• রবিবার, ৭ মার্চ ২০২১, ২৩ ফাল্গুন ১৪২৬
টেকসই উন্নয়নে অবারিত হোক দেশীয় শিল্প বিকাশ নীতি

সংগৃহীত ছবি

কৃষি অর্থনীতি

সমৃদ্ধির সোপানে দেশীয় শিল্প

টেকসই উন্নয়নে অবারিত হোক দেশীয় শিল্প বিকাশ নীতি

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ৩০ ডিসেম্বর ২০২০

আমাদের দেশে অধিকাংশ শিল্প উদ্যোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যক্তিক বা সামষ্টিক প্রয়োজন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে। এখনো অনেক ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প উদ্যোগ বিকশিত হচ্ছে নিজেদের প্রচেষ্টায়, জনস্বার্থে। সরকারের কাজ আপন চেষ্টায় গড়ে ওঠা শিল্পকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া।  কারণ দেশীয় শিল্পবান্ধব নীতি টেকসই উন্নয়নের মোক্ষম হাতিয়ার হতে পারে। দেশের ব্যাংকগুলোতে জনগণের যথেষ্ট আমানত রয়েছে। পুঁজিবাজারেও রয়েছে জনগণের বিপুল অর্থ। প্রবাসীরা দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। রপ্তানি খাত এগিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতও এখন যথেষ্ট সক্ষম। সরকারের উচিত এসব পুঁজি জাতীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগের রাস্তা তৈরি করা। এমন একটি অর্থনৈতিক কৌশল দরকার, যাতে দেশি পুঁজির দক্ষ ব্যবহার হবে এবং বিদেশি ঋণ নির্ভরতা কমবে। জনগণকে সচেতন করলে জাতীয় অর্থনীতিতে ভর্তুকির চাপ কমবে। সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে দূর হবে সামাজিক অসন্তোষ।

একটি দেশ ধনী হতে গেলে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং অনেক সময় খনিজসম্পদ, যেমন তেল, গ্যাস ইত্যাদির সঞ্চয় উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার বদলে ব্যাহত করে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদের অভাবের কারণে সমৃদ্ধির দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে অনেক দেশ। যে-কোনো দেশকে ধনী করার উপায়ের মধ্য অন্যতম দাওয়াইগুলোর মধ্যে রয়েছে— দেশের জনগণের বিনিয়োগের নিরাপত্তা, দেশীয় শিল্প বিকাশে প্রণোদনা, সুসংহত অর্থনৈতিক উন্নয়নে শাসন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ, যেমন- ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোগকে সহায়তা করা। বলা হয়ে থাকে, যদি কোনো দেশ উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায় তাহলে সে দেশে অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কেননা প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং সরকারের শিল্পবান্ধব ভূমিকার মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আমাদের দেশের বাস্তবতায় যে পরিমাণ বিনিয়োগ হওয়া উচিত, সে তুলনায় দেশে বিনিয়োগ অনেক কম। বাস্তবিক পক্ষে দেশের অর্থনীতিতে যে পরিমাণ অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় হয়, বিনিয়োগের পরিমাণ সে হার কেউ ছুঁতে পারে না। তাই আমাদের দেশে বিনিয়োগের কর্মকৌশল নিয়ে ভাবা দরকার। অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ৫ দশকের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে এগুতে হবে। বেসরকারি খাতে শিল্প উদ্যোগকে শুধু উৎসাহিত করলেই চলবে না, বেসরকারি উদ্যোগ কিভাবে সফলতা পেতে পারে সে বিষয়েও দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।  কেননা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারি বেসরকারি উদ্যোগের কোনোই বিকল্প নেই।

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ইয়ংয়ের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো একটি প্রক্রিয়া বা চলনশীল গতি, যার দ্বারা দীর্ঘকালীন মেয়াদে একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রকৃত জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তিত হয় এবং সমাজে নতুনতর গতিবেগ সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল নির্ধারকসমূহ হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ, পুঁজির সরবরাহ, সংগঠন ও সংগঠক, প্রকৌশলগত ও কারিগরি উন্নতি ইত্যাদি। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ ড. নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, অর্থনীতিতে প্রাপ্ত দেশীয় পুঁজির দক্ষ ব্যবহার হচ্ছে না। সত্যিই আমাদের দেশে পুঁজির অভাব নেই। সরকারের কাজ হলো আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষকতা করা। উন্নয়নের জোয়ারে সর্বসাধারণকে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। বিনিয়োগ ক্ষেত্র সৃষ্টি করা এবং নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করে সৃজনশীল উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। ভারতে দেশীয় শিল্প বিকাশ নীতির অধিকতর মূল্যায়নের ফলে ভারতে গড়ে উঠেছে— সাহারা, টাটা, রিলায়েন্স, আমুল-এর মতো বিশ্ব বিস্তৃত প্রতিষ্ঠান। অপরপক্ষে স্বাধীনতার ৫০ বছরে পদার্পণ করলেও বাংলাদেশের সরকারগুলোর অভ্যন্তরীণ শিল্প বিকাশ নীতি সংকোচন প্রবণতার কারণে উদ্যেক্তারা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হন। যার ফলে বিকিশিত হতে পারছে না দেশীয় শিল্পের ডালপালা। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের ধারণা, দেশীয় শিল্প বিকাশের যথাযথ সুযোগ পেলে এদেশেও দু-চারটা টাটা, সাহারা, রিলায়েন্স গড়ে ওঠা অসম্ভব কিছু নয়। তবে আশার খবর হলো বাংলাদেশেও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। তাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী রপ্তানির মাধ্যমে বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের নাম। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশীয় শিল্পবিকাশে বহুমুখী সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। যার ফলে চলতি দশকে দেশীয় শিল্প ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ ধরনের শিল্প উদ্যোগের ভূমিকা বিরাট ফলপ্রসূ এবং আশাব্যঞ্জকও বটে। বিজ্ঞজনরা মনে করেন, এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করার পাশাপাশি দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের আরো সুযোগ দিয়ে শিল্প বিকাশের পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বিপুল বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।

অর্থনীতি বিকাশের নেতৃত্বে বেসরকারি খাত

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটির নাম ‘বাংলাদেশস জার্নি টু মিডল-ইনকাম স্ট্যাটাস : দ্য রোল অব দ্য প্রাইভেট সেক্টর’। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, মজুরি বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিরসন-সবই হচ্ছে ব্যক্তি খাতের হাত ধরে। মোট শ্রমশক্তির ৯৫ শতাংশ বা ৫ কোটি ৭০ লাখ কর্মসংস্থান হয় ব্যক্তি খাতে। এ ছাড়া দেশের মোট রাজস্বের ৮ শতাংশেরই জোগান দিচ্ছে শীর্ষ ১০ করদাতা প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০০-এর বেশি পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত বড় শিল্প গ্রুপ আছে। তবে এর মাত্র ১০ শতাংশ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। দেশের এই বেসরকারি খাতকে নানা স্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। যেমন, প্রথম স্তরের সময়কাল ছিল ১৯৭১ থেকে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। পাকিস্তানিরা তখন বিদায় নিয়েছে। এরপর শিল্প খাতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে হলেও পা রাখতে শুরু করেন। বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ারও শুরু হয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তৈরি পোশাক খাতও সফলতা পেতে শুরু করে এ সময়েই। দ্বিতীয় স্তরের সময়কাল ১৯৯০-এর দশক থেকে, শেষ ২০১০ সালে। এ সময়টা ছিল বেসরকারি খাতের জন্য স্বর্ণযুগের মতো। অর্থনীতির উদারীকরণ নীতি ও একটি কার্যকর শিল্পনীতির সুফল পুরো মাত্রায় গ্রহণ করে দেশের বেসরকারি খাত। ক্রমবর্ধমান সেবা খাত, বিশেষ করে আর্থিক সেবা খাত এবং ওষুধ ও আবাসন খাতের বিস্তার ঘটে এ সময়। এরপরের স্তর শুরু ২০১০ সালের পর থেকে। সময়টা ছিলো নিজেদের সুসংহত করার সময়। প্রতিবেদনে দেশের বেসরকারি খাতের বিশ্লেষণ ছাড়াও আয়ের দিক থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন শীর্ষ ২৩টি বড় গ্রুপ বা কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছে। দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রামভিত্তিক এ কে খান গ্রুপ আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে বড়। শীর্ষ ১০-এ এরপরেই আছে বসুন্ধরা গ্রপ, মেঘনা গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, বেক্সিমকো, ইউনাইটেড গ্রুপ ও সিটি গ্রুপ। এদের সবার বার্ষিক আয় ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি। ১০০ কোটি ডলার আয়ের আরও তিন প্রতিষ্ঠান হচ্ছে পিএইচপি গ্রুপ, প্রাণ ও পারটেক্স গ্রুপ। পরের ১১ শীর্ষ গ্রুপের আয় ৫০ থেকে ৯০ কোটি ডলারের মধ্যে। এই তালিকায় আছে নোমান গ্রুপ, বিএসআরএম, কেডিএস গ্রুপ, হা-মীম, এসিআই লিমিটেড, ট্রান্সকম, ভিয়েলাটেক্স, প্যাসিফিক জিনস, কনফিডেন্স গ্রুপ ও ওয়ালটন।

শিল্পায়নে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

স্বাধীনতার পাঁচ দশকে শিল্পায়নের অগ্রযাত্রায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তলাবিহীন ঝুড়িখ্যাত রাষ্ট্র এখন তৈরি পোশাকের বৃত্ত ভেঙে গাড়ি থেকে জাহাজ, সিমেন্ট থেকে কাগজ, ওষুধ থেকে পাদুকা, ইস্পাত থেকে বিলেট নানা শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে এসব খাতে। সত্তর দশকের কুটিরশিল্প আর আশির দশকের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বাংলাদেশে স্থাপন হচ্ছে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা। অর্থনীতিকে নিয়ে যাচ্ছে নতুন উচ্চতায়। দেশে এখন পরিবেশবান্ধব নতুন নতুন গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়ে উঠছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল তৈরি পোশাক খাতে বিশ্বের সেরা ১০টি গ্রিন ফ্যাক্টরির যে স্বীকৃতি দিয়েছে এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়সহ ৭টি বাংলাদেশের। এসব ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন হচ্ছে উচ্চমূল্যের পোশাক ও ডেনিম পণ্য। চীনকে হটিয়ে ইউরোপের বাজারে এখন শীর্ষস্থান দখলে নিয়েছে বাংলাদেশে তৈরি ডেনিম পোশাক। এক দশক আগেও দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় বড় প্রকল্পে বিদেশি কোম্পানির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। এখন এ ধরনের বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে দেশীয় শিল্প গ্রুপ।

মাহাথিরের বিনিয়োগ নীতি অনুসরণীয়

বলা হয়ে থাকে, যদি কোনো দেশ উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায় তাহলে সে দেশে অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কেননা প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং সরকারের শিল্পবান্ধব ভূমিকার মধ্যে নিরিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। এ ক্ষেত্রে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদের বিনিয়োগ নীতিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত দারিদ্র্যপীড়িত বৃক্ষমানবের দেশ মালয়েশিয়াকে মাহাথির মোহাম্মদ মাত্র দুই দশকে অনগ্রসরতার পাতাল থেকে সগর্বে আরোহণ করালেন অগ্রগতির পাহাড়ের চূড়ায়। মাহাথির বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা দাতা সংস্থার পরামর্শ এড়িয়ে নিজের চিন্তা-চেতনায় দেশের জন্য যা মঙ্গলকর তাই করেছেন। মাহাথির মোহাম্মদ মন্ত্রীদের কাছে ব্যবসায়ী সমাজের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেন। ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়মিত সংলাপ চলমান থাকে। তাদের অভিযোগ ও প্রস্তাব শুনে সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হয়। সে সময় মালয়েশিয়ায় উৎপাদন খাতের কোনো বিশেষজ্ঞ, পুঁজি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও বাজার বিষয়ে জ্ঞানও ছিল না। সে ক্ষেত্রে শিল্পায়নের একমাত্র উপায় ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো। পাশাপাশি দেশীয় শিল্প বিকাশকে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা দিয়ে শক্তিশালী করা হলো। যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঘাড় নাড়ালেও মালয়েশিয়ার উন্নয়ন ব্যাহত না হয়।

প্রেরণার উৎস দেশীয় শিল্প বিকাশ নীতি

আমাদের দেশীয় শিল্প বিকাশ নীতি বাস্তবায়িত হলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শিল্প উদ্যোগ একটি সামাজিক, ব্যক্তিক, রাষ্ট্রীয় ও মনস্তাত্ত্বিক বোধ পরিবর্তনের আন্দোলন। মধ্যযুগে ইউরোপের প্রটেস্ট্যান্ট এথিকস্ আন্দোলনের ফল ইউরোপের শিল্প বিপ্লব। পরবর্তীকালে সে পথ অনুসরণ করে উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশ। যারা ধন ও মানের পাশাপাশি বিশ্ববাসীর কাছ থেকে সমীহ আদায় করতেও সমর্থ হয়েছিল। তাই শুধু কৃষি নির্ভর দেশ পৃথিবীতে অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে প্রমাণ পাওয়া অসম্ভব হবে। কাজেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্প বিকাশ নীতিকে অগ্রাধিকারের মানসিকতায় নিয়ে আসার বিকল্প নাই। কেননা শিল্পকে বিকশিত হতে না দিলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বন্ধ হবে। ফলে সরকারের ওপর কর্মসংস্থান সৃষ্টির চাপ বাড়বে। বাড়বে মাদকতা, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, জঙ্গিবাদ, খুন, ধর্ষণসহ বহুবিধ অপরাধ কার্যক্রম। আর এসবের দায় অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা হিসেবে সরকারের ওপর চাপবে। সেকারণে কোনো সরকার পরপর দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকতে পারেনা। অথচ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যে-কোনো সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সফল বাস্তবায়ন ৮-১০ বছরের নিচে সম্ভব নয়। অথচ আমাদের দেশে সরকারগুলো পরপর দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকতে পারে না। এ কারণে সরকারের অনেক গৃহীত পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনা। সুফল পায় না দেশের মানুষ। পরবর্তী সরকার এসে এগুলোকে বাতিল করে দেয়।

শিল্প উদ্যোক্তাদের সাথে সরকারের সমন্বয় প্রয়োজন

সরকারের একক প্রচেষ্টায় একটি দেশের আর্থসামাজিক অবকাঠামোর পরিবর্তন সম্ভব নয়। যেমন সরকার চাইলেও পারেনা ইচ্ছেমতো দ্রব্যমূল্যকে নিয়ন্ত্রতে রাখতে। ব্যবসায়ী বা শিল্প উদ্যোক্তাদের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে হয়। আমাদের দেশে শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা অসদুপায় অবলম্বন করেন বললে পরিপূর্ণ সঠিক বলা হবে না। কেননা প্রচলিত অনিয়মতান্ত্রিক জটিলতার ধারায় ব্যবসার ক্ষেত্রে নির্ধারিত পথ অবলম্বন করলেই অনেক নিয়ম ও আইনি জটিলতা এড়িয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনি সীমারেখা অতিক্রম করলেও দোষের কিছু হয় না। এসব কারণে শিল্প উদ্যেক্তাদের দায় দেয়া যায়না। আমাদের প্রশাসনিক অবকাঠামো এবং ব্রিটিশ আইনগুলোকে যুগোপযোগী করাই বরং অধিক যুক্তিযুক্ত। আমাদের দেশে অধিকাংশ শিল্প উদ্যোগ প্রতিষ্টিত হয়েছে ব্যক্তিক বা সামষ্টিক প্রয়োজন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে। এখানে সরকারের কোনো প্রণোদনা ভূমিকা নেই। এখনো অনেক ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প উদ্যোগ বিকশিত হচ্ছে নিজেদের প্রচেষ্টায়, জনস্বার্থে। তাই এধরণের উদ্যোগকে আইনগত সীমাবদ্ধতার অজুহাতে আটকে দিলে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জন দুরূহ হবে। সরকারের কাজ আপন চেষ্টায় গড়ে ওঠা শিল্পকে বিকশিত হবার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। তার জন্য পৃথক আইন অথবা সংশোধিত আইন প্রণয়ন করা। নাগরিকরা যদি নিজেদের প্রচেষ্টায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেয় সেটা তো সরকারেরই সহায়ক পদক্ষেপ। সরকার কোনো যুক্তিতেই এই সম্ভাবনার পথে বাধা হতে পারে না। বর্তমান সরকার যদি শিল্প উদ্যোক্তাদেও সাথে বসে ১০ বছরের একটি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা উদ্যোগী হয় সেটাই হবে দেশের সমৃদ্ধির মূলমন্ত্র। দেশীয় শিল্প বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শ্রমঘন শিল্প স্থাপন হতে পারে দিনবদলের হাতিয়ার।

আমাদের দেশে ব্যাংকে জনগণের যথেষ্ট আমানত রয়েছে। পুঁজি বাজারেও রয়েছে জনগণের বিপুল অর্থ। প্রবাসীরা দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। রপ্তানি খাত এগিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতও এখন যথেষ্ট সক্ষম। সরকারের উচিত এসব পুঁজি জাতীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগের রাস্তা তৈরি করা। এমন একটি অর্থনৈতিক কৌশল দরকার, যাতে দেশি পুঁজির দক্ষ ব্যবহার হবে এবং বিদেশি ঋণ নির্ভরতা কমবে। জনগণকে সচেতন করলে জাতীয় অর্থনীতিতে ভর্তুকির চাপ কমবে। সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে দূর হবে সামাজিক অসন্তোষ। 

লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এবং কলামিস্ট  

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads