• সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৫
ads
আবারো নতিস্বীকার

ছবি : সংগৃহীত

ব্যাংক

আবারো নতিস্বীকার

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ২০ মে ২০১৯

প্রভাবশালীদের কাছে আবারো নতিস্বীকার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বড় ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংক মালিকরা মিলে এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। ফলে আবারো সামনে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের সক্ষমতার বিষয়টি। আর্থিক খাতের এই নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে, যা ব্যাংক খাতের জন্য গভীর সঙ্কট ডেকে আনতে পারে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, আর্থিক সূচকে সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর অবনতি ঠেকাতে তফসিলি ব্যাংকগুলোতে পর্যবেক্ষক পাঠাতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক কোম্পানি আইনে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। পর্যবেক্ষকরা তফসিলি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে থাকেন। তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় যোগ দিয়ে সুশাসন ইস্যুতে কাজ করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অবনতি ঠেকাতে নজর রাখেন পর্যবেক্ষকরা। একই সঙ্গে আস্তে আস্তে যাতে সূচকে উন্নতি হয় তার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু প্রভাবশালীদের চাপে নতিস্বীকার করে এসব পর্যবেক্ষককে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে জালিয়াতির মচ্ছব শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ হিসাবে দেশের ১৪টি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে দুটি ব্যাংক থেকে পর্যবেক্ষক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একটি নতুন প্রজন্মের ব্যাংক থেকে পর্যবেক্ষক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে রাতারাতি। ব্যাংকটির মালিকদের চাপে এমনটি করা হয়েছে। সেখানে আর পর্যবেক্ষক দেওয়া হবে না। একইভাবে আরেকটি ব্যাংকে থাকা পর্যবেক্ষক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক থেকে পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী পরিচালক হয়েছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার বাইরে রয়েছেন। ওই ব্যাংকটিতেও পর্যবেক্ষক দেওয়া হবে না।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে, পর্যবেক্ষক আস্তে আস্তে সরিয়ে আনা হবে। কোনো কারণে কোনো ব্যাংকে পর্যবেক্ষক পদে শূন্যতা তৈরি হলে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরে চাপ প্রয়োগ করেছেন। আর সরকারের এই প্রভাবশালীকে কব্জা করেছেন প্রভাবশালীরা। এই তালিকায় বড় ঋণগ্রহীতা যেমন রয়েছেন তেমনি ব্যাংকের মালিকানায় থাকা একটি গোষ্ঠী এ ব্যাপারে হঠাৎ তৎপর হয়ে উঠেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষক থাকলে তফসিলি ব্যাংকগুলোতে বড় অনিয়ম সংঘটিত হতে পারে না। যদিও অনেক সময় আলোচনায় এসেছে, পর্যবেক্ষকরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। তবু ব্যাংকের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তারা সক্রিয় থাকেন।

দেশের ব্যাংক খাতে একের পর এক জালিয়াতি ঘটছে। ২০০৯ সাল থেকে এর শুরু। হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি, ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি। একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটছেই। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কেলেঙ্কারি তো আছেই, বাদ নেই বেসরকারি ব্যাংকও। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতিস্বীকার করার ফলে জালিয়াতি ও দুর্নীতির মচ্ছব শুরু হবে। ঋণ জালিয়াতি, পরিচালনা পর্ষদের দ্বন্দ্ব, দৈনন্দিন কার্যক্রমে মালিকপক্ষের অযাচিত হস্তক্ষেপসহ বিভিন্ন অনিয়ম ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংকে পর্যবেক্ষক দিয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, একটি ব্যাংকের ব্যাপক অবনতি হলেই কেবল সেখানে পর্যবেক্ষক পাঠানো হয়। আর্থিক সূচকে উন্নতি না হলে পর্যবেক্ষক সরিয়ে আনা ঠিক হচ্ছে না। ব্যাংকের চিত্র পর্যালোচনা করে পর্যবেক্ষক সরিয়ে আনতে হবে। কারো চাপে নতিস্বীকার করে এটি করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন আবারো প্রশ্নের মুখে পড়বে।

তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষক সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে কি না, সেটি দেখা যেতে পারে। প্রয়োজনে সরিয়ে অন্য কাউকে পাঠানো যেতে পারে। তবে যেসব ব্যাংকে অনিয়ম ও দুর্নীতি বেশি সেসব ব্যাংক থেকে পর্যবেক্ষক সরিয়ে আনা ঠিক হবে না।

সূত্রগুলো বলছে, পর্যবেক্ষকদের সরিয়ে আনা হলে ব্যাংকগুলোতে জালিয়াতি ঠেকাতে আর কেউ থাকবে না। ঋণ বিতরণ থেকে শুরু করে আবারো দুর্নীতি ঘাঁটি গেড়ে বসবে এসব ব্যাংকে। ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আবার বেরিয়ে যাবে। পর্যবেক্ষকদের কারণে ব্যাংকগুলো বড় আকারে অনিয়ম ও জালিয়াতি করতে পারছিল না।

জানা গেছে, বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে পর্যবেক্ষক রয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ও নির্বাহী পরিচালক পদের কর্মকর্তারা। এছাড়া আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক), এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ও এবি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ রয়েছে। তবে মালিকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক চাপের কারণে বিভিন্ন ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসিয়েও অনিয়ম ঠেকাতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা আর অনিয়ম ঠেকাতে বিভিন্ন ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পর্যবেক্ষক রয়েছেন এমন অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনায় যারা রয়েছেন তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। পর্যবেক্ষকরা বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে রিপোর্ট করলেও নানামুখী চাপে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। আবার অনেক সময় বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হলেও তারা তোয়াক্কা করেন না। তবে এক ধরনের চাপ বোধ করতেন। এখন আর সেই চাপও থাকবে না।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনো ধরনের চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে পর্যবেক্ষকের রিপোর্টের আলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পর্যবেক্ষকরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রে যে রিপোর্ট করেন, সে আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আর ব্যবস্থা নিলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা কম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেন, ব্যাংকগুলোর মধ্যে যেখানে সুশাসন ঘাটতি রয়েছে, অনিয়মের কারণে আর্থিক অবনতি হয়েছে  সেখানে পর্যবেক্ষক দেওয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষক একেবারে সব ব্যাংক থেকে প্রত্যাহার করার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আর চাপে নতিস্বীকারের প্রশ্নই ওঠে না।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল জানান, কেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের ব্যাংক থেকে পর্যবেক্ষককে সরিয়ে নিয়েছে, তা আমি বলতে পারব না। তবে আমাদের দিক থেকে কোনো চাপ ছিল না। আমরা চাপ দিতে যাব কেন। আর আমাদের চাপ কেন মেনে নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আমাদের ব্যাংকে যে কারণে পর্যবেক্ষক দেওয়া হয়েছে সেই সমস্যা আর নেই। পর্যবেক্ষক তো আর সারা জীবন থাকতে পারে না।

জানা গেছে, ব্যাংকঋণের সুদহার কমানো হবে জানিয়ে ব্যাংকের মালিকরা নানা সুবিধা আদায় করে নিয়ে গেছেন। তবে এখনো সুদহার কমায়নি ব্যাংকগুলো। সরকারের নানা সুবিধার ফলে ব্যাংক খাতে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার সরবরাহ বাড়ে। তবে সুদহার আপাতত কমছে না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads