• মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬

বলিউড

২৮ বছরের রুপালি জুটি

  • বিনোদন ডেস্ক
  • প্রকাশিত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

শাহরুখ খান আজ বলিউডের বাদশাহ। তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তার কারণে তিনি আজ ‘কিং খান’ নামেই সবার কাছে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে, বিশ্বের প্রতি পাঁচজনের একজন শাহরুখ ভক্ত। শাহরুখ যখন কেবলই একজন সাধারণ শাহরুখ, সেই সময় থেকে আজকের বলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী নায়ক হওয়া পর্যন্ত তার হাত শক্ত করে ধরে ছিলেন তিনি গৌরী খান। গত বছরের অক্টোবর এ জুটি ২৮তম বিবাহবার্ষিকী পালন করে।

শাহরুখ খান আর গৌরী খানের প্রথম দেখা ১৯৮৪ সালে। দিল্লির পঞ্চশিলা ক্লাবে। তখন শাহরুখের বয়স ছিল ১৯ আর গৌরীর ১৪ বছর। শাহরুখ খান এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ বাগধারাটি সত্যি। সেই প্রথম দেখাতেই গৌরীর প্রেমে পড়েছিলেন শাহরুখ। শাহরুখের ভেতর যে তখন থেকেই ‘রাহুল’, ‘রাজ’দের বাস, সেই প্রমাণও দেন। এক বন্ধুর মাধ্যমে গৌরীকে জানান, তিনি নাচতে চান গৌরীর সঙ্গে। শুনেই মুখের ওপর ‘না’ বলে দেন গৌরী। আর সাফ জানিয়ে দেন, তিনি নাকি তার প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন!

আসলে প্রেমিক নয়, ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন গৌরী। আর তারও ভালো লেগেছিল শাহরুখকে। কিন্তু তার পরিবার খুবই রক্ষণশীল, বাবা কট্টর ব্রাহ্মণ। তাই প্রেমটাকে প্রশ্রয় দিতে চাননি। কিন্তু শাহরুখের প্রেমে পড়া ছিল অবধারিত। তা আর ঠেকাতে পারলেন কই।

এরপর গৌরীর পারিবারিক অনুষ্ঠানে গৌরীর বাবা-মায়ের সঙ্গে খাতির জমান। নিজেকে পরিচয় দেন হিন্দু বলে। সেভাবেই পাঁচ বছর প্রেম করেন। কিন্তু গৌরীকে খুবই নিয়ন্ত্রণ করেছেন শাহরুখ। এমনকি চুল খোলা অবস্থায় গৌরীকে দেখলেও ভীষণ চটে যেতেন তিনি। এসব কারণে ছোটখাটো নানা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

তারপর একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মুম্বাই চলে যান গৌরী। বিরহে পাগল শাহরুখ তার মাকে গৌরী সম্পর্কে সবকিছু খুলে বলেন। তখন শাহরুখের মা তাকে ১০ হাজার রুপি দিয়ে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকাকে খুঁজে আনতে পাঠান মুম্বাই।

এত দূর পড়ার পর সিনেমার গল্প মনে হলেও এটাই শাহরুখের জীবনের সত্যি। সিনেমায় নামার আগেই তার জীবনের গল্প হার মানায় সিনেমাকে। তাই সিনেমাকে জীবন বানাতে সময় লাগেনি শাহরুখের। সেখানেও জীবনযুদ্ধের মতোই পেয়েছেন আশ্চর্য সফলতার দেখা।

মুম্বাইয়ে গৌরীকে খুঁজে বেড়ান শাহরুখ। কিন্তু এ তো খড়ের গাদায় সুই খোঁজার চেয়েও কঠিন। কোথায় খুঁজে পাবেন গৌরীকে? তবে শাহরুখ খুব ভালো করেই জানতেন, সমুদ্রসৈকত দারুণ পছন্দ গৌরীর। এর জন্য তিনি বিভিন্ন সমুদ্রসৈকতে প্রেমিকাকে খুঁজতে শুরু করেন। একদিন আকসা সমুদ্রসৈকতে ঠিকই তিনি গৌরীর সন্ধান পেয়ে যান।

হারিয়ে যাওয়া প্রেমকে আবার ফিরে পাওয়ার সেই মুহূর্ত। সামনাসামনি হতেই কারো মুখে কোনো কথা নেই। দুজনেই কাঁদতে শুরু করেন। সেই মুহূর্তেই গৌরী উপলব্ধি করেন, শাহরুখ তাকে কতটা ভালোবাসেন! কান্না থামিয়ে শাহরুখকে কথা দেন আর কখনোই শাহরুখকে ফেলে কোথাও পালাবেন না তিনি, কোনো দিন না, কোনো পরিস্থিতিতে না।

বাড়ি ফিরে সব সাহস সঞ্চয় করে সব সত্যি বলে দেন গৌরী, কিন্তু শাহরুখের মতো পাগলাটে, ভ্যাগাবন্ড আর মুসলিম ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে কিছুতেই রাজি হননি তার মা-বাবা। মা-বাবাকে না নিয়ে গৌরী বিয়ে করবেন না বলে গোঁ ধরেন। দুই বছর সময় নেন মা-বাবাকে রাজি করাতে। অবশেষে আসে সেই শুভদিন।

১৯৯১ সালের ২৫ অক্টোবর গৌরীর বাবা-মায়ের শর্ত অনুযায়ী হিন্দুরীতি অনুযায়ী শাহরুখের সঙ্গে বিয়ে হয় গৌরীর। বিয়ের স্যুট কেনার টাকা ছিল না শাহরুখ খানের। তখন চলছিল ‘রাজু বন গ্যায়া জেন্টলম্যান’ ছবির শুটিং। সেই সেট থেকেই অনেক অনুরোধ করে কস্টিউমের একটা স্যুট ধার করে এনে পরেছিলেন শাহরুখ।

গৌরীকে কথা দিয়েছিলেন, হানিমুনে প্যারিস নিয়ে যাবেন। কিন্তু টাকা কই? হানিমুনে গেলেন দার্জিলিং। তা-ও ‘রাজু বন গ্যায়া জেন্টলম্যান’ ছবির শুটিংয়ের দলের সঙ্গে। শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে স্ত্রীকে নিয়ে চা বাগানে ঘুরেছেন। দুই-একটা ছবি তুলেছেন। এই ছিল মধুচন্দ্রিমা। কিন্তু এসব নিয়ে কখনো আক্ষেপ করেননি গৌরী। মধুচন্দ্রিমায় যে প্যারিসে যেতে পারেননি, সেখানেই এখন নিজের প্রাসাদ আছে শাহরুখ খানের।

সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে সেই দেওয়া কথা রেখেছিলেন তিনি। ২৮ বছর ধরে শাহরুখের সব খারাপ, ভালো, ব্যর্থতা আর সফলতার সঙ্গী গৌরী। তিন সন্তান নিয়ে বলিউডের সবচেয়ে সফল আর আদর্শ জুটির উদাহরণ তারা। তাই তো শাহরুখ বলেছেন, ‘পৃথিবীতে গৌরীই আমাকে সবচেয়ে বেশি জানে আর বোঝে।’ আরো বলেছেন, আজ তিনি যা, তার কৃতিত্ব সমানভাবে ভাগ করলেও গৌরীর সঙ্গে অবিচার হবে। বলেছেন, ‘আমার সফলতায় আমার চেয়েও গৌরীর অবদান বেশি।’

জীবনের এতটা সময় পার করে এসেও শাহরুখ বারবার ফিরে যান অতীতে। যে অতীত আজ তাকে বাদশাহ বানিয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি মধ্যবিত্ত, খুব সাধারণ পরিবারের ছেলে। তাই আমার জন্য আজ এত দূর আসা কোনো রূপকথা গল্প থেকে কম নয়। আমার জীবন স্বপ্ন সত্যি হওয়ার গল্প। আর এই গল্পের সবচেয়ে বড় অনুঘটক মানুষের ভালোবাসা। আমি এখনো এসব বিশ্বাস করতে পারি না। আমি এখনো দিল্লির সেই ছেলেটা।’

শাহরুখ খানের দেখা নিজের অভিনীত প্রথম ছবি ‘রাজু বন গ্যায়া জেন্টলম্যান’। প্রথমবার বড় পর্দায় নিজেকে দেখে নাকি শাহরুখের অস্বস্তি হয়েছিল। শাহরুখ বলেন, ‘মুম্বাইয়ের আরকে স্টুডিওতে দেখলাম। নিজেকে কেমন বেখাপ্পা লাগছিল। বড় বড় চুল, কী বিশ্রী। আর নানা পাটেকার, অমৃতা সিং, জুহি চাওলাদের সঙ্গে কী যে খারাপ অভিনয় করেছিলাম!’

শাহরুখ খান তার ইনস্টাগ্রামে গৌরী খানকে নিয়ে লিখেছেন, ‘মাঝেমধ্যে মনে হয়, কত কাল ধরে আমরা পথ চলছি...আবার হঠাৎ করে মনে হয়, এই তো গতকাল। বিয়েটা গতকালের কথা। তিন সন্তান নিয়ে প্রায় তিন দশক পথ চলছি। সব রূপকথা ছাড়িয়ে আমার জীবনের রূপকথা সবার ওপরে। কারণ, এই রূপকথা আমার জীবনের পরম সত্যি। কল্পনায় যতটা সুন্দর হওয়া সম্ভব, আমার জীবন ঠিক ততটাই সুন্দর।’

যতই শাহরুখকে নিয়ে বিতর্ক উঠুক গৌরীর কাছে  সেসব গুজবের কোনোটাই ধোপে টেকেনি। হয়তো এই বিশ্বাসের নামই ভালোবাসা। যা এই জুটিকে বাস্তবজীবনের  তারকা বানিয়েছে বলিউডের অনেক তারকার কাছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads