• মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬
ads
সিন্ডিকেট বাড়িয়েছে দাম

সংগৃহীত ছবি

পণ্যবাজার

অভিযানের পর দাম পড়ল কেজিপ্রতি ১৫ টাকা

সিন্ডিকেট বাড়িয়েছে দাম

  • নাজমুল হুসাইন
  • প্রকাশিত ০২ অক্টোবর ২০১৯

পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমূল্যে নড়েচড়ে বসেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দাম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে ডজনখানেক পদক্ষেপ। তবে সেসবের সুফল মিলবে কবে? সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। চট্টগ্রামের বৃহত্তর পাইকারি মার্কেট খাতুনগঞ্জে অভিযান চালানোর পরপরই দাম পড়েছে ১৫ টাকা। কিছু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে রাখতে তৎপর এখনো।

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পরে আদতেই কি সহসা পেঁয়াজের দাম কমে আসবে? এমন প্রশ্নের জবাবে বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর উত্তর নেতিবাচক। তারা বলছেন, দেশে মজুদ পেঁয়াজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে পেঁয়াজের সংকট দেখা দিতে পারে। কারণ ভারতই পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা। আর দেশেও এখন মৌসুম শেষ হওয়াতে দেশি পেঁয়াজের সংকট রয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশ থেকে যতটুকু পেঁয়াজ আসছে সেটা দিয়ে সাময়িক সংকট মোকাবেলা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে জোগান স্বাভাবিক রাখা সম্ভব নয়। এ কারণে ভারত থেকে আমদানি বন্ধের বড় প্রভাব বাজারে পড়বে। আর এ সংকট হবে দীর্ঘমেয়াদি।

এদিকে পেঁয়াজ নিয়ে এ অস্থির পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট আরো তৎপর হয়ে উঠেছে। সেটাই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। কিছু বাজারে বিক্রি বন্ধ রেখে পেঁয়াজ মজুত করার খবর পাওয়া যাচ্ছে, আবার কোথাও হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে পেঁয়াজ- এমন খবর মিলছে। এ পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের সবচেয়ে বড় বাজার খাতুনগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের মুখে নজরে পড়ল সিন্ডিকেটের তৎপরতা। এতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে বাজারে পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা।

গতকাল মঙ্গলবার ওই বাজারে পেঁয়াজের তিনটি আড়তে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পেঁয়াজ ক্রয়মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রির প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছেন আদালত। সেখানে মিয়ানমার ও ভারত থেকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪২ টাকায় কিনে, ৭৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রির প্রমাণ মিলেছে।

এমন অভিযানের পরে গতকাল কমে আসে খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম। প্রতি কেজি ৯০ থেকে কমে নামে ৭৫ টাকায়। এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে যে দরে পেঁয়াজ কেনা তার চেয়ে বেশি দরে আড়তদারদের বিক্রির প্রমাণ মিলেছে। অধিকাংশ আড়তেই একই অবস্থা। আসলে পেঁয়াজ নিয়ে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে অসাধু মহল।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, এখানে পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন বেশ কয়েকজন আমদানিকারক। যেহেতু এখানকার আড়তদাররা কমিশনে ব্যবসা করেন, সেহেতু আমদানিকারকরা না চাইলে তাদের পক্ষে আগের দামে পেঁয়াজ বিক্রি করা সম্ভব নয়। এ কারণে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন আমদানিকারকের তথ্য আমরা পেয়েছি। এসব আমদানিকারকের তালিকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

এদিকে এ পরিস্থিতির জন্য আমদানিকারকদের দুষিয়ে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমও বলেন, পেঁয়াজের আড়তদার আছেন ২০০-২৫০ জন। মূল আমদানিকারক দশজন। এরা হিলি-বেনাপোল ও সোনা মসজিদ বন্দর এলাকার। আমরা আমদানিকারকদের হাতে জিম্মি। তাদের নির্ধারিত দামেই এখানে পণ্য বিক্রি হয়।

তিনি এও বলেন, যখন আমদানিকারক বলে ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি করতে হবে, নইলে ভবিষ্যতে মাল দেবে না, তখন আমরা নিরুপায় হয়ে পড়ি। এ ব্যবসায়ীর হিসেবে বিভিন্ন দেশ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ও অন্যান্য জায়গায় যত পেঁয়াজ এসেছে, সেসব বৃহস্পতিবারের মধ্যে বাজারে এলে দাম ৫০-৬০ টাকায় নেমে আসবে।

এদিকে সিন্ডিকেটের আভাস রয়েছে রাজধানীর বড় পাইকারি বাজারগুলোতেও। পাইকারি বাজারের তোপে ঢাকার খুচরা বাজারেও অধিকাংশ বিক্রেতাই ১২০-১৩০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন গতকাল। তবে সে সময় শ্যামবাজারে গিয়ে দেখা গেছে কোনো দোকানেই পেঁয়াজের ঘাটতি নেই। আমদানি বা দেশি দুই ধরনের পেঁয়াজের সরবরাহ পর্যাপ্ত ওখানে। এমনকি কারওয়ানবাজারের আড়তগুলোতে ঘুরে দেখা গেল কোনো কোনো দোকানে পেঁয়াজের বস্তা প্রায় ছাদ পর্যন্ত ঠেকেছে। অথচ দাম আকাশছোঁয়া। সেখানে রোববারের যেসব পেঁয়াজ ৬০-৬৫ টাকা ছিল তা এখন ৯০-১০৫ টাকা। এর মধ্যে দেশি পেঁয়াজ ১০০-১০৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৯০-৯২ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেল।

অন্যদিকে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যার মধ্যে  পেঁয়াজ আমদানি ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন এবং সুদের হার হ্রাস করার জন্য পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। পাশাপাশি স্থল ও নৌ বন্দরগুলোতে আমদানি করা পেঁয়াজ  দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাসের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং ফোনে খোঁজ-খবর নিচ্ছে মন্ত্রণালয়।

দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেঁয়াজ পৌঁছানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের ১০ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব প্রদান করেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পহেলা অক্টোবর থেকে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, যশোর, দিনাজপুর, পাবনা, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার বাজারগুলোতে তদারকি শুরু করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ঢাকার ৩৫টি ট্রাকে ৪৫ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। গতকাল টিসিবির বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে সরেজমিন ঘুরে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সরবরাহ পর্যাপ্ত না হলেও লাইনে দাঁড়িয়ে যারা প্রায় অর্ধেক দামে পেঁয়াজ ক্রয় করতে পেরেছেন তাদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে।

প্রসঙ্গত, গত রোববার রপ্তানি নীতি সংশোধন করে পেঁয়াজকে রপ্তানি নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। রপ্তানি বন্ধের ওই সিদ্ধান্ত রাতারাতি কার্যকর করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব দেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের পথে থাকা সব ট্রাক আটকে দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এ কারণে বাংলাদেশে তার প্রভাব পড়তে সময় লাগেনি। এরপরই একদিনে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৩০ টাকা বেড়েছে।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads