• সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৫
ads
আমানত সংগ্রহে মরিয়া তফশিলি ব্যাংকগুলো

ছবি : সংগৃহীত

ব্যাংক

আমানত সংগ্রহে মরিয়া তফশিলি ব্যাংকগুলো

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ২৬ মে ২০১৯

নগদ টাকার সংকট থেকে ব্যাংকগুলো এখন গ্রাহককে ঋণ দিতে পারছে না। তারল্য সংকট গভীর হচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এই সংকট এতদিন সীমিত থাকলেও এখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেও অর্থ সংকট তীব্র আকার নিচ্ছে। ব্যাংকাররা আমানত সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

সূত্রগুলো বলছে, আমানত সংগ্রহ করতে ব্যাংকের সব কর্মকর্তাকে মাঠে নামতে হয়েছে। আমানতকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন ব্যাংকাররা। শাখা থেকে প্রধান কার্যালয় সব কর্মকর্তাদের লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলে পদোন্নতি আটকে দেওয়া হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, পদোন্নতি নয়, চাকরি বাঁচবে কি না সেই চিন্তায় রয়েছেন তারা।

প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী হিসেবে অন্যতম সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। গত কয়েক দিনে সংস্থাটির ঢাকা লিয়াজোঁ অফিসে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনই কয়েকজন করে ব্যাংক কর্মকর্তা আসছেন। তারা আমানত পেতে বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ করছেন। বেগতিক পরিস্থিতিতে পড়ে বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংকের একটি শাখার এক নারী কর্মকর্তা তার মাকে নিয়ে মাঠে নেমেছেন। ব্যাংকটির রাজধানীর একটি শাখায় কাজ করেন ওই নারী কর্মকর্তা।

কথা বলে জানা গেছে, ওই নারী কর্মকর্তা ব্যাংকের রেমিট্যান্স শাখায় কাজ করেন। এ বছর তাকে ১০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। অন্যথায়, পদোন্নতি দেওয়া হবে না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি তার মাকে নিয়ে বিপিসিতে এসেছেন। এবি ব্যাংকের এই নারী কর্মকর্তার মা মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন শিল্পীও ছিলেন তিনি।

গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের একটি শাখার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা হয়। তিনিও বলেন, পরিস্থিতি এমন যে, নিজেকে এখন আমানত সংগ্রহে নামতে হয়েছে। আগে এতটা চাপে পড়তে হয়নি। তিনি একটি চিঠিতে তার এলাকার সাংসদের সুপারিশ নিয়ে এসেছেন। ওই সাংসদ বর্তমানে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ব্যাংকিং খাতের সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সঞ্চয়পত্রের সুদ হার আমানতের সুদ হারের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। যদি আমানতের সুদ হার ৭ শতাংশ হয়, তবে এর সঙ্গে দেড় কিংবা দুই শতাংশ বেশি হতে পারে সঞ্চয়পত্রের সুদ। এভাবে সমন্বয় করা না গেলে কোনো লাভ হবে না। এছাড়া আমাদের বন্ড মার্কেট শক্তিশালী হচ্ছে না। এটি নিয়ে কেবল আলাপ হয়, কোনো অগ্রগতি হয় না।

ব্যাংকাররা বলছেন, এখন সংকট তীব্র হয়েছে। ফলে ব্যক্তি খাতের আমানত নিয়ে আর সমাধান হবে না। এছাড়া ব্যক্তি খাতের আমানতকারীরা উচ্চ সুদের জন্য সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। ব্যাংক থেকে তাদের আমানত তারা নিয়ে যাচ্ছেন সঞ্চয়পত্রে। তাই এখন ভরসা প্রাতিষ্ঠানিক আমানত। প্রাতিষ্ঠানিক আমানত হিসেবে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপিসি, তিতাস, বিটিসিএলসহ আরো কিছু সংস্থা। এসব সংস্থার ৫০ শতাংশ আমানত এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলো পাওয়ার কথা। তবে অনুসন্ধান বলছে, কার্যত কোনো সরকারি সংস্থাই সেটি কার্যকর করেনি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আমানত এখনো সরকারি ব্যাংকগুলোর কাছে রয়ে গেছে।    

শুধু গ্রাহক আস্থাহীনতায় নয়, সরকারের কিছু নীতির কারণে ব্যাংকের আমানত বাড়ছে না বলেও জানান ব্যাংকাররা। অধিকাংশ ব্যাংক আইনি সীমা লঙ্ঘন করে ঋণ বিতরণ করেছে। নতুন করে ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ ব্যাংকগুলোর কাছে নেই। এমনকি নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর অর্থ নেই কোনো কোনো ব্যাংকের। ফলে তারল্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে ব্যাংকগুলো দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করেছে। এতে সংকট তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, বছর দুয়েক আগেও ব্যাংকগুলোর কাছে অলস অর্থ ছিল দেড় লাখ কোটি টাকা। এখন তা নেমে এসেছে ৬৩ হাজার কোটি টাকায়। সেগুলো আবার বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ হিসেবে রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়ার মতো নগদ অর্থ নেই অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে। শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তহবিল পেতে। কিন্তু অর্থ দিতে পারছে না ব্যাংক। এ সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় আমানত বাড়ানো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি করা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চে ব্যাংকিং খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২৩ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। আগের বছরের মার্চে যা ছিল ৯ লাখ ২৫ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আমানত সংগ্রহ তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যাংকের তারল্য ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ কমে গেছে। মার্চ শেষে তরল সম্পদ (লিকুইড অ্যাসেট) দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চে সম্পদের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। এক বছরে তারল্য কমেছে ১৬ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং পদ্ধতি অনুসারে, ঋণের টাকা নগদ হিসেবে গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়া হয় না। অ্যাকাউন্টে প্রদান করা হয়। যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়, ওই পরিমাণ অর্থ আমানত হিসেবে যোগ হওয়ার কথা। কারণ ব্যাংকগুলো নতুন নতুন গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ঋণের তুলনায় আমানতের প্রবৃদ্ধি বেশি থাকার কথা। কিন্তু এখন চিত্র ভিন্ন। ঋণের তুলনায় আমানত কম বাড়ছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে নতুন আমানত সংগ্রহ আনতে পারছে না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads