• সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮, ৭ কার্তিক ১৪২৫
ads
একজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে ৫০ শয্যার এ হাসপাতাল!

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার ৫০ শয্যা হাসপাতাল

ছবি : বাংলাদেশের খবর

সারা দেশ

ধনবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

একজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে ৫০ শয্যার এ হাসপাতাল!

  • মো. ইউনুস আলী, ধনবাড়ী (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ১১ অক্টোবর ২০১৮

ঢাল নেই-তলোয়ার নেই নিধিরাম সরদার। গ্রামের এ প্রবাদ বাক্যের মতোই একজন চিকিৎসক দিয়ে খুড়িয়ে-খুড়িয়ে চলছে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। নামে ৫০ শয্যা হলেও বাস্তবে নেই একটিও। দুই বছর আগে ৫০ শয্যার বেড আসলেও এখনো রয়েছে বাক্সবন্দি। ৫০ শয্যার বেড, এ্যাম্বুলেন্স, এক্স-রে, ইসিজি, ওটিসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সকল যন্ত্রপাতি থাকালেও নেই কোন কার্যক্রম। নেই কোন ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী। যার ফলে ইনডোর চিকিৎসা একে বারেই চালু হয়নি। বহির্বিভাগের রোগীদের আসা-যাওয়া আর পরামর্শ নেয়াই হলো ৫০ শয্যা এ হাসপাতালের নিত্যদিনের চিত্র। ফলে এখানে চিকিৎসা নিতে আসা জরুরী রোগীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। কেউবা আবার দালালের খপ্পরে পড়ছেন। ১৩০ দশমিক ২০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলার সোয়া ২ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবার ভরসাস্থল এ হাসপাতাল চলছে একজন ডাক্তার দিয়ে। ফলে এ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫০ শয্যা এ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর সাবেক খাদ্য মন্ত্রী স্থানীয় সাংসদ ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এমপি তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক অধ্যাপক ডা. দ্বীন মোহাম্মদ নুরুল হককে সাথে নিয়ে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এ হাসপাতাল উদ্বোধন করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় সরেজমিনে এ হাসপাতালে গিয়ে হাসপাতাল ভবনের প্রধান ফটকে জটলা দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এরা সবাই বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি এবং স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের দালাল। হাসপাতালে ঢুকার পর নিচ তলার বারান্দায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভিড় পরিলক্ষিত হয়। হাসপাতালের ২য় তলায় গিয়ে দেখা যায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কক্ষে একজন চিকিৎসক বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, আউটডোরের সরঞ্জাম দিয়েই চালানো হচ্ছে এখানকার চিকিৎসা কার্য্যক্রম।

প্রতিদিন ২‘শ থেকে ২৫০ জন রোগীর এখান থেকে ব্যবস্থ্যপত্র দেয়া হয়। ইনডোর চালু না থাকায় গড়ে প্রতিদিন ৮-১০ জন রোগী অন্যত্র রেফার্ড করা হয়।

হাসপাতালের (ভারপ্রাপ্ত) উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ডা. আমিনূর রসুল জাকি জানান, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে আমি ছাড়া অন্য কোন চিকিৎসক নেই। বেডসহ মালামাল আসলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এ হাসপাতালের ইনডোর সেবা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সিমিতভাবে প্যাথলজি, এ্যাম্বুলেন্স, আউটডোর ও জরুরী বিভাগে সেবা চালু আছে। এ হাসপাতাল পুরোপুরি চালু করতে সকল শূণ্য পদ পূরণ করতে হবে। এখানে জুনিয়র কনসালট্যান্ট ১০ জন থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র একজন তাও আবার প্রেসনে কাজ করে টাঙ্গাইলে। সহকারী সার্জন থাকার কথা পাঁচজন আছে মাত্র একজন। তার মতে সার্বিক স্বাস্থ্য চিত্রই এখানে একে বারেই নাজুক। তিনি বলেন ইতি মধ্যে শূণ্য পদ পূরণসহ সকল প্রকার চাহিদাপত্র উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠিয়েছি। তিনি আরো বলেন, ২০১৮ সালের নিয়োগ বিধি মালায় পরিবর্তন আসায় ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির নিয়োগ এখন সরকারীভাবে বন্ধ। তিনি বলেন, এ হাসপাতালের সকল শূণ্য পদ পূরণ, অর্থ ছাড় এবং জিও (সরকারী আদেশ) হলে এ হাসপাতাল পুরোপরি চালু করা সম্ভব হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখানে চাহিদা মত ঔষধ নাই। টাঙ্গাইল থেকে যা দেয়া হয় তা দিয়েই বিপুল সংখ্যক রোগীর ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয়। ইনডোর চালু না থাকায় জরুরী রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অন্যত্র রেফার্ড করা হয়।

কথা হয় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী নিজবর্ণি গ্রামের আঃ মালেক, ধনবাড়ী কলেজ পাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম, নতুন বাজার গ্রামের আয়েশা বেগম, বানিয়াজান গ্রামের সালেহা বেগম, রোজিনা বেগম, আঃ রশিদসহ কয়েকজন রোগীর সাথে। তারা জানান, সব ঔষধ এখানে পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে কিনতে হয়।

হাসপাতালের স্টোরের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য পরিদর্শক নুরুল ইসলাম জানান, এ হাসপাাতলের জন্য বরাদ্দ পাওয়া ৫১ টি বেড (রোগীর খাট ও বিছানাপত্র) থাকলেও তা বাক্সবন্দি অবস্থায়ই রয়েছে। জনবল ও অন্যান্য সরঞ্জামের অভাবে মূলতঃ চালু করা যায়নি এ হাসপাতালের ইনডোর চিকিৎসা।

হাসপাতালের এ রুগ্নদশা নিয়ে কথা হয় ছুটিতে থাকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও প: প: কর্মকর্তা ডা. শাহনাজ সুলতানার সাথে তিনি বলেন আমি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এক মাসের ছুটিতে আছি। তার মতে হাসপাতালে লোকবল ও সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। আরএমও (আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা) এর পদসহ অন্যান্য চিকিসৎকের পদ খালি রয়েছে। ডা. আমিনূর রসুল জাকি সকল পদে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এমপি স্যার কোথায় ঘাপলা রয়েছে তা খোঁজ খবর নিচ্ছেন। ডিজি স্যার ও ডা. সানোয়ার হোসেন এ ব্যাপারে যথাযথ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. শরিফ হোসেন খান জানান, এটা প্রশাসনিক ব্যাপার। জনবল নিয়োগ, অর্থ বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আসলেই এ হাসপাতাল পূর্নাঙ্গভাবে চালু হবে। আপনারা এ বিষয়ে লেখালেখি করেন যাতে সকল সমস্যা সমাধান করে শীঘ্রই এটা চালু করা যায়।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সাংসদ সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এমপি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রত্যন্ত এ এলাকার মানুষের চিকিৎসা সেবার কথা বিবেচনা করে ৫০ শয্যার হাসপাতাল দিয়েছেন এবং তিনি নিজে এসে এ হাসপাতালের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। দীর্ঘ দিনেও হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় তিনি বিশ্ময় প্রকাশ করেন। হাসপাতালটি যাতে অনতিবিলম্বে চালু করা যায় তার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সাথে কথা বলে সব রকম ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads