• রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৫
ads
ছোটরা আটকে যায় বড়রা বেরিয়ে যায়

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)

ছবি : সংগৃহীত

বিশ্লেষণ

সংবাদ বিশ্লেষণ

ছোটরা আটকে যায় বড়রা বেরিয়ে যায়

  • মোহাম্মদ আবু নোমান
  • প্রকাশিত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের আটটি জেলার ১১টি সরকারি হাসপাতালে একযোগে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের এনফোর্সমেন্ট দলের সমন্বয়ক ও মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী জানিয়েছেন, এ সময় হাসপাতালগুলোতে ৪০ শতাংশ চিকিৎসকই কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। উপজেলা পর্যায়ে অনুপস্থিতির হার আরো বেশি, প্রায় ৬২ শতাংশ। দুদকের অভিযান থেকেই বোঝা যায়, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের কী দুরবস্থা।

অনেকেই দুদকের কাজের জায়গা এবং ধরন নিয়ে কথা বলছেন। কেউ বলছেন, এটা কি দুদকের কাজের আওতায় পড়ে? ডাক্তার হাসপাতালে উপস্থিত থাকেন, কী থাকেন না, সেটা দেখার দায়িত্ব কার? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তথা স্বাস্থ্য অধিদফতরের নয় কী? কিন্তু মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর কী করছে। দুদককে যদি মন্ত্রণালয় বা অধিদফতরের কাজ করতে হয়, তাহলে মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর রাখার দরকারটা কী? যাই হোক, দুদক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কার কী করা উচিত। এজন্য দুদককে অভিনন্দন। সর্বসাধারণ দুদকের পাশে রয়েছে। সিভিল সার্জন যদি না জানেন তার কোন ডাক্তার কর্মস্থলে উপস্থিত আছে বা নেই, তাহলে আগে ওই সার্জনের বিচার কী হবে? প্রত্যেক সেক্টরের একজন প্রধান থাকেন যিনি দেখাশোনা করেন। সবকিছু প্রধানের জানার কথা। যদি এর ব্যতিক্রম হয় তবে কারো বুঝতে বাকি থাকে না এখানে দায়িত্বশীলদের গাফিলতি আছে। অফিসের কে সৎ, কে ভালো, কে মন্দ সব জানার কথা অফিস প্রধানের।

চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার প্রথম দায় চিকিৎসকের, যিনি রোগীর সুচিকিৎসা দেওয়ার পেশাগত ওয়াদা করেও তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে চলেছেন। দ্বিতীয় দায় সরকার তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। তারা স্বাস্থ্য প্রশাসনকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেনি। ঊর্ধ্বতনরা যদি নিয়মনীতি মেনে চলেন, অধস্তনদের সেটি মানতে বাধ্য করতে পারেন। আর সেখানে ঘাপলা থাকলে তার জের গিয়ে পড়বে তৃণমূল পর্যন্ত। উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলেও তারা অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে সময় দিচ্ছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় শীর্ষ কর্মকর্তারা মাসের বেশিরভাগ সময়ই অনুপস্থিত থাকেন। এ সুযোগে কনসালট্যান্ট ও মেডিকেল অফিসাররাও কর্মস্থলে ঠিকমতো হাজির থাকেন না। অনেকে সপ্তাহে দুই-এক দিন এসে হাজিরা খাতায় সই করে পুরো মাস অনুপস্থিত থাকেন এবং পুরো মাসের বেতন তোলেন। এসব অভিযোগ সেকেলের হলেও কেন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না? দায়িত্বে অবহেলায় কঠোর ব্যবস্থাসহ চিকিৎসাসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত কবে হবে?

আগে দেখা যেত গ্রামাঞ্চলেই চিকিৎসকরা কর্মস্থলে গরহাজির থাকেন। এখন দেখা যাচ্ছে, রাজধানীর হাসপাতালেও অনেকে অনুপস্থিত থাকেন। এটি যদি তাদের বদভ্যাস হয়ে থাকে, তাহলে সেটি দুদকের অভিযান কিংবা হাজিরা খাতা পরীক্ষা করার মতো ঠুনকো বা আলতু-ফালতু ওষুধে দূর করা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন সমস্যার কারণ খুঁজে বের করে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া।

এ কথাও ঠিক, শতভাগ দায়িত্ব পালনরত সচেতন চিকিৎসকও আছেন। কিন্তু কতিপয়ের জন্য পুরো চিকিৎসক সমাজের ওপর অভিযোগ চলে আসে। স্বাস্থ্য প্রশাসনে কর্মস্থলে চিকিৎসক না থাকাই একমাত্র সমস্যা নয়। অনেক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। অবকাঠামো থাকলেও ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব আছে। ঘাটতি আছে নার্স ও কর্মচারীরও। সেসব পূরণ করতে না পারলে জনসাধারণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা অলীক কল্পনাই মাত্র!

কথায় আছে— ইজ্জত যায় না দইলে, খাইসলত (অভ্যাস) যায় না মইলে (মরলে)। ৩১ জানুয়ারি ২০১৯, গিয়াস উদ্দিনের চাকরির বয়সসীমা শেষ হওয়ার কথা। মো. গিয়াস উদ্দিন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে কর্মরত। জনৈক ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে গ্রেফতার করে। আসলে এভাবে দুদক কতজনকে ধরবে? যে মাছের মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত পচে গেছে, সে মাছকে ফরমালিনে বছরের পর বছর ডুবিয়ে রাখলেও পচনমুক্ত হবে না। সরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রতিটি শাখায় এমন হাজার হাজার গিয়াস উদ্দিন রয়েছে, শুধু অনুসন্ধানের অভাবে খোঁজ মেলে না। বড় বড় চোরেরা অধরাই থাকে আর ছোট চোরদের মাঝে মধ্যে ধবলধোলাই দেওয়া হয়।

এমন ঘুষের সার্কাস সারা দেশেই চলছে। সে সার্কাস দেখতে দেখতে জাতি আজ বাকরুদ্ধ। বাংলাদেশের আইন যেন মাকড়সার জালের মতো! ছোটরা আটকে যায়, আর বড়রা বেরিয়ে যায়! দুদক বড়জোর গিয়াসউদ্দিনের মতো চুনোপুঁটি ধরে আনন্দে লুটোপুটি খেতে পারে। কিন্তু হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিবাজদের ধরা কার সাধ্য?

লেখাপড়া, উজ্জ্বল রেজাল্ট, বিসিএস ক্যাডার হওয়া, আর মনুষ্যত্ব অর্জন করা এক জিনিস নয়। বিসিএস ক্যাডারের মা মৃদুলা রানী সাহার বয়স প্রায় ৮০ বছর। তার পাঁচ ছেলেমেয়ে, সবাই প্রতিষ্ঠিত। ফেনী পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ড মধুপুরের পোদ্দার বাড়ির বাসিন্দা মৃদুলার দুই ছেলে পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করেন, এক ছেলে বিসিএস কর্মকর্তা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে দুই মেয়ে থাকেন শ্বশুরবাড়ি। অথচ মৃদুলাকে গ্রামের বাড়িতে বিনা চিকিৎসায়, না খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে হয়! খোঁজ নেন না কোনো সন্তান। শেষে পুলিশ গিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে এই বৃদ্ধার। মৃদুলা রানী সাহার স্বামী হরিপদ সাহা ছিলেন ফেনী শহরের একজন প্রভাবশালী চাল ব্যবসায়ী।

দুঃখিত মা মৃদুলা রানী, তোমার অপরাধ সীমাহীন! তুমি অতি ব্যস্ত কয়েকটা প্রাণী জন্ম দিয়েছ। আশা করি তাদের সন্তানরা তোমার সন্তানদের চেয়েও ব্যস্ত হবে এক দিন।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads