• মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯, ৫ চৈত্র ১৪২৪
ads
খেলাপিদের বয়কটের চিন্তা

গতকাল বুধবার বিকালে খেলাপি ঋণ কমাতে একটি পরামর্শক সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক

ছবি : সংগৃহীত

ব্যাংক

খেলাপিদের বয়কটের চিন্তা

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। আর বছর ব্যবধানে বেড়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে ঋণখেলাপিদের সামাজিক বয়কট চান সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া তাদের ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংস্কারের পরামর্শ এসেছে।

গতকাল বুধবার বিকালে খেলাপি ঋণ কমাতে একটি পরামর্শক সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে এসব সুপারিশ উঠে আসে। বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকসহ কমিশনের সব সদস্য ও তফসিলি ব্যাংকগুলোর এমডিরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে এতে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সাড়ে তিন ঘণ্টা চলে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক।

বৈঠকে তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক-এমডি ও প্রধান নির্বাহীরা নানা পরামর্শ তুলে ধরেন। এমডিদের এই পরামর্শের সঙ্গে একমত আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক।

আইনজ্ঞরাও বলছেন, দেশে খেলাপি ঋণ কমাতে চাইলে শক্ত পদক্ষেপ দরকার। তবে সবই নির্ভর করবে সরকারের মনোভাব ও সিদ্ধান্তের ওপরে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া কঠোরভাবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে না।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশের খবর কথা বলেছে বেশ কয়েকটি সূত্রের সঙ্গে। সভায় যোগ দেওয়া সূত্রগুলো বলছে, সভায় ব্যাংক খাতের হয়ে অংশ নেওয়া এমডিরা খেলাপি ঋণ বাড়ার বাস্তব দিকগুলো তুলে ধরেন। কেন ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না সেটিও তারা জানান। এজন্য এমডিরা বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় করতে হলে সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এমন চর্চা রয়েছে। ঋণখেলাপিরা ব্যাংকের দায় পরিশোধ করবেন না, কিন্তু বিলাসী জীবনযাপন করবেন, সেটি যাতে না হয়। তাদের পাসপোর্ট নবায়ন আটকে দেওয়া যেতে পারে। দেশের বাইরে যাতে ভ্রমণে যেতে না পারেন। এমনকি দেশের ভেতরে প্লেন টিকেট যাতে কিনতে না পারেন।

বৈঠকে আলোচনা হয়, ঋণখেলাপিদের সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ আটকে দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া এসব ব্যক্তি যাতে গাড়ি কিনতে না পারেন, বাড়ি কিনতে না পারেন সেটি কীভাবে করা যায় ভাবার সময় এসেছে।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল আলম  সাংবাদিকদের বলেন, আজকে (বুধবার) খেলাপি ঋণ নিয়ে সভাটি হয়েছে। এখানে খেলাপি ঋণ কীভাবে কমানো যায় সেটি উঠে এসেছে। আলোচনা শুরু হলো। আলোচনা চলবে।

তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে বিদ্যমান আইনগুলো যদি সংস্কার ও যুগোপযোগী করার দরকার পড়ে সেটি করা হবে। আমরা নিজেরাও পর্যবেক্ষণ করছি এবং ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন, অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইনের কিছু বিষয় সংস্কার দরকার। কারণ অনেকেই ব্যাংকের দায় পরিশোধ না করে আদালতে চলে যাচ্ছেন। সেখান থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসছেন।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, এখানে কোনো পক্ষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানি না হন। তবে ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের ধরা হবে।

ইচ্ছাকৃত খেলাপি কীভাবে শনাক্ত করা হবে প্রশ্নে এই কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেন না কিন্তু বিলাসী জীবন যাপন করছেন এরাই ইচ্ছাকৃত খেলাপি। ব্যবসা করেন ভালো কিন্তু ঋণ পরিশোধ করেন না তারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি।  

তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আজকের (গতকালের) বৈঠকের উদ্দেশ্য একটাই। খেলাপি ঋণ। এটি সরকার চাচ্ছে কমাতে। আমরা তাই চাই। কোনো উপায় নেই। এজন্য পরামর্শক সভা হলো। এরপর আরো সভা হবে। আমরা আমাদের পরামর্শ তুলে ধরেছি। আইনি সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আইন কমিশন, আইন মন্ত্রণালয়, বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় সবাই একসঙ্গে কাজ করবে। বৈঠক করা হবে।

তিনি বলেন, টাকা নিলে ফেরত দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। ঋণ খেলাপিদের সামাজিকভাবে কীভাবে ঠেকানো যায় সেগুলো নিয়ে আলাপ হয়েছে। তবে বিস্তারিত এখনই বলা যাচ্ছে না। আমরা আশাবাদী, নিশ্চয়ই একটা পথ বের করা যাবে।

সূত্রগুলো বলছে, নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। তার ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে তিনি এরই মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করেন সরকারি-বেসরকারি তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে।

জানা যায়, বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষেও বেশকিছু সুপারিশ উঠে এসেছে। ঋণ পুনঃতফসিলিকরণসহ মন্দ ঋণ বেচাকেনার পদ্ধতি চালুর বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসা হয়।

তবে বৈঠকের একটি সূত্র বলছে, খেলাপি ঋণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ, সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে আইন প্রণয়ন করা কঠিন কিছু নয় মর্মে আলোচনা হয়। তবে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ সময় জানান, যত আলোচনাই করা হোক, সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা না থাকলে কার্যকর কিছু করা যাবে না। আইন কমিশনের কথা সরকার আমলে নেবে কি না সেটিও স্পষ্ট নয়।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads