• বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
বড় ঋণে বড় ঝুঁকি

লোগো বাংলাদেশ ব্যাংক

ব্যাংক

বড় ঋণে বড় ঝুঁকি

# বিনিয়োগে পিছিয়ে এসএমই খাত # বড় ঋণ প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা # আদায় না হওয়ায় বার বার পুনঃতফসিল

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ১৮ মার্চ ২০১৯

বড় ঋণের বড় ঝুঁকিতে আটকে গেছে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। যার অর্ধেকই বড় আকারের ঋণের মধ্যে পড়েছে। আর বড় আকারের ঋণ দিয়ে আদায় করতে না পারায় সঙ্কটে রয়েছে অনেক ব্যাংক।

দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। এই হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের। বর্তমানে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ৯৯ দশমিক ৯৩ শতাংশই এসএসই খাতের আওতায়। দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশ আসছে এই খাতের মাধ্যমে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২১ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জনসহ এসডিজি বাস্তবায়নে এসএমই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এখনই। অথচ এ খাতকে অবহেলায় রেখে বড় আকারের ঋণ দিয়ে নিজেরাই সঙ্কট তৈরি করছে ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এসএমই খাতে মোট মোট ঋণ দিয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের একই সময় ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে এসএমই ঋণ কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। অথচ এই সময়ে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।

সূত্রগুলো বলছে, এসএমইসহ ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে যত নিয়মের কড়াকড়ি। ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ পেতে যত প্রক্রিয়া যেন তাদের জন্য। এসব ব্যবসায়ীর জন্য ব্যাংকের ভল্ট খোলা পাহাড় সমান কঠিন। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব সময় তফসিলি ব্যাংকগুলোকে এসএমই ঋণ বাড়াতে উৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের  জন্য ব্যাংকের ভল্ট খোলা। অথচ ব্যাংক থেকে ব্যবসা পরিচালনা করতে ঋণ নিলেও তা ঠিকভাবে পরিশোধ করেন না বড় ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ছোট ব্যবসায়ীরা রেহাই পান না ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের সম্পত্তি নিলামে তোলে ব্যাংকগুলো। কিন্তু ব্যাংকগুলো যেন অসহায় হয়ে ভিড়তে পারে না বড় ও প্রভাবশালীদের কাছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মোট খেলাপি ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ।

২০১৭ সাল শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৭৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা নিয়েছে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যার বড় অংশই নিয়মিত আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। তবে আদায় করতে বড় কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া যায় না। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনাদায়ী ঋণ আদায় করতে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীরা নিজেরাই ছুটে যান ওই সব ব্যবসায়ীর অফিসে, যা রীতিমতো প্রটোকল লঙ্ঘন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তাদের কিছুই যেন করার নেই।

তবে ব্যাংকিং ফন্দিফিকিরেও এসব ব্যবসায়ীর পাশে থাকে ব্যাংকগুলো। ২০১৮ সালে ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ৫৯টি ব্যাংক। এর অর্ধেকের বেশিই করা হয়েছে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বড় গ্রুপ এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের একটি অদৃশ্য বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। তারা নিজেরা ব্যাংক খাতের ঋণ যেন ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। আর এসব কাজে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নীরবে সায় দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে ব্যাংকের ভল্ট থেকে সহজেই বড় ব্যবসায়ীরা অর্থ বের করে নিতে পারছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন দিন দিন নাই হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা, উদ্যোক্তারা যোগসাজশে নিজেদের বন্ধু, আত্মীয়দের ঋণ দিচ্ছেন। কিন্তু সেটি আদায় হবে কি না দেখেন না। সম্পর্কের বিয়ষটি যেন ঋণপ্রাপ্তির সূচক হয়ে উঠছে। ব্যাংকগুলোর সতর্ক হয়ে অর্থায়ন করা উচিত। তবে সেটি করা কঠিন। মালিকরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তাই ব্যাংকগুলো যাচাই-বাছাই না করে বিনিয়োগ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে বলেন, আমাদের এসএমই ঋণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থান যেমন বাড়ে তেমনি ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিও কমে। ছোট ছোট ঋণে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি তুলনামূলক কম।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্প্রতি বলেন, আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা দিন দিন ভেঙে পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের চূড়ান্ত গাফিলতি, আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়া, সুশাসনের ঘাটতি, উচ্চপর্যায়ের সিন্ডিকেটসহ নানা জটিলতায় এই খাতে চরম দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। পুরো খাতটি অনিয়মের বেড়াজালে বন্দি। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কারণে এই নাজুক পরিস্থিতি।

তিনি আরো বলেন, ব্যাংক খাতে যে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে তার বড় প্রমাণ আসে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি দেখে। এখানে ব্যাংকগুলোও জড়িয়ে পড়ছে। ব্যাংকগুলোতে সুশাসন নেই, তার প্রমাণ এই খাতে ইচ্ছেমতো ঋণ দেওয়া।

বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সব ব্যবসায়ী খারাপ সেটি বলা যাবে না। অনেকেই ঠিকমতো ঋণ পরিশোধ করছেন। অনেকে সেটি করেন না। সব ধরনের ব্যবসায়ী রয়েছে। আমাদের বড় ঋণও দিতে হবে।

ঋণ পুনঃতফসিল করা হয় তখনই যখন তা ঠিক মতো আদায় হয় না। ব্যাংকগুলো নিজের আর্থিক অবস্থা ভালো দেখাতে ঋণের একটি অংশ নিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ পরিশোধে নতুন করে ব্যবসায়ীদের সময় দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এসএমই ঋণের পুনঃতফসিলের হার ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। যেখানে বড় ঋণের পুনঃতফসিলকরণের হার প্রায় ১৫ শতাংশ।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads