• শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
বেড়াজালে ছয়-নয় সুদহার

সংগৃহীত ছবি

ব্যাংক

বেড়াজালে ছয়-নয় সুদহার

বাস্তবায়নে নতুন কমিটি, পহেলা জানুয়ারি থেকে কার্যকর করতে চাই : অর্থমন্ত্রী

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ০২ ডিসেম্বর ২০১৯

গত বছরের আগস্ট মাসে ঋণের সুদ হার ৯ শতাংশ ঘোষণা করে ব্যাংকগুলো। আর আমানতের সুদ হার নির্ধারিত হয় ৬ শতাংশ। তফসিলি ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যানদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) স্বেচ্ছায় সরকারপ্রধানের কাছে এই প্রতিশ্রুতি দেয় তারও আগে। এজন্য তারা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ধরনের নীতি সহায়তা আদায় করে। কিন্তু কার্যকর করতে পারেনি স্বেচ্ছায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি। এরপর এক বছর পেরিয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো বিচ্ছিন্নভাবে এটি কার্যকরের কথা জানালেও সংবাদ মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, ছয়-নয় শতাংশ সুদহার কার্যকর হয়নি। খোদ প্রধানমন্ত্রীও সুদহার কার্যকর করা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কার্যত কোনো উন্নতি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প ও বাণিজ্যের স্বার্থে ছয়-নয় শতাংশ সুদহার কার্যকর নিয়ে নতুন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীরা। তারা বলছেন, স্বল্প সুদে আমানত না পেলে কোনোভাবেই ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়।

গতকাল দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীদের নিয়ে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর  ফজলে কবির, বিএবি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়াম্যান ও প্রধান নির্বাহী অংশ নেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে সূচনা বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার করতে আমাদের এক অঙ্ক সুদহার কার্যকর করতে হবে। লম্বা সময় চলে গেছে। এটি আমরা কার্যকর করতে পারছি না। এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর কোনো দেশে এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা যায় না। তাই আমাদের সুদহার কমাতেই হবে।

জবাবে নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, এক অঙ্ক সুদহার কার্যকর করা কঠিন। এটি আমরা কীভাবে কার্যকর করব। আমরা স্বল্পসুদে আমানত পাচ্ছি না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে আমাদের ৮/৯ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হচ্ছে। নয় শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে কীভাবে নয় শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে।

যদিও নজরুল ইসলাম মজুমদারও বিভিন্ন ফোরামে এতদিন বলে এসেছেন, ছয়-নয় শতাংশ সুদহার কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু গতকালকের বৈঠকে তার বক্তৃতায় শেষ পর্যন্ত তিনি স্বীকার করেছেন, নয় শতাংশ সুদ হার কার্যকর হয়নি।

প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকে কার্যত সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শেষ পর্যন্ত একটি কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরকে প্রধান করে বিশেষ এই কমিটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীদের রাখা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির জানান, কমিটির সদস্য হচ্ছেন সাতজন।

অর্থমন্ত্রী জানান, গঠিত কমিটি সাত দিনের মধ্যে একটি প্রতিবেদন দেবে। সেখানে ছয়-নয় শতাংশ সুদহার কার্যকর করার বাধাগুলো উঠে আসবে। এজন্য সুপারিশও করবে কমিটি। সে মোতাবেক আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। পহেলা জানুয়ারি থেকে আমরা শিল্পখাতে এক অঙ্ক সুদহার কার্যকর করতে চাই। এ জন্য একটি প্রজ্ঞাপনও ইস্যু করা হতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখতিয়ার।    

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে। এই বেকারত্ব কমাতে হলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। উৎপাদনশীল খাতকে বাঁচাতে ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত সুদহার এক অঙ্কে নেমে আসেনি কেন এবং খেলাপিঋণ দিন দিন কী কারণে বাড়ছে সেটা তদারকের জন্য কমিটি গঠন করা হবে।

খেলাপি ঋণ বাড়ছে, এটা সত্য। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মুস্তফা কামাল জানিয়েছিলেন, দেশে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না। সংসদেও তিনি একই কথা বলেছেন। তবে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। সেপ্টেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দাবি, দেশে খেলাপি ঋণ আরো বেশি। প্রকৃত তথ্য গোপন করা হয়। খেলাপি ঋণ প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি হবে। তবে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন মুস্তফা কামাল, খেলাপি ঋণ বাড়বে।  তিনি বলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়ার কারণে নিয়মিত গ্রাহকরাও এখন খেলাপি হয়ে গেছেন। অনেকেই টাকা পরিশোধ করছেন না। এর সঙ্গে আদালতে রিট একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে কারণেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ অবশ্যই কমবে বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী দশ বছরের মধ্যে আমরা আমাদের হিসাব বিবরণী খেলাপি ঋণ মুক্ত করতে পারব।

মুস্তফা কামাল এ-ও স্বীকার করেন, খেলাপি ঋণ কমাতে শুরু থেকে তারা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারেননি। এ কারণেই সুদহার বৃদ্ধি পেয়েছে। সুদহার বৃদ্ধি পেলে একটি দেশের উৎপাদনশীল খাত, শিল্প খাত উন্নত হতে পারে না। এই মুহূর্তে যে কোনোভাবে এই খাতকে এগিয়ে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জিডিপি কমলেও আমাদের দেশের জিডিপি কমার কোনো ভয় নেই। কারণ আমাদের দেশের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কখনো কমবে না, বরং বাড়বে।

অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রিসহ কয়েকটি প্রক্রিয়া বিবেচনাধীন রয়েছে। যেগুলো কেবিনেটে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদের কারণে তারা বিনিয়োগ করতে পারছেন না। ক্ষেত্র বিশেষে ১৫/১৬ শতাংশ সুদ ধার্য করা হচ্ছে। ফলে দেশে বিনিয়োগে অনেকটা স্থবিরতা চলছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads