• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
এজেন্ট ব্যাংকিং এগিয়ে নিচ্ছে প্রান্তিক মানুষকে

সংগৃহীত ছবি

ব্যাংক

এজেন্ট ব্যাংকিং এগিয়ে নিচ্ছে প্রান্তিক মানুষকে

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৩ জুলাই ২০১৯

এজেন্ট ব্যাংকিং যেমন বদলে দিয়েছে প্রান্তিক কৃষকের অর্থনৈতক কর্মকাণ্ড, তেমনি বদলে গেছে শহরতলির মানুষের আর্থিক কর্মকাণ্ডও। সরকার অনুমোদিত কোনো ব্যাংক বা এনজিও কার্যক্রম না থাকলেও ঠিকই মিলছে ব্যাংকিং সেবা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষগুলোও নিচ্ছে ফাইন্যান্সিয়াল এই সেবা। শুধু টিপসই দিয়েই তারা টাকা তুলছেন, জমা রাখছেন এবং ঋণও নিচ্ছেন। এসবই সম্ভব হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বদৌলতে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কোনো ব্যাংকের শাখা নেই এমন পল্লি এলাকায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের এজেন্ট ব্যাংকিং এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছে। টাকা উত্তোলন ও জমা দুটোই করা যাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। পর্যায়ক্রমে বাড়ছে এর পরিসর। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সফলতা দেখে এই কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে মোবাইল অপারটেররাও। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি সেবাটিতে যোগ হয়েছে শীর্ষ দুই সেলফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটা। নিজেদের বিভিন্ন আউটলেটে ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালুর বিষয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে অপারেটর দুটি ১১টি শর্তসাপেক্ষে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছ থেকে অনুমতিও নিয়েছে। মোবাইল অপারেটরগুলো তাদের অবকাঠামোতে কম ব্যয় ও স্বল্প জনবল প্রয়োজন হয় বলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে পরিচালন ব্যয়ও কম হয়। ফলে গ্রাহককেও স্বল্প ব্যয় ও দ্রুততম সময়ে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়।

সূত্র জানায়, তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে জনগণকে ব্যয় সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও আন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করা হয়।

মূলত একটি বৈধ এজেন্সি চুক্তির আওতায় প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং এসব সেবা দিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন

অঞ্চলে, যেখানে মূলধারার ব্যাংক নেই। এই এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করতে কোনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রয়োজন হয় না। বৈধ চুক্তি এই কার্যক্রমের অন্যতম শর্ত। যে কারণে দেশের কোথাও ইউনিয়ন পরিষদের অফিস, ওষুধের ফার্মেসি, ছোট আকারের দোকানেও চালু হচ্ছে এই এজেন্ট ব্যাংকিং। বিষয়টি এতই সহজ যে, ঘর থেকে বের হয়ে দোকানে গিয়ে মোবাইল রিচার্জ করার মতো। শহরেও এখন এজেন্ট ব্যাংকিং চালু হয়েছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এই সুবিধার মাধ্যমে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সহজে এবং স্বল্প খরচে সেবা প্রদান করা যাচ্ছে। যেমন, একজন গ্রাহক সহজেই খুব সামান্য পরিমাণ চার্জ প্রদান করেই নিকটস্থ এজেন্ট সেন্টারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল প্রদান করতে পারছেন। আবার সহজে অন্যান্য ইউটিলিটি সেবা প্রদানকারীর বিলও প্রদান করতে পারছেন। সামান্য পরিমাণ চার্জ প্রদান করে বিইএফটিএন, আরটিজিএস এবং এনপিএসবি-এর মাধ্যমে সহজেই ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ স্থানান্তর করতে পারছেন। পাশাপাশি বৈদেশিক রেমিট্যান্সের অর্থও উত্তোলন করা যায়।

এছাড়া একজন গ্রাহক তার কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে সঞ্চিত রেখে আকর্ষণীয় মুনাফা অর্জন করতে পারছেন। এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন কৃষকেরও আয়ের একটি অন্যতম সহায়ক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের হিসাব সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৭, যা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪২টি। ২০১৭ সালে এজেন্ট ২ হাজার ৫৭৭ এবং আউটলেট ৪ হাজার ১৫৭টি, যা ২০১৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৪ হাজার ৪৯৩ ও ৬ হাজার ৯৩৩টি। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০১৭ সালে আমানত সংগ্রহ করা হয় ১,৩৮৮ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা, যা ২০১৮ সালে ছিল ৩,১১২ দশমিক ৪১ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে বৈদেশিক রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে ১,৯৮২ কোটি টাকা, যা ২০১৮ সালে বৃদ্ধি হয়ে দাঁড়ায় ৫,৫৫৭ কোটি টাকা। মিডল্যান্ড ব্যাংক লিমিটেডের রিটেল ডিস্ট্রিবিউশন এবং এজেন্ট ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান মো. রিদওয়ানুল হক বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং পদ্ধতির কারণে বেশি উপকৃত হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকরা। মূলধারার ব্যাংক দূরে হওয়ায় এবং শিক্ষিত নয় বলে তারা ব্যাংকের সেবা নিতে পারত না। কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠী এজেন্ট ব্যাংকিং-এর আওতায় মৌলিক ব্যাংকিং সেবাগ্রহণের মাধ্যমে অনেক উপকৃত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন নিরক্ষর কৃষক সহজেই আঙুলের ছাপের (বায়োমেট্রিক) মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব খুলে তার ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারছেন। দেশের যে কোনো স্থানে অর্থ লেনদেন, স্থানান্তর এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্সের টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। এই ব্যাংকিংয়ে সরকারের উদ্দেশ্যও সফল হচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশে হতে গেলে সব শ্রেণির মানুষকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন অন্যান্য ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা।

এজেন্ট ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা ১৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো হচ্ছে- ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড, এবি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময় নানামুখী উদ্যোগ নেয়। যার জন্য গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একদিকে প্রান্তিক মানুষ আর্থিক সেবার মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন, অন্যদিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিকাশের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিও শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়াচ্ছে। তাই এজেন্ট ব্যাংকিং প্রসার অব্যাহত থাকবে এবং এটিই হবে আগামী দিনের ব্যাংকিং। তাই বিষয়টির প্রতি সরকারের সর্বদাই মনোযোগী থাকা জরুরি।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads