• রবিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৮, ৬ কার্তিক ১৪২৫
ads
গণহত্যার দায়ে সেনাপ্রধানসহ কর্মকর্তাদের বিচার দাবি

মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্যাতনের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা

সংরক্ষিত ছবি

এশিয়া

তদন্তের পর জাতিসংঘ

গণহত্যার দায়ে সেনাপ্রধানসহ কর্মকর্তাদের বিচার দাবি

# রাখাইনে ধর্ষণসহ সব ধরনের অত্যাচার চালানো হয়েছে # মিয়ানমারের শান্তি ও গণতন্ত্রের অন্তরায় সেনাবাহিনী

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, গণধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওসহ নির্মম নির্যাতনের স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন। এ অপরাধে তারা দেশটির সেনাপ্রধানসহ সামরিক বাহিনীর আরো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। একইসঙ্গে মিয়ানমারে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশটির সেনাবাহিনী প্রধান অন্তরায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার তদন্তকারীরা জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। মিয়ানমারের রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে সেনাবাহিনীর চালানো অভিযান নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনের সারমর্ম এদিনই মানবাধিকার কাউন্সিলের অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। ১৫ মাস ধরে করা তদন্ত শেষে ৪৪০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সদস্যরা প্রতিবেদনে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অন হ্লাইং এবং জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি করার কথাও আছে।

মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যাপ্তির দিক দিয়ে ‘অনন্য’ এই প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর (তাতমাদো) মানবাধিকার ও আইন লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর স্পষ্ট একটি ‘প্যাটার্ন’ চিহ্নিত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে অপরাধের মাত্রা নিয়ে বিশদ আইনি পর্যালোচনা ও সুপারিশ রয়েছে। এই মিশনের নেতৃত্ব দেন ইন্দোনেশিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মারজুকি দারুসমান। সদস্য হিসেবে ছিলেন শ্রীলঙ্কার আইনজীবী নারী অধিকার বিশেষজ্ঞ রাধিকা কুমারস্বামী এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক মানবাধিকার কমিশনার ও দেশটির আইন সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ক্রিস্টোফার ডমিনিক সিডোটি।

মারজুকি দারুসমান প্রতিবেদনে বলেছেন, ‘তাতমাদো যতদিন আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে, ততদিন (মিয়ানমারে) শান্তি ফেরানো সম্ভব হবে না। মিয়ানমারের উন্নয়ন এবং একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পথে দেশটির সেনাবাহিনীই সবচেয়ে বড় বাধা।’ তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারে শান্তি চাইলে সেনাপ্রধান হ্লাইংসহ তাতমাদোর শীর্ষ পর্যায়ের সব কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়ে এই বাহিনীকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে এর পুরো নিয়ন্ত্রণ বেসামরিক প্রশাসনের হাতে থাকে। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক পরিবেশ চাইলে এর কোনো বিকল্প নেই বলে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা মনে করছেন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর শুরু করা সেনাবাহিনীর অভিযানকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়ানমার বলে আসছে, তাদের ওই লড়াই ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে, কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে নয়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সরকারের ওই দাবি নাকচ করে দিয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বলছে, রাখাইনে যে ধরনের অপরাধ হয়েছে, আর যেভাবে তা ঘটানো হয়েছে, মাত্রা, ধরন এবং বিস্তৃতির দিক দিয়ে তা ‘গণহত্যার অভিপ্রায়কে’ অন্য কিছু হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টার সমতুল্য।

গত বছর গঠিত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সদস্যরা বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা ৮৭৫ জন রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার, নথিপত্র, ভিডিও, ছবি এবং স্যাটেলাইট ইমেজ পর্যালোচনা করে তাদের প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তদন্তকারীরা দেখতে পেয়েছেন, রাখাইনে সেনাবাহিনীর নিপীড়নের যে ধরন, তা শান ও কাচিন অঞ্চলে জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ওপর দমনপীড়নের ধরনের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।

প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করা রোহিঙ্গাদের কীভাবে ধাওয়া করে ধরা হচ্ছে- সৈন্যরা প্রথমে তাদের গুলি করছে, তাতেও মৃত্যু না হলে প্রত্যেকের গলা কেটে ফেলা হচ্ছে। তারপর তারা নজর দিচ্ছে নারী ও শিশুদের দিকে। রাখাইনের তুলাতুলি গ্রামে শিশুদেরও কীভাবে গুলি করে মারা হয়েছে, মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে নদীতে বা আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছে- সেসব ভয়ঙ্কর বিবরণও এসেছে প্রতিবেদনে।

এই হত্যাযজ্ঞ শেষে মেয়েদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে গ্রামে। পালা করে ধর্ষণ করার পর কাউকে কাউকে হত্যা করা হয়েছে। বুড়ো, শিশু আর নির্যাতিত নারীদের ঘরের ভেতরে আটকে আগুন দেওয়া হয়েছে বাড়িতে। এই বর্বরতাকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জঘন্যতম অপরাধের নজির হিসেবে বর্ণনা করা জাতিসংঘের তদন্তকারী দলের সদস্য রাধিকা কুমারস্বামী বলেন, ‘রাখাইন, শান আর কাচিন রাজ্যে বর্বরতার যে মাত্রা সেনাবাহিনী দেখিয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা করার মতো আর কোনো ঘটনা আমি দেখিনি।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads