• বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৫
ads
চমক দিতে ঝুঁকি নিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী

ছবি : সংগৃহীত

বাজেট

চমক দিতে ঝুঁকি নিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী

লক্ষ্য ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ১৩ জুন ২০১৯

মঙ্গলবার রাত থেকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের অসুস্থতার নাটকীয়তা শুরু হয়। ওই দিন বিকালে অসুস্থ হয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলেও তা স্পষ্ট করা হয়নি। অর্থমন্ত্রীর দপ্তর থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, নিয়মিত চেকআপ করাতে গিয়েছিলেন। পূর্বনির্ধারিত ঘোষণা মোতাবেক তিনি সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন। তবে চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছেন কি না, সেটি স্পষ্ট করা হয়নি। পরে অবশ্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, অর্থমন্ত্রী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।

এমন নাটকীয়তার মধ্যে আজ অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন টানা তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের এই অর্থমন্ত্রী। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ছিলেন সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী। এর আগে টানা দুই মেয়াদে বাজেট দিয়ে গেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে কী চমক দিতে যাচ্ছেন মুস্তফা কামাল। এরই মধ্যে অবশ্য একাধিক অনুষ্ঠানে নিজের বাজেটের ভঙ্গি কিছুটা খোলাসা করেছেন তিনি। তবে গোপন রেখেছেন বাজেটের বিভিন্ন পরিসংখ্যানগুলো। যদিও সংবাদমাধ্যমগুলোতে সূত্রের বরাদ দিয়ে অসুস্থতার প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে।

এবার রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বিরোধী রাজনৈতিক শিবির এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল। রাজপথে সভা-সমাবেশ করার শক্তি হারিয়েছে বিরোধী শক্তিগুলো। ফলে বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঝুঁকি নেই। তবে বাজেটের পরিবেশ শতভাগ পক্ষে নেই তার। প্রকৃতি কিছুটা বৈরী। অর্থনীতিতে বেশ কিছু সূচক  নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সর্বশেষ ধানের দাম নিয়ে কৃষকের অসন্তোষ রয়েছে। নানা কূটনৈতিক তৎপরতার পরও মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগানের বাইরে রোহিঙ্গাদের ভরন-পোষণ করতে হচ্ছে। ফলে অর্থনীতি স্বস্তিতে নেই। কিছুটা চাপ রয়েছে তার মাথায়। তবে হিসাববিদ হিসেবে চাপের প্রকাশ করছেন না তিনি। নীরবে সামাল দেওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন।

অবশ্য তিনি বারবার আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন, শেখ হাসিনা তার ওপর ভরসা রেখেছেন। তিনি ব্যর্থ হবেন না। তিনি দায়িত্ব পালনে সফল হবেন। নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে ঝুঁকি নিতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনার সরকারের এই অর্থমন্ত্রী। ঘূর্ণিঝড় ফণী খুব বেশি ক্ষতি করতে পারেনি। তবে তীব্র দাবদাহে চিড়ে-চ্যাপ্টা মানুষ। তবে গত এক দশকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। ফলে তীব্র তাপমাত্রায় বৈদ্যুতিক ফ্যান চলে। তবে মুস্তফা কামাল বাজেট দেবেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংসদে। তবু তিনি পুড়ছেন।

সব থেকে বড় ঝুঁকি রাজস্ব আহরণে। বহু জল্পনা-কল্পনার পর অপেক্ষায় থাকা ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নানা শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। কমে যেতে পারে রাজস্ব আহরণ। ফলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে হিসাববিদ হলেও এখনই ধারণা করতে পারছেন না। চ্যালেঞ্জ রয়েছেন চমক আনার। গতানুগতিক ও ধারাবাহিকতা ভাঙতে চেষ্টা থাকবে। এটি করতে গিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ রয়েছে। ফলে কী প্রতিক্রিয়া হয়, সেটি বলা যাবে না। এই বিবেচনাতেও রয়েছে চাপ ও ঝুঁকি। 

এবার বাজেটের শিরোনাম রেখেছেন অর্থমন্ত্রী ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের।’ এবারের বাজেট হবে ‘স্মার্ট’ বাজেট। প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন আঙ্গিকে তৈরি করা হয়েছে বাজেট।

সূত্র বলছে, বাজেটের আকার বাড়লেও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃৃতা হবে সংক্ষিপ্ত। তবে এ বক্তৃতার একটি বর্ধিত সংস্করণ বাজেট বই আকারে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে, যা সর্বস্তরের সর্বসাধারণের জন্য হবে সহজপাঠ্য। বাজেটের লক্ষ্য সূদূরপ্রসারী হলেও তা অর্জন করতে চেষ্টা হবে সাধ্যের মধ্যে। আর এর মধ্যেই থাকবে দেশের সব মানুষের স্বপ্নপূরণের অঙ্গীকার। শুধু এক বছরের জন্য নয়, সূদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে বিশেষ করে ২০৪১ সালকে টার্গেট করে তৈরি হয়েছে এবারের বাজেট।

সূত্র জানিয়েছে, রাজস্ব আদায়ে করের হার না বাড়িয়ে বরং করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে এনবিআরের জন্য নতুন করে দিকনির্দেশনা থাকবে। ভ্যাট আইন কার্যকর করার বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকবে এবারের বাজেটে। আইন কার্যকর করতে ভ্যাটের একাধিক স্তর থাকবে। কাস্টমস আইন ও আয়কর আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে সহজবোধ্য ও ব্যবসাবান্ধব করা হবে। সব আমদানি-রপ্তানি পণ্য শতভাগ স্ক্যানিং করা হবে।

বাজেটে শিক্ষা ও আর্থিক খাতের সংস্কার, শেয়ারবাজারে সুশাসন ও প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকবে। আর এসবই হবে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য। এবার আকর্ষণীয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রাখতে মানুষ একচেটিয়া সমর্থন দিয়ে আবারো আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। তাই মানুষের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা অনেক। জনগণ যাতে বিরক্ত না হয় সেদিকে সতর্ক সরকার। তাদের স্বস্তি দিতে হবে। যারা ভোট দিয়েছেন তারা যাতে অসন্তুষ্ট না হন। সেদিকে খেয়াল রাখতে এরই মধ্যে সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছেন। সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট। এই মেয়াদে আরো কয়েকটি বাজেট ঘোষণা করতে হবে অর্থমন্ত্রীকে। ফলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে তাকে। দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব বেশি সময় পেয়েছেন বলা যাবে না। মধুচন্দ্রিমা শেষ হতে না হতেই ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট তৈরি করতে হয়েছে তাকে। পাহাড়সম অস্বস্তি আর চাপের মধ্যে বড় আকারের বাজেট দিতে যাচ্ছেন তিনি। কারণ তার ভাবনায় রয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন আর সবাইকে খুশি করার চেষ্টা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, বাজেট বাস্তবায়ন ও ঘোষণা তেমন সুফল আনবে না যদি না ব্যাংক খাতের বিদ্যমান সংকট দূর করা হয়। ফলে অর্থমন্ত্রীকে ব্যাংক খাত নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করতে হবে। তা না হলে অনেক চিন্তাই বাস্তবায়ন করা যাবে না।

সূত্রে জানা গেছে, বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু সংস্কার পরিকল্পনা জানাবেন কামাল। এবার বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশে আটকে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এছাড়া আরো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে মাইলফলক অর্জন করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগহীন। দেশের বিরাট একটি অংশ তরুণ। তাদের কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিতে হচ্ছে মুস্তফা কামালকে।  

বাজেটের সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও দলিল আজ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইট, এনবিআরের ওয়েবসাইটসহ সরকারের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে বাজেটের কপি জাতীয় সংসদ ভবনে সরবরাহ করা হবে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বাজেট সম্পর্কে মতামত নেওয়া হবে। এসব মতামত পাওয়ার পর বাজেট প্রস্তাবে সংশোধনী আনবেন অর্থমন্ত্রী। আগামী ৩০ জুন জাতীয় সংসদে অর্থবিলের মাধ্যমে বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে। ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads