• রবিবার, ২৬ মে ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
ভেজাল মসলায় সয়লাব বাজার

ভেজাল মসলায় সয়লাব বাজার

ছবি : সংগৃহীত

পণ্যবাজার

ভেজাল মসলায় সয়লাব বাজার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৩ এপ্রিল ২০১৯

বাঙালির রান্নাবান্নায় যেসব উপাদান বেশি ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মসলা। আমাদের দেশে হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, জিরা ইত্যাদি মসলা হিসেবে অনেক বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। এসব মসলা আবার খোলাবাজারেও বিক্রি হয়। এসবের ক্রেতা শহর এবং গ্রামের নিম্নআয়ের মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন ঘাসের বীজ, চাল ও ডালের গুঁড়া, ধানের তুষে রঙ মিশিয়ে এসব মসলা তৈরি ও বিক্রি করা হয়। এসব ভেজাল মসলার বড় ক্রেতা হচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ। আবার চট্টগ্রামের সামাজিক মেজবানগুলোতেও ব্যবহার হয় এই মসলা। নিম্নআয়ের মানুষকে নিরুপায় হয়ে এসব মসলা ব্যবহার করতে হয়। বিএসটিআইয়ের ভেজালবিরোধী অভিযানে মসলার সঙ্গে ভেজাল মিশিয়ে তৈরি ও বিক্রি করার ভয়াবহ এই চিত্র পাওয়া গেছে। এতে দেখা গেছে- রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার, মৌলভীবাজার, মিরপুর, টঙ্গী এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের মসলা তৈরির কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে মসলার গুঁড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৌশলে পৌঁছে যায় খুচরা পাইকার ও ক্রেতাদের হাতে। কারওয়ান বাজারে ভেজালবিরোধী অভিযানে মসলায় ভেজাল মেশানোর বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়ে। এখানে গড়ে ওঠা কয়েকটি কারখানায় হলুদ মরিচ, ধনিয়া, জিরাসহ বিভিন্ন মসলা ভাঙানোর কাজ চলে। এসব কারখানায় ঘাসের বীজের সঙ্গে রঙ মিশিয়ে ভেজাল গুঁড়া মসলা তৈরির কার্যক্রম হাতেনাতে ধরা পড়ে। এতে দেখা যায়, ঘাসের বীজ বা কাউন যা পাখির খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তা ভেজাল মসলার মূল উপকরণ। ঘাসের বীজ গুঁড়া করে ক্ষতিকর রঙ মেশানো হয়। এতে লাল রঙ মেশালে তৈরি হয়ে যায় মরিচের গুঁড়া। আর হলুদ রঙ মেশালে একই গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে হলুদের। এর সঙ্গে কিছু পচা কাঁচামরিচ শুকিয়ে দিলে মরিচের গুঁড়ায় হাল্কা ঝাল হয়। আর নকল হলুদের গুঁড়ায় কিছু আসল হলুদের গুঁড়া মিশিয়ে দিলে কেউ ভেজাল মসলা হিসেবে আর চিহ্নিত করতে পারেন না।

কারওয়ান বাজার এলাকায় একটি ভেজাল কারখানায় সরাসরি যুক্ত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ১৫ বছর ধরে তাদের কয়েকজন এ প্রক্রিয়ায় ভেজাল মসলার গুঁড়া তৈরি করছেন। গভীর রাতে রঙ মেশানোর কাজ করা হয়। এখান থেকে তৈরি ভেজাল গুঁড়া মসলার বেশিরভাগই বিক্রি হয় ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। অধিক লাভের আশায় বাইরের পার্টি এসে এখানে ভেজাল মসলার অর্ডার দেয়। আসল হলুদ ও মরিচের গুঁড়া ২৫০ টাকা কেজি হলেও ভেজাল এ মসলার গুঁড়া মেলে ১৩০ টাকায়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কারওয়ান বাজারের সব কারখানায় এভাবেই ভেজাল দেওয়া হয়। অন্য একটি কারখানা সম্পর্কে ছদ্ম নামের মালেক বলেন, তার বাবা তাকে এই ভেজাল মসলার কাজ শিখিয়েছেন। এখন তিনি নিজেই কর্মচারী দিয়ে এসব কাজ করান। তার বাবা বিক্রির কাজ করেন। অপর এক মসলা ব্যবসায়ী জানান, গুঁড়া মসলায় যে রঙ মেশানো হয় তা কাপড় তৈরির রঙ। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের দোতলায় ৩০০ টাকা কেজিতে এসব রঙ পাওয়া যায়। অথচ খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে যে রঙ ব্যবহার করা হয় তার দাম ৫ হাজার টাকা কেজি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাপড়ের রঙ শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ভেতরে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে। অক্সাইড জাতীয় এসব টেক্সটাইলের রঙ মেশালে প্রথমে এসিডিটি হয়। অব্যাহতভাবে ভেজাল দেওয়া এসব মসলা ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস, ক্যানসার, কিডনি ড্যামেজ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

জানা যায়, মানুষের মৌলিক চাহিদার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) মধ্যে খাদ্য একটি প্রধান ও অন্যতম মৌলিক চাহিদা। জীবন ধারণের জন্য খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। অথচ বাংলাদেশে বিশুদ্ধ খাবার প্রাপ্তি কঠিন করে ফেলছে কিছু বিবেকহীন ব্যবসায়ী ও আড়তদার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, এসব ভেজাল ব্যবসায়ী অভিযানে ধরা পড়লেও জরিমানা দিয়ে জামিনে বের হয়ে এসে আবার একই কাজের সঙ্গে জড়িত হন। বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, যেসব ম্যান্ডেটরি আইটেম রয়েছে সেগুলো প্রস্তুত বা উৎপাদন ও বিপণন করতে হলে অবশ্যই বিএসটিআইয়ের অনুমোদন লাগবে। অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানেই মূলত ভেজালের কাজ বেশি হয়। তারা বলেন, বাজারের খোলা অবস্থায় বিক্রি হওয়ার কারণে মান নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা থাকে না। রমজান এলেই এ ধরনের ভেজাল মসলার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আবার এসব ভেজাল মসলার বড় ক্রেতা হলো রাজধানীর হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো। সরাসরি মিল মালিকদের কাছ থেকে তারা পাইকারি দামে এসব মসলা সংগ্রহ করেন। হোটেল-রেস্তোরাঁয় এসব ভেজাল মসলা ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের হানি ঘটছে।

রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম মহানগরীতেও রয়েছে অসংখ্য ভেজাল মসলার কারখানা। সেখানে পরিচালিত অভিযানে এর তথ্য মিলেছে। এতে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে যেসব সামাজিক মেজবানের আয়োজন করা হয় সেখানে এই ভেজাল মসলার কদর রয়েছে অনেক বেশি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামেও চটকদার মোড়কে মানুষকে আকৃষ্ট করে অসাধু ব্যবসায়ীরা মানুষকে ভেজাল মসলা খাওয়াচ্ছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads