• শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৪ ফাল্গুন ১৪২৪
ads
উল্টোপথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক

সংরক্ষিত ছবি

ব্যাংক

উল্টোপথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ২২ জানুয়ারি ২০১৯

উল্টোপথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকারের উন্নয়ন নীতির চলমান প্রক্রিয়ার বিপরীতেই চলছে দেশের এই প্রধান ব্যাংক। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৩১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার চাচ্ছে ব্যাপকভিত্তিক বেসরকারি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিনিয়োগে লাগাম টানতে চায়। কার্যকরের অপেক্ষায় থাকা ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং পদ্ধতি (আইসিরএস) বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করবে। বাড়বে আমলতান্ত্রিক জটিলতা। ফলে নীতিমালাটি পুনরায় পর্যালোচনা করার দাবি উঠেছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত ডিসেম্বর শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি থেকে এই লক্ষ্যমাত্রা অনেক কম। মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। কিন্তু ডিসেম্বরের প্রবৃদ্ধি গত ৩৯ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় ২০১৫ সালে এমন পরিস্থিতি ছিল। বেসরকারি বিনিয়োগের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী জুলাই থেকে নতুন ক্রেডিট রেটিং নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। গত অক্টোবর থেকে নীতিমালাটি বিদ্যমান নীতিমালার সঙ্গে যুগপৎভাবে কার্যকর রয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং পদ্ধতি (আইসিআরআরএস) একটি শঙ্কা হিসেবে সামনে এসেছে। এতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। আর বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হলে কর্মসংস্থান হবে না, যা সরকারের উন্নয়ন নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই নীতিমালাটি পুরোপুরি কার্যকর করার আগে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার দাবি উঠেছে। অন্যথায় নীতিমালাটি বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা আর প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। ঋণ প্রক্রিয়ায় হয়রানি বাড়বে। বাড়বে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। 

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল মজিদ বলছেন, বিশদ এই নীতিমালা কার্যকর হলে উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। ভালো গ্রাহকরা ঋণ পাবেন। তাদের হয়রানির কোনো সুযোগ নেই। আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও হবে না।

তিনি বলেন, আইনটি সময়োপযোগীভাবে করা হয়েছে। তারপরও কার্যকর করতে গিয়ে কোনো বিচ্যুতি নজরে এলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।

অপরদিকে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আমরা আইসিআরআরএসকে সাধুবাদ জানাই। তবে এটি যাতে বিনিয়োগের পথে কোনো ধরনের বাধা না হয়। তাছাড়া এত বড় একটি নীতিমালা করা হয়েছে, সেখানে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি রাখা উচিত ছিল। কারণ আমরাই ঋণ নিয়ে ব্যবহার করি। সুতরাং ব্যবসায়িক বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতাগুলো আমাদের থেকে ভালো কেউ জানেন না।

এই ব্যবসায়ী বলেন, নীতিমালাটি যদি ভালো হয়ে থাকে, এখানে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি থাকলে আমি বলব আরো বাস্তবসম্মত ও ভালো হতো। তাই কার্যকর করার আগে পুনরায় এটি পর্যালোচনা করতে আমি সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অনুরোধ করব।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসনার সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে আগামী পাঁচ বছরে বেসরকারি বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৭ শতাংশে নিয়ে যেতে চায়।

আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছে, তারা ভিশন ২০২১-৪১ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। নতুন সরকারের শেষ মেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ। মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ২ হাজার ৭৫০ ডলার। বাজেটের আকার দাঁড়াবে ১০ লাখ কোটি টাকা, যা সবশেষ বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫০ বিলিয়ন ডলার করবে এই সরকার। আর জিডিপির ৩৭ শতাংশ হবে বিনিয়োগ হার। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিনিয়োগ তথা অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করতে হবে। বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির চালকের আসনে বসাতে হবে।

সূত্রগুলো বলছে, পুরোপুরি কার্যকরের অপেক্ষায় থাকা আইসিআরআরএস করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি কমিটি গঠন করে। সেখানে চেয়ারম্যান হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবদুর রহিম। তার নেতৃত্বে কমিটিতে সদস্য ছিলেন ১০ জন। তাদের ৯ জনই ব্যাংকার, যার ৬ জন ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা। দুজন দুটি বেসরকারি ব্যাংকের প্রতিনিধি। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও একজন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট-বিআইবিএমের প্রতিনিধি। কিন্তু দেশের ব্যবসায়ীদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি, যারা ঋণ নিয়ে ব্যবহার করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে এই নীতিমালা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণ বিতরণে পদ্ধতি নয়- সরকার কী চাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে নতুন করে খেলাপি ঋণ বাড়া না বাড়া। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পদ্ধতির কথা বলছে, সে পদ্ধতি কাজে আসবে না যদি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার ও ব্যাংকের সদিচ্ছা না থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় বলা হয়, কোনো গ্রাহক ‘চমৎকার’ (এক্সিলেন্ট) বা ‘ভালো’ (গুড) রেটিং পেলে ব্যাংক তাকে অর্থায়ন করতে পারবে। ‘প্রান্তিক’ (মার্জিনাল) রেটিংধারী গ্রাহককে পুরনো ঋণ নবায়ন বা নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তবে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আন-অ্যাকসেপ্টেবল রেটিংধারীকে কোনো পরিস্থিতিতেই নতুন ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো। যদি না আগের ঋণ শতভাগ নগদ পরিশোধ হয় অথবা জামানত দিয়ে ঋণটি আচ্ছাদন করা হয়।

নীতিমালায় আরো বলা হয়, রেটিং করার ক্ষেত্রে গ্রাহকের পরিমাণগত সক্ষমতায় ৬০ শতাংশ নম্বর এবং গুণগত সক্ষমতায় ৪০ শতাংশ নম্বর থাকবে। পরিমাণগত সক্ষমতা সূচকে ৬০ নম্বরের মধ্যে মোট গৃহীত ঋণ ও আর্থিক সক্ষমতায় ১০, চলতি দায় ও তরল সম্পদে ১০, মুনাফার সক্ষমতায় ১০, সুদ পরিশোধের সক্ষমতা ও নগদ প্রবাহের ওপর ১৫, পরিচালনগত দক্ষতায় ১০ এবং ব্যবসার মানের ওপর ৫ নম্বর থাকবে।

এ ছাড়া গুণগত সক্ষমতায় ৪০ নম্বরের মধ্যে কার্যদক্ষতার আচরণে (পারফরম্যান্স বিহ্যাবিয়ার) ১০, ব্যবসা ও খাত ঝুঁকিতে ৭, ব্যবস্থাপনা ঝুঁকিতে ৭, জামানত ঝুঁকিতে ১১, সম্পর্ক ঝুঁকিতে ৩, পরিপালন ঝুঁকিতে ২ নম্বর থাকবে। এই রেটিংয়ে কোনো গ্রাহক ৮০-এর বেশি নম্বর পেলে তাকে ‘চমৎকার’, ৭০-এর বেশি ও ৮০-এর কম নম্বর পেলে ‘ভালো’, ৬০-এর বেশি ও ৭০-এর কম পেলে ‘প্রান্তিক’ এবং ৬০-এর নিচে নম্বর পেলে ‘অগ্রহণযোগ্য’ রেটিং দেওয়া হবে। তবে কোনো গ্রাহক গুণগত রেটিংয়ে যত নম্বরই পাক না কেন, পরিমাণগত রেটিংয়ে ৫০ শতাংশ নম্বর না পেলে তাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ রেটিং দেওয়া হবে।

নীতিমালা অনুযায়ী কিছু খাত-উপখাত নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিল্প খাতের মধ্যে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, খাদ্যপণ্য, ওষুধ, রাসায়নিক, সার, সিমেন্ট, সিরামিক, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা, পাটকল, ইস্পাত ও প্রকৌশল, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য খাত, কৃষিভিত্তিক ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেবা খাতের আবাসন ও নির্মাণ, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, টেলিকমিউনিকেশন ও অন্যান্য সেবার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই রেটিং পদ্ধতি অনুসরণ করে ঋণ দিতে হবে। আইসিআরআরএস নীতিমালায় এমন ২০টি মডেল দেওয়া আছে, যা কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঋণপ্রাপ্তির যোগ্যতা অনুযায়ী ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানতে চাইলে বেসরকারি সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী ওসমান আলী জানান, আমরা নতুন একটি নীতিমালায় যাচ্ছি। ভুলত্রুটি এখনই বলা যাবে না। প্রয়োগ করতে গেলে কোনো সমস্যা বা বিচ্যুতি এলে আমরা সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে আনব।

অবশ্য নীতিমালাটি তৈরির সঙ্গে জড়িত কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, কমিটিতে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধি রাখা দরকার ছিল। কারণ তারাই ব্যাংকের গ্রাহক। ঋণ নিয়ে তারা ব্যবহার করে থাকেন। ফলে ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ পেতে কোনো ধরনের জটিলতায় তারা পড়ছেন, এটা আমাদের পক্ষে স্পষ্টভাবে বুঝতে পারা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads