• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads

বাজেট

বড় বাজেট, স্বস্তি কম ভাবনায় উন্নয়ন

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ১২ জুন ২০১৯

গত ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রাখতে সাধারণ মানুষ একচেটিয়া সমর্থন দিয়ে আবারো আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। তাই সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা অনেক। জনগণ যাতে বিরক্ত না হয়, সেদিকে সতর্ক সরকার। তাদের স্বস্তি দিতে হবে। যারা ভোট দিয়েছেন তারা যাতে অসন্তুষ্ট না হন, সেদিকে খেয়াল রাখতে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে অর্থনীতিতে নানা চাপ বিদ্যমান। ব্যাংক খাতের সংকট লম্বা হচ্ছে। নীতি-সহায়তা দিয়েও যা দূর করা যাচ্ছে না। রাজস্ব ঘাটতি আকাশচুম্বী। চলতি হিসাবেও বড় ঘাটতি। বেসরকারি খাত ঝিমিয়ে পড়েছে। ধারণা ছিল, নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু হয়নি। তবে স্বস্তি দিচ্ছে রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এদিকে ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে জমিতেই আগুন দিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছেন কৃষকরা।

নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রথম বাজেট ঘোষণা করা হচ্ছে আগামীকাল। একইভাবে অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব বেশি সময় পেয়েছেন বলা যাবে না। মধুচন্দ্রিমা শেষ হতে না হতেই ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট তৈরি করতে হয়েছে তাকে। পাহাড়সম অস্বস্তি আর চাপের মধ্যে বড় আকারের বাজেট দিতে যাচ্ছেন তিনি। কারণ তার ভাবনায় রয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন আর সবাইকে খুশি করার চেষ্টা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, দেশের অর্থনীতি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে। একসময় সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আমাদের শক্তির কারণ ছিল। সেই স্থিতিশীলতার মধ্যেই এখন চিড় ধরেছে। এর মূল অনুষঙ্গ হলো- কর আহরণে দুর্বলতা, ব্যাংক খাতে সমস্যা এবং বৈদেশিক লেনদেনের স্থিতিতে চাপ। কর আহরণে দুর্বলতার কারণে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারকে উচ্চ সুদের অর্থায়নের দিকে যেতে হচ্ছে, যা সরকারের বাজেট ব্যয়ও বাড়াচ্ছে। সরকার ব্যাংক খাতের সমস্যা দূর করতে সম্প্রতি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার একটিও ভালো ফল দিতে পারেনি। বরং ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ আরো বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক লেনদেনের স্থিতিতেও চাপ বেড়েছে।

তিনি আরো বলেন, সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি একটি সীমারেখায় এসে উপনীত হয়েছে, যেখান থেকে উন্নয়নের পথে যেতে হলে সংস্কার দরকার। তা ব্যাংক খাত থেকে শুরু করে আরো অনেক খাতে।

ব্যয় পরিকল্পনা : ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যয়ের প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৭ শতাংশের কিছু বেশি। এবার তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেটের আকারও আগের সব রেকর্ড ভাঙছে। চলতি অর্থবছর বাজেটের আকার চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে বাজেটের আকার বাড়ছে ৫৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা বা ১৩ শতাংশ। ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’ শিরোনাম রাখা হয়েছে এবার। আসছে বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হচ্ছে তিন লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে দুই লাখ ১১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার দুই লাখ দুই হাজার ৭২১ কোটি টাকা। এরই মধ্যে এডিপি অনুমোদন করেছে সরকার। এছাড়া এডিপি-বহির্ভূত বিশেষ প্রকল্প, স্কিম ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে বাকি অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব করতে পারেন অর্থমন্ত্রী। নতুন অর্থবছরে এজন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা।

আয় পরিকল্পনা : প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। সে হিসাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত করের পরিমাণ তিন লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এনবিআর-বহির্ভূত করের পরিমাণ ধরা হচ্ছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর কর ছাড়া প্রাপ্তি ধরা হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এছাড়া বৈদেশিক অনুদান ধরা হচ্ছে চার হাজার ১৬৮ কোটি টাকা।

ঘাটতি : অর্থমন্ত্রী হিসেবে মুস্তফা কামালের ভাবনায় ব্যাপক উন্নয়ন। তিনি এর আগে সরকারের পরিকল্পনা হিসেবে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা করেছেন। ফলে তার মাথায় উন্নয়ন-চিন্তার শেষ নেই। তবে তাই বাড়ছে বাজেটের আকার। আর আয়-ব্যয়ের বিশাল পার্থক্যের কারণে এবার বাজেট ঘাটতিও বাড়বে। আসছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে অনুদান ছাড়া বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে ২০ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। বড় আকারের ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকার। এটি চলতি অর্থবছরে রয়েছে ৫০ হাজার ১৬ কোটি টাকা। আদৌ এটি অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ বৈদেশিক উৎসের ঋণ ব্যবহার ও ছাড়ে সক্ষমতা বাড়েনি। আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে নেওয়া হবে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এর পরিমাণ ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। এখানে বড় পরিবর্তন হয়তো আনছেন না মুস্তফা কামাল। তবে অভ্যন্তরীণ ঋণ খাতের মধ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এর পরিমাণ রয়েছে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের বিদ্যমান তারল্য সংকটের মধ্যে এই জোগান হয়তো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ টেনে ধরবে। ব্যাংকগুলো নগদ টাকার টানাটানি থেকে ঋণ দিতে পারছে না। সেখানে নতুন বাজেটের উচ্চ ঋণলক্ষ্য বেসরকারি খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্রমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ২৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এর পরিমাণ ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে করা হয় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আর প্রকৃত বিক্রি আরো বেশি। কার্যত উচ্চ সুদের কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি টেনে ধরা যাচ্ছে না। এছাড়া অন্যান্য খাত থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে তিন হাজার কোটি টাকা।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি : জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির আকার প্রাক্কলন করা হয়েছিল ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই অর্থবছরজুড়ে দেশে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হবে, তার আর্থিক মূল্য হবে এটি। সংশোধিত বাজেটে জিডিপির আকার কমিয়ে ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৭ কোটিতে নামানো হচ্ছে। আর নতুন অর্থবছরের জন্য আকার প্রাক্কলন করা হচ্ছে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।

বেসরকারি খাত : অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বেসরকারি খাতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন মুস্তফা কামাল। তাই বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তিনি। বাজেটে সেসব পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন তিনি। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য গঠন করতে যাচ্ছেন বিশেষ তহবিল।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads