• রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬
ads
ব্যবসা-বাণিজ্য চেপে ধরছে ব্যাংক খাতের সঙ্কট

ছবি : সংগৃহীত

ব্যাংক

ব্যবসা-বাণিজ্য চেপে ধরছে ব্যাংক খাতের সঙ্কট

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ১২ মে ২০১৯

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে চেপে ধরছে ব্যাংক খাতের সঙ্কট। এ কারণে বিনিয়োগ চাঙা হচ্ছে না। মূলধন না পেয়ে অনেক ব্যবসায়ী হতাশ হয়ে পড়ছেন। নিজেদের তহবিলে ঋণপত্র-এলসি খুলতেও পারছেন না অনেকে। ডলার সঙ্কটের কারণে এলসি খুলতে পারছে না ব্যাংকগুলো। অনুমোদন করা ঋণ তারল্য সঙ্কট থেকে ছাড় দিতে না পেরে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি চান দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেবল ঋণের উচ্চ সুদহার তাদের রক্তাক্ত করছে না। নগদ টাকার টানাটানি, ডলার সঙ্কট তাদের টেনে ধরছে। বিভিন্ন ব্যাংকে ধরনা দিয়েও তারা এলসি খুলতে পারছেন না। যেসব ব্যাংক একসময় শক্তিশালী ছিল তারাও এখন এলসি খুলতে পারছে না। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সরকারের যে উন্নয়ন চিন্তা, তা বাধাগ্রস্ত হবে।

সংশ্লিষ্ট জানা গেছে, বিদ্যমান পরিস্থিতি জানাতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের দ্বারস্থ হয়েছেন অনেকে। অর্থমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে কথা বলেছেন গভর্নরের সঙ্গে। এর একটি সুরাহা বের করতে কাজ করছেন তারা। অবকাঠামো খাতের মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে সঙ্কট বেড়েছে। এখানে সমন্বয় করতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিতে ও ডলারের চাহিদা নির্ণয় করতে একটি বৈঠক হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিয়ে যেকোনো সময় কথা বলতে পারেন মুস্তফা কামাল।

ইজ ডুয়িং বিজনেস সূচকে (ব্যবসার পরিবেশ সূচক) চলতি বছরই বড় উল্লম্ফন হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তিনি জানিয়েছে, এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক তাদের পর্যালোচনা করেছে। গত এপ্রিলে পর্যালোচনা শেষ করেছে সংস্থাটি। আমরা আশা করছি, আগামী নভেম্বরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫-এর কাছাকাছি নেমে আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রাথমিকভাবে আমাদের অগ্রগতি ভালো। আশা করি, চলতি বছরের সূচকে আমরা ১২৫-এর কাছাকাছি নেমে আসব। তবে এতে আমরা সন্তুষ্ট থাকব না। আগামী বছর এপ্রিলে আবার পর্যালোচনা করবে বিশ্বব্যাংক। সেখানে আমরা ডুয়িং বিজনেস সূচকে দুই অঙ্কে নেমে আসব।

এই আশাবাদের বিপরীতে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসার পরিবেশে তহবিল জোগান প্রথম বিষয়। কিন্তু এখানে ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। আর্থিক খাতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা চলছে। এর দিকে নজর দিতে হবে। অন্যথায় ব্যবসায় সূচকে অগ্রগতি করে খুব বেশি লাভ হবে না। দেশি উদ্যোক্তরা বিনিয়োগ করতে পারবেন না।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) হিসাবে ২০১৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগে বড় উল্লম্ফন হয়েছে। তবে দেশি-বিদেশি উভয় ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে। শুধু চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশি-বিদেশি মিলে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় সাড়ে ২৫ শতাংশ। গত বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৩০ হাজার ৫২১ কোটি টাকার। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে নেমেছে ২২ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। এমনি পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নীতিমালা শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে যেখানে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন হয় এমন শাখায় (এডি) বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় মুদ্রায় অ্যাকাউন্ট খুলতে পারতেন। বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে এখন তফসিলি ব্যাংকগুলোর সব শাখায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবকাঠামো খাতে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বেশ কিছু বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পের জন্য প্রচুর যন্ত্রপাতি আনতে হচ্ছে। ফলে বিপুল পরিমাণ ডলার খরচ হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাত আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি তেল আমদানিতে নিয়োজিত সরকারের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এলসি খুলতে চাচ্ছে না ব্যাংকগুলো।

এছাড়া সঙ্কট থেকে অনেক ব্যাংক তার পুরনো এলসির দায় পরিশোধ করতে পারছে না। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অভিযোগ করেছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে এলসির দায় সঠিক সময়ে পরিশোধ করতে নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়।

বিদেশি ও স্থানীয় বিনিয়োগ মিলে সামগ্রিক বিনিয়োগ অস্বাভাবিক কমে গেছে। বিডার পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে স্থানীয় ও বিদেশি ৩২৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করেছিল। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪০৮টি। শুধু প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। আর বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে প্রায় সাড়ে ২৫ শতাংশ।

বিডার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের প্রথম তিন মাসের (জানুয়ারি-মার্চ) তুলনায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে স্থানীয় বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় সাড়ে ৪৬ শতাংশ। গত বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে স্থানীয় পর্যায়ের নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। সেখানে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্প বিনিয়োগ প্রস্তাবা কমে নেমেছে ১৪ হাজার ২৫৬ কোটি টাকায়।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিপিসির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে পরিস্থিতি তুলে ধরেন। ডলার সঙ্কটের কথা বলে ব্যাংকগুলো বিপিসির এলসি খুলতে গড়িমসি করছে বলে তাতে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে প্রায় এক বছরেও ঘোষিত সুদহার কার্যকর করেনি বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। যদিও এর মধ্যে সিঙ্গেল ডিজিটে শিল্পঋণ দেওয়ার দাবি করেছে ৭টি ব্যাংক। কিন্তু অধিকাংশ ব্যবসায়ীর অভিযোগ- তারা কেউ সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ পাচ্ছেন না। তবে একটি সূত্র  বলছে, ব্যাংকঋণের সুদহার নিয়ে বাজেটে চমক থাকতে পারে। বাজেট সহায়তা দিয়ে এটি কীভাবে কার্যকর করা যায়, সেই সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন অর্থমন্ত্রী।

অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, সব সুবিধা ব্যাংকের পরিচালকরাই পাচ্ছেন। নিজেরা ভাগাভাগি করে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি এখন সিঙ্গেল ডিজিটেও ঋণ সুবিধা নিতে তারা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। অথচ বিনিময়ে তারা ভালো ঋণগ্রহীতাদের কিছুই দিলেন না। এ অবস্থায় ব্যবসায়ী মহলে এক ধরনের অসন্তোষ বিরাজ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা গতকাল শনিবার জানান, যেসব ব্যাংক সিঙ্গেল ডিজিটে শিল্পঋণ দেওয়ার দাবি করছে, তারা হয়তো তাদের পরিচালকদের এ সুবিধা দিচ্ছে। তার মতে, ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ভাগাভাগির মতো সিঙ্গেল ডিজিটের সুবিধাও এখন ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে।

সুদহার কমানোর ঘোষণা দিয়ে ৫টি সুবিধা আদায় করে তফসিলি ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের কর কমানো, নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) কমানো, সরকারি আমানতের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, রেপো রেট কমানো এবং ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয়সীমা দফায় দফায় বাড়ানো। এছাড়া টানা ৯ বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকা ও এক পরিবারের ৪ জনকে ব্যাংকের পর্ষদে থাকার সুযোগও করে দেয় সরকার। সব সুবিধা ইতোমধ্যে ভোগ করা শুরু করলেও কোনো ব্যাংকই ছয়-নয় সুদহার কার্যকর করেনি।

সম্প্রতি এক প্রাক-বাজেট অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, একটি বিষয় সবাইকে স্বীকার করতে হবে যে, পৃথিবীর আর কোথাও বাংলাদেশের মতো এত বেশি ব্যাংক সুদহার নেই। এই সুদহার ১৫-১৬ শতাংশ পর্যন্ত। এত পরিমাণ সুদ দিয়ে কোনোদিন শিল্প-কারখানা টিকে থাকতে পারে না। আমি নিজেও একসময় ব্যবসায়ী ছিলাম। আমারও কিছু কারখানা ছিল। আমি নিজেও সুদ দিতে পারিনি। ব্যাংকের ঋণ নিয়ে সুদ দিতে পারে এমন নজির থাকে না। কারণ হচ্ছে সুদের হার বেশি ও ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads