• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
চড়া সুদে অভ্যন্তরীণ ঋণ

ছবি : সংগৃহীত

বাজেট

বাজেট ২০১৯-২০২০

চড়া সুদে অভ্যন্তরীণ ঋণ

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ১৩ জুন ২০১৯

চলতি অর্থবছরের শুরুতে বিভিন্ন উৎস থেকে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণে ঋণের বিপরীতে চলতি বাজেটে সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ আছে ৫১ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বাজেটে সুদ বাবদ বরাদ্দ আছে ৪৮ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। ঋণের স্থিতির বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হার প্রায় সোয়া ১২ শতাংশ। আর বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ২ লাখ ৭০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বাজেটে সুদ বাবদ বরাদ্দ আছে ২ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। এক শতাংশের সামান্য বেশি সুদে বিদেশি উৎস থেকে বিপুল পরিমাণে ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা ব্যবহারে উৎসাহী হচ্ছে না মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। এর ফলে বাজেটের ঘাটতি মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে চড়া সুদে বেশি ঋণ নিচ্ছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদে আজ উপস্থাপনের অপেক্ষায় থাকা আগামী অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। আর জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ২৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্য পূরণ হয়ে যাওয়ায় সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য খাত থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে তিন হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণে সুদের পরিমাণ বরাবরই বেশি। এছাড়া সরকার ব্যাংক থেকে বাড়তি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হয়ে সৃষ্টি হতে পারে বাড়তি মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতির আকার, রপ্তানি আয়, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভসহ বিভিন্ন বিবেচনায় বাংলাদেশের আরো বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণের ধারণক্ষমতা রয়েছে। তবে বিদেশি ঋণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশাপাশি বিভিন্ন শর্ত পূরণের পথে হাঁটতে চাইছেন না প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সহজেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইছেন তারা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের শুরু পর্যন্ত বিদেশি সহায়তার ৩ হাজার ৫৭৪ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার পাইপলাইনে আটকা ছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি এলেই আগামী কয়েক বছরে এ পরিমাণ অর্থ ছাড় হতে পারে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও কর্মকর্তাদের অনীহার কারণে বিদেশি সহায়তার পাইপলাইনের আকার না কমে উল্টো বাড়ছে।

ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, বছরের পর বছর কাজ ঝুলে থাকলে অনেক সময় বিদেশি দাতারা সহায়তার অর্থ প্রত্যাহার করে নেয়। পরে একই কাজের জন্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দিয়ে নতুন প্রকল্প নিতে হয়। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানব উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

এ অবস্থায় দাতাদের প্রতিশ্রুতি আদায়ের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিতে সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কাজে গতি না এলে বিদেশি সহায়তা ছাড়ের পরিমাণ বাড়বে না। উন্নয়নে স্থবিরতা বিরাজ করায় পাইপলাইনের আকার বাড়ছে। তিনি বলেন, বড় প্রকল্পে গতি বাড়ালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। এছাড়া বিদেশি সহায়তা বাদ দিয়ে দেশি অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসারও তাগিদ দেন এ অর্থনীতিবিদ।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর স্থানীয় অফিসের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন, অর্থছাড়সহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আসে সংস্থার সদর দফতর থেকে। এ কারণে প্রকল্প প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কিছুটা বিলম্ব হয়। তবে ঋণচুক্তির পর বাস্তবায়নে অদক্ষতার কারণেই অর্থছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে। এর ফলে চাপ বাড়ছে সরকারের নিজস্ব তহবিলে। রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। বিদেশি সহায়তা ব্যবহার করতে না পারায় অনেক সময় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলেও তিনি মনে করেন।

বিদেশি সহায়তা ব্যবহারে অনীহার বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে গত অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে। সম্প্রতি প্রকাশ করা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গত অর্থবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বিদেশি সহায়তা ধরা হয়েছিল ৫৭ হাজার কোটি টাকা। বান্তবায়নে ধীরগতির কারণে তা ৫২ হাজার ৫০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। বছর শেষে এ তহবিল থেকে ব্যয় হয় ৪৯ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। এডিপিতে বিদেশি সহায়তা ব্যবহারের হার দাঁড়ায় ৮৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বছর শেষে ফেরত যায় ৭ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার বিদেশি সহায়তা।

এদিকে চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বিদেশি সহায়তা বাবদ বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৬০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়নে গতি না থাকায় ইতোমধ্যে সংশোধিত এডিপিতে এর আকার নামিয়ে আনা হয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকায়। নয় হাজার কোটি টাকা কেটে নেওয়ার পরও বিদেশি সহায়তা বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ে গতি আসছে না। ১০ মাসে এ তহবিল থেকে ৩১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বিদেশি অর্থ ব্যবহারে ব্যর্থতার কারণে গত পাঁচ বছরে এডিপি বাস্তবায়নে প্রকল্প সহায়তার হার ৩৩ দশমিক ১৩ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২৮ দশমিক ৮৮ শতাংশে।

ইআরডির অপর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাতা সংস্থাগুলোর প্রতিশ্রুতির বিপরীতে সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সক্ষমতা বাড়ছে না। এর ফলে থমকে আছে বিদেশি সহায়তার অর্থছাড়। সরকার প্রতি বছর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও অর্থছাড় বাড়াতে পারছে না। দাতাদের অর্থ দ্রুত ছাড় করতে টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়। ইআরডি, পরিকল্পনা কমিশন দফায় দফায় বৈঠক করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে। এসব বৈঠকে বৈদেশিক অর্থ আটকে থাকার বিভিন্ন কারণ চিহ্নিতও করা হয়; নেওয়া হয় নানা ধরনের উদ্যোগ।

পাইপলাইনের আকার বেড়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি সহায়তার ব্যবহার পরিস্থিতি সংকটময় অবস্থায় রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে অর্থছাড়ে বিলম্ব হওয়ার পাশাপাশি সময় ও ব্যয় বাড়ছে। এর ফলে লেনদেন ভারসাম্য চাপে পড়ছে। চাপ বাড়ছে অভ্যন্তরীণ তহবিলেও।

বিদেশি সহায়তা ছাড়ে গতি না আসার ১৩টি কারণ উঠে এসেছে ইআরডির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, অনেক সময় সঠিক পরিকল্পনা না করেই প্রকল্প তৈরি করা হয়। প্রকল্প তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতার অভাব আছে। এর ফলে কাজ শুরুর আগেই অনেক প্রকল্পের প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করতে হয়। অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সহায়তা ছাড়ে বাড়তি সময় লাগে বলে মনে করে ইআরডি। অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নে উপযুক্ত জনশক্তি নিয়োগ দেওয়া হয় না। আবার প্রকল্পের মাঝ পর্যায়ে জনশক্তির কর্মস্থল বদল করা হয়ে থাকে।

ক্রয় প্রক্রিয়া, বিশেষ করে ভূমি অধিগ্রহণে বাড়তি সময় লাগায় প্রকল্পের কাজ আটকে থাকে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বেশ কয়েকটি খাত নিয়ে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয় বলেও দাবি করেছে ইআরডি। দাতা সংস্থার পক্ষ থেকেও অনেক সময় ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন, ঋণচুক্তি সম্পাদন, ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদন, ঠিকাদার অনুমোদন, পরামর্শক নিয়োগ ও অর্থছাড়ে দাতাদের পক্ষ থেকে বাড়তি সময় ক্ষেপণ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।   

বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রে দাতারা কঠিন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। আর দাতাদের শর্ত মেনে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেও হিমশিম খাচ্ছে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো। এ কারণে বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারে অনীহাও বাড়ছে। কঠিন শর্ত ও দাতাদের নিয়মিত তদারকির কারণে বৈদেশিক সহায়তার আগ্রহ হারাচ্ছে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads