• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
বাজেট বাস্তবায়নে ‘সংশয়’ ১৪ দলের শরিকদের

সংগৃহীত ছবি

বাজেট

বাজেট বাস্তবায়নে ‘সংশয়’ ১৪ দলের শরিকদের

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ১৬ জুন ২০১৯

জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বিশাল হওয়ায় তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, এ নিয়ে ‘সংশয়’ প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ১৪ দলের জোটের কয়েকটি শরিক দল। প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘বৈষম্যের’ হিসেবেও দেখছে ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো শরিক দল। এ বাজেট পাস হয়ে বাস্তবায়ন হলে দেশে ‘অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য আরো বাড়বে’ বলেও মনে করেন জোটের শরিক কেউ কেউ। সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাজেটে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ বাড়ছে না বলেও দাবি সরকারের সঙ্গে থাকা কয়েকটি রাজনৈতিক দলের। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন ‘কঠিন’ হবে বলে মনে করে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টিও।

জোট সূত্র জানায়, একাদশ সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনে ‘বিরোধী দলের ভূমিকা’ পালনে ১৪ দলের শরিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত আছে। কয়েকটি দল বিরোধী দলের ভূমিকা পালনে রাজি হলেও বাকি দলগুলো আগ্রহী নয়। ভিন্নমত পোষণকারী দলের নেতারা সরকারের শরিক হিসেবেই সংসদে থাকতে চান। ফলে তারা বাজেট নিয়ে গঠনমূলক কোনো সমালোচনা সংসদের ভেতরে ও বাইরে করতে চান না। দলগুলোকে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকতে আওয়ামী লীগ প্রস্তাব দেওয়ার পরও সিদ্ধান্ত বদলায়নি। বাজেট পেশ ও পাস হওয়ার মতো সংসদের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনেও তাই ১৪ দলের শরিক কয়েকটি দলকে বিরোধী দলের ভূমিকা দেখা যাবে না। দলগুলো দলীয় বৈঠকে এ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ এবার বাজেট নিয়ে সংসদের ভেতর ও বাইরে সরকারের সমালোচনায় মুখর হতে চায়।

১৪ দলের নীতিনির্ধারক কয়েক নেতার মতে, জোটের শরিক কয়েকটি বাম দল প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিকের সমালোচনা করছে। এসব দল থেকে কোনো কোনো নেতা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আগের সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকাকালে দলগুলো বাজেটের কোনো সমালোচনা করেনি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভা প্রায় শতভাগ আওয়ামী লীগের হওয়ায় ও মন্ত্রিসভায় শরিকরা ঠাঁই না পাওয়ার পর থেকে কোনো কোনো দল সরকারের সমালোচনা করে আসছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মহাজোট ও ১৪ দলের শরিকদের সংসদে জোরালো ভূমিকা দেখতে চায় দলটি। রাজনৈতিক মিত্র ও সমমনা হওয়ায় শরিক দলগুলো সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হতে পারে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ কেউ। ফলে দলগুলোর সমালোচনাকে আওয়ামী লীগ ইতিবাচকভাবেই দেখছে। সরকারি দল চায়, শরিক ও মিত্ররা প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়া জানাক গণতান্ত্রিক সমালোচনার ভাষায়।

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সরকারি জোট ও বিরোধী দলে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকলেও ১৪ দলের শরিক কয়েকটি দল এখনো চুপ। জোটের শরিক কয়েকটি দল বাজেটের বিষয়ে দলগত কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। কেন্দ্রীয় ১৪ দলের জোটের পক্ষেও গতকাল শনিবার পর্যন্ত বাজেটের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া ও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। জোটের শরিক দলের নেতারা দলীয় অনুষ্ঠানে বাজেট সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। মহাজোটের শরিক কোনো কোনো দলও বাজেটের প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ক্ষমতাসীনদের শরিক বেশিরভাগ দল ও সংসদের বিরোধী দলও এবারের বাজেটকে মোটের ওপর ইতিবাচকভাবেই দেখছে। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি বরাবরের মতো এবারও ‘বাজেট জনবান্ধব নয়’ বলে দাবি করলেও আওয়ামী লীগ মনে করে, ‘বাজেট নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে দলটি’।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বাজেট প্রতিক্রিয়ায় গতকাল বলেন, ‘২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবসম্মত, ভারসাম্যমূলক, গণকল্যাণমুখী, যুগোপযোগী ও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র ও নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন ঘটেছে। এ বাজেট নির্বাচনী ইশহেতার বাস্তবায়ন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। দেশের আর্থসামাজিক বিকাশ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করবে বাজেট। এ বাজেট মৌলিক-সামাজিক দর্শনের ও জনগণের কল্যাণের, যা টেকসই অর্থনীতিকে আরো মজবুত করবে।’

১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বাজেটের কিছু দিকের সমালোচনা করে বলেন, ‘সমৃদ্ধির পথচলায় বৈষম্যের যে সিন্দাবাদের দৈত্য জাতির ঘাড়ে চেপে বসে আছে, এর থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় বাজেটে নেই। বরং মধ্যবিত্তকে চাপে রেখে ধনীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। পোশাকশিল্পের মালিকদের জন্য প্রণোদনা বাড়লেও পোশাকশিল্প শ্রমিকরা সেই তিমিরেই রইলেন। আর যে কৃষক ধানসহ তার উৎপাদিত ফসলের দাম না পেয়ে জেরবার অবস্থায়, তাদের পণ্যমূল্য সহায়তারও কোনো ব্যবস্থা নেই বাজেটে। দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির পেছনে যারা মূল শক্তি সেই কৃষক, শ্রমিক, নারী উদ্যোক্তারা অবহেলিতই এ বাজেটে।’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে জিডিপির আকার, প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও বাজেটে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমছে না। শুধু আয়-বৈষম্যই নয়, আঞ্চলিক বৈষম্য ও গ্রাম-শহরের বৈষম্য অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। নিজেদের শ্রমশক্তির উন্নয়ন ঘটাতে না পারলে শুধু ট্যাক্স ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রায় সরকার পৌঁছাতে পারবে না।’

আরেক শরিক দল জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, ‘বাজেটে বৈষম্য কমার বদলে বছর বছরে বাড়ছে। বৈষম্য কমিয়ে আভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কীভাবে বাড়ানো যায়, সেদিকে খেয়াল দিতে হবে।’

১৪ দলের আরেক শরিক জাসদ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বাজেটকে দেখছেন ইতিবাচকভাবে। তিনি বলেন, ‘সামরিক শাসন ও সাম্প্রদায়িক সরকারগুলোর বিশৃঙ্খলার অর্থনীতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ধারাবাহিকতায় ১১তম বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এ বাজেটের ইতিবাচক দিক হচ্ছে, গত পাঁচ বছরে ৭ থেকে ৮-এর ঘরে থাকা প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার অঙ্গীকার এখানে আছে। সব মিলিয়ে, সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরো একধাপ এগিয়ে নেওয়ার বাজেট এটি। সমালোচকরা গতবারও সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে নানা কথা বললেও, কাজে তাদের মিথ্যে প্রমাণ করা হয়েছে। এবারের বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো।’

জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের মনে করেন, ‘পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বিরাট অঙ্কের ঋণ নেওয়া হলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ভ্যাটের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অংশ আদায় হবে কি না, এ বিষয়ে সংশয় রয়েছে।’

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads