পরিচালনার জন্য ১৯টি বোট কেনাসহ মা ইলিশ সংরক্ষণে ১৩ হাজার ৪০০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। জেলে পরিবারে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ১৮ হাজার জেলেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads