• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝর সিটরের তান্ডব

সংরক্ষিত ছবি

জলবায়ু

বাংলাদেশে প্রলয়ঙ্কারী ৫ দুর্যোগ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৭ মে ২০১৮

প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমগ্র জনগোষ্ঠীর ওপরই প্রভাব ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগই এখন পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বরং অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে এই দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা বেশি। স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকটি বড় বড় বিপর্যয়কে এদেশের মানুষ সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেছে। প্রলয়ঙ্করী এসব দুর্যোগ কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য প্রাণ, নষ্ট করেছে সীমাহীন সম্পদ। ধ্বংস ও ব্যাপকতার দিক থেকে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নেওয়া কয়েকটি দুর্যোগ নিয়ে আজকের আয়োজন-

’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ

১৯৭১-এর যুদ্ধকালীন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই টানা দুই বছর আউশ ও আমন ধানের উৎপাদন ব্যাহত হয়। ১৯৭৩ সালে অনাবৃষ্টি এবং ১৯৭৪ সালে বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ’৭৪-এর এপ্রিল থেকে জুলাই মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় ব্রহ্মপুত্র নদীতে বিধ্বংসী বন্যা দেখা দেয়; যা মে ও জুলাই মাসে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ ধানের ফসল নষ্ট হয় এবং চালের দাম অসম্ভব বেড়ে যায়। এ অবস্থায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। অক্টোবর মাসে চালের দাম একদম শিখরে পৌঁছায়। ১৯৭২ সালের জুলাই থেকে ’৭৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২২ মাসের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যায় ৮০০ ভাগ পর্যন্ত। কিছু ক্ষেত্রে তা ১৫০০ ভাগ হতেও দেখা গেছে। ১৯৭২ সালের ১ জুলাই প্রতিমণ সরু আমন চালের খুচরা দাম ছিল বাজারে ৭৫ টাকা। ’৭৩-এর জুলাইয়ে হয়েছে ১১৫ টাকা। ’৭৪-এর মার্চে বেড়ে হয়েছে ১৬০ টাকা। বৃদ্ধির হার ২১৫ শতাংশ। চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় দুর্ভিক্ষের প্রকোপ ’৭৪-এর মার্চ মাস থেকে দেখা দেয়। ওই মাসে রংপুর অঞ্চলে প্রথম মন্দা দেখা দেয় এবং এই অঞ্চল ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি অঞ্চলের একটি।

সে সময়ে কয়েক লাখ মানুষ অনাহার অথবা অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যায়। পথেঘাটে কঙ্কালসার মানুষের মৃতদেহ পড়ে থাকত। অভাবের তাড়নায় গায়ের কাপড় পর্যন্ত বিক্রি করেছে অনেকে। অনাহারে থেকে থেকে কোনো কোনো পরিবার বেছে নিয়েছিল আত্মহত্যার পথও। বহু কৃষক কয়েক মৌসুমের ফসল অগ্রীম বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। খাবার ও কাজের খোঁজে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রচুর মানুষ ঢাকা শহরে ছুটে আসে। অনেকে তাদের ভিটেমাটি ও সর্বস্ব বিক্রি করে খাদ্যের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমায়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সে বছর ৭৩২ কোটি টাকার খাদ্যশস্য আমদানি করেছিল, কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল, মজুতদার এবং দুর্নীতিবাজদের কারণে দেশ কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ কঠিন পরিস্থিতিতে সাহায্য করতে বিলম্ব করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সে সময়ের সরকার সাহায্য চেয়েও পায়নি। বাংলাদেশ-কিউবার বাণিজ্য সম্পর্ক থাকার অজুহাতে সে সময় যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য দেওয়া বন্ধ করে দেয়। অতঃপর নভেম্বর মাসে বিদেশি সাহায্য ও রবি শস্য বাজারে আসার ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

’৮৮-এর মহাপ্লাবন

১৯৮৮ সালের মহাপ্লাবনে ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার বর্গমাইল তলিয়ে যায়। বন্যার করাল গ্রাসে সরকারি হিসাব অনুযায়ী লোক মারা যায় ৩৩৩ জন। আর বেসরাকরি হিসাবে এ সংখ্যা ৬০০-এর বেশি।

দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৭টি বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল। ৪৬৮টি উপজেলার ২৯৩টি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা সরকারি হিসাবে ২ কোটি ১০ লাখ। বেসরকারি হিসাবে প্রায় ৩ কোটি। বাস্তুহারা হয় ৩০ লাখ মানুষ।

বিগত ৩৫ বছরে বন্যাকবলিত হয়নি এমনসব উঁচু এলাকাও তলিয়ে গিয়েছিল ’৮৮-এর মহাপ্লাবনে। এ বন্যায় দেশের প্রায় ৮০ লাখ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল। বন্যায় ১ কোটি কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পতিত হয়েছিল। প্রায় ২০ লাখ একর জমির ফসল পুরোপুরি এবং ১৫ লাখ একর জমির ফসল আংশিকভাবে ভেসে যায়।

বন্যায় সরকারি হিসাবে ফসল ক্ষতি হয় ২০ লাখ টন শস্য। প্রলয়ঙ্করী বন্যার ছোবলে দেশের ৬ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের মধ্যে ১ হাজার ১৭৫ কিলোমিটার ধ্বংস হয়। এ ছাড়া সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

দেশের ২৪৬টি সেতু ও কালভার্ট বিধ্বস্ত এবং প্রায় আড়াই হাজার ফুট রেলপথ বন্যায় ভেসে যায়। সর্বোপরি গাছপালা ভেসে যায় এবং পরিবেশের বিপুল ক্ষতি হয়।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, ’৮৮-এর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ মেরামতের জন্য তখন প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। এ ছাড়া কয়েক হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছিল। বন্যায় ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সমগ্র দেশের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।

এ বন্যায় রাজধানীরও অনেক এলাকা ডুবে যায়। ধানমন্ডি, শেরেবাংলা নগর, গুলিস্তান ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কিছু অংশ ছাড়া রাজধানীর প্রায় সব এলাকাই জলমগ্ন হয়েছিল। তখনকার হিসাবে ৬০ লাখ লোকের রাজধানী ঢাকা শহরের প্রায় ৫০ লাখই পানিবন্দি হয়ে পড়ে।

ঢাকায় প্রায় ৪০০ ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছিল। এসব ত্রাণ শিবিরে প্রায় ৫ লাখ বন্যার্ত আশ্রয় নিয়েছিল।

বন্যার পানি বিমানবন্দরের রানওয়েতে উঠে যাওয়ায় ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ করা হয়েছিল। আবহাওয়া অফিস, আগারগাঁও সম্প্রচার ভবন, পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল প্রভৃতি স্থানে পানি উঠে গিয়েছিল।

পঙ্গু হাসপাতালে রোগী ভর্তিই বন্ধ রাখা হয়েছিল। মিটফোর্ড হাসপাতালে সব অপারেশন স্থগিত রাখা হয়েছিল। শ্যামলী এলাকায় আবাসিক ভবনের একতলা পর্যন্ত তলিয়ে গিয়েছিল।

ডুবে যাওয়া ঢাকা শহরে তীব্র পানি সঙ্কটও দেখা দিয়েছিল। ওয়াসার ২৭টি গভীর নলকূপ বিকল হয়ে পড়েছিল। ফলে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ২০ থেকে ২৫ ভাগ কমে গিয়েছিল।

বন্যাকবলিত ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে পরিবেশ শীতল হয়ে উঠেছিল। কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছিল ডায়রিয়া, পেটের পীড়া। এতে ৭১ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। ’৮৮ সালের বন্যার মতো ’৯৮ সালের বন্যাও দীর্ঘ সময় স্থায়ী ছিল।

 

১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড় ম্যারি এন

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল দিনটি চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে অন্য আর দশটি দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস স্বাভাবিক জীবনের স্পন্দন থামিয়ে দিয়েছিল সেদিন। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫০ কিলোমিটার গতিবেগে আঘাত হানে ওই ঘূর্ণিঝড়। এর ফলে সৃষ্ট ৬ মিটার (২০ ফুট) উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষ, গবাদিপশু, ঘরবাড়িসহ সবকিছু। দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ নিহত এবং এক কোটি মানুষ তাদের সর্বস্ব হারিয়ে ঠাঁই নেয় খোলা আকাশের নিচে। মারা পড়ে ২০ লাখ গবাদিপশু। বেশিরভাগই নিহত হয় চট্টগ্রাম জেলার উপকূল ও দ্বীপগুলোয়। সন্দ্বীপ, মহেশখালী, হাতীয়া দ্বীপে নিহতের সংখ্যা সর্বাধিক। এর মধ্যে শুধু সন্দ্বীপেই মারা যায় প্রায় ২৩ হাজার লোক।

নিহতের সংখ্যা বিচারে স্মরণকালের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে ’৯১-এর এই ঘূর্ণিঝড় একটি। ম্যারি এন নামক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় লণ্ডভণ্ড করে দেয় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার পুরো উপকূল। বিস্তীর্ণ অঞ্চল পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এত বড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এদেশের মানুষ এর আগে আর কখনো হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ের পরদিন লাশের স্তূপ জমে গিয়েছিল। লাশের পর লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল চারদিকে। বাড়ির উঠানে জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে ভেসে যেতে দেখা গেছে নারী, পুরুষ, শিশুর লাশ। শুধু মানুষ নয়, গরু-ছাগল-মহিষ আর মানুষের মৃতদেহে একাকার হয়ে গিয়েছিল সেদিন।

ধারণা করা হয়, এই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রায় ১ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। সাগর ও নদীর উপকূল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাসে ধ্বংস হয় কর্ণফুলী নদীর তীরে কংক্রিটের বাঁধ। চট্টগ্রাম বন্দর এ সময় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছোটবড় জাহাজ, লঞ্চ ও অন্যান্য জলযান নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অনেক যানও ছিল। এ ছাড়া প্রায় ১০ লাখ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থলভাগে আক্রমণের পর এর গতিবেগ ধীরে ধীরে হ্রাস পায় এবং ৩০ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড়টি বিলীন হয়।

ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড়ের কথা আজো ভুলতে পারেনি উপকূলবাসী। স্বজন ও নিজের সর্বস্ব হারিয়ে সে ক্ষত বয়ে চলেছে সেখানকার বাসিন্দারা।

 

পাহাড়ধস (২০১৭)

টানা তিন দিনের প্রবল বর্ষণে ২০১৭ সালের ১২ জুন মধ্যরাত ও ১৩ জুন ভোরে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে ১৫৬ জন মারা যায়। আহত হয় কয়েকশ’ মানুষ। উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে উদ্ধারকর্মীরাও প্রাণহানির শিকার হয়েছিলেন সে সময়। সেনা ও দমকল বাহিনী ওই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিল।

প্রলয়ঙ্করী ওই পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে জানা যায়, নির্বিচারে বন-জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপনের ফলে অনেক টিলার উপরিভাগ ক্ষয় হয়ে গিয়েছিল। আর সরকারি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এসব টিলার ঢালু ভূমিতে ঘর তৈরি করে গরিব লোকদের কম ভাড়ায় থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। ঘটনার শুরুর দিন সকাল থেকে ৩৪৩ মিলিমিটার করে ২৪ ঘণ্টা বৃষ্টিপাতের কারণে ওই পাহাড়ধস সংঘটিত হয়। সে সময় রাঙামাটিতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে।

 

১২ জুন রাত থেকে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষাপটে উদ্ধার অভিযান শুরু করে দমকল বাহিনী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা। ১৩ জুন ভোরে রাঙামাটির মানিকছড়িতে একটি পাহাড়ধসে মাটি ও গাছ পড়ে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে রাঙামাটি আঞ্চলিক সদরের নির্দেশে মানিকছড়ি সেনাবাহিনী ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল সেখানে গিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে উদ্ধারকাজ শুরু করে। উদ্ধারকাজ চলার সময় বেলা ১১টার দিকে পাহাড়ের একটি বড় অংশ উদ্ধারকারীদের ওপর ধসে পড়লে তারা মূল সড়ক থেকে ৩০ ফুট নিচে পড়ে যায়। পরে একই ক্যাম্প থেকে আরো একটি উদ্ধারকারী দল এসে দুই সেনা কর্মকর্তাসহ নিহত চার সেনা এবং আহত অবস্থায় ১০ সেনাকে উদ্ধার করে। ১৬ জুন শুক্রবার বিকালে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

 

সিডর (২০০৭)

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ দুর্যোগের নাম ‘সিডর’। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী এই ঘূর্ণিঝর। সিডরের ভয়াবহ আঘাতে মুহূর্তেই উপকূলীয় জনপথগুলো মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, মাঠঘাট এমনকি গাছের সঙ্গে ঝুলে ছিল শত শত মানুষের লাশ। গৃহহীন হয়েছিল লাখ লাখ মানুষ।

এক দশকের বেশি পার হয়ে গেলেও সিডরের নাম শুনলেও এখনো আঁতকে ওঠে উপকূলবাসীরা। সিংহলি শব্দ সিডর নামের অর্থ চোখ। দ্বীপপুঞ্জে ৯ নভেম্বর এর উৎপত্তি হলেও ১৫ নভেম্বর আঘাত হানে বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতে। তবে এর বেশি ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রীয় অংশ সেদিন সন্ধ্যা ৬টার পর বাংলাদেশের পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদের কাছে উপকূল অতিক্রম করে। রাত ১০টার দিকে প্রবল বাতাসের সঙ্গে যুক্ত হয় জলোচ্ছ্বাস। চূড়ান্ত আঘাত হানে সিডর। রাত ১০টার পরই মূলত ঘূর্ণিঝড় সিডর উপকূলীয় এলাকার পাথরঘাটা, সাউথখালী ও দুবলারচরে আঘাত হানে। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ২২০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার, যা দমকা হাওয়া আকারে আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। তার সঙ্গে ছিল ২০ থেকে ২৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস। ঝড়ের ব্যাসার্ধ ছিল ৭৪ কিলোমিটার, যা মুহূর্তের মধ্যে বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, ভোলা, লক্ষ্মীপুরে বিস্তৃত হয়। এ সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দেশের ৩০টি জেলা। ঝড়ে প্রায় ৫ হাজারের অধিক মানুষ মারা যায়। দক্ষিণের উপকূলীয় জেলাগুলো পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। সরকারি হিসাবে সিডরে ৩ হাজার ৩৪৭ জন নিহত, ৫৫ হাজার ২৮২ জন আহত ও ৮৭১ জন নিখোঁজ হয়। গবাদি পশু মারা যায় ১৭ লাখ ৮৭ হাজার ৫০৭টি। ৩০টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ১২টি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০ উপজেলার ১ হাজার ৯৫০টি ইউনিয়নের প্রায় ২১ লাখ পরিবারের ৮৯ লাখ ২৩ হাজার ২৫৯ মানুষ, ১৬ হাজার ৯৬১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২৮ লাখ ৭২ হাজার হেক্টর জমির ফসল, ১৫ লাখ ১৮ হাজার ৯৪২টি বাড়ি, ৮ হাজার ৭৫ কিলোমিটার সড়ক এবং ৩ হাজার ৫৬২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়। সারা দেশে বিশুদ্ধ পানির অভাব হয়।

প্রিয়জনহারা অনেকে এখনো সিডরের ওই দিবসে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সিডরের ক্ষতচিহ্ন বহন করে চলেছেন অনেকে। প্রত্যন্ত জনপদে এখনো স্বজনহারা মানুষের বিলাপ শোনা যায়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads