• মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮

প্রার্থী চূড়ান্তে হিমশিম খাচ্ছে আ.লীগ-বিএনপি

সংগৃহীত ছবি

নির্বাচন

প্রার্থী চূড়ান্তে হিমশিম খাচ্ছে আ.লীগ-বিএনপি

তিনশ আসনের বিপরীতে মনোনয়নপ্রত্যাশী ১০ হাজারের ওপর

  • রেজাউল করিম লাবলু/হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ১৯ নভেম্বর ২০১৮

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন বণ্টনে গলদগর্ম প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। নির্বাচনে সঙ্গী জোটের কারণে দুই দলের অবস্থা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। দফায় দফায় বৈঠক করেও শরিকদের সঙ্গে আসন চূড়ান্ত করতে পারছেন না দুই জোটের নেতারা। মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি তাদের জোট শরিক দলের নেতারা মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও তাদের সঙ্গী শরিক জোটের নেতারা বলছেন- সমঝোতার মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্তের চেষ্টা চলছে।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন আগামী ৩০ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৮ নভেম্বর। ২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই। ৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কাছে ৪ হাজার ২৩টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বিএনপি বিক্রি করেছে ৪ হাজার ৫৮০টি। দুই দল সব মিলিয়ে ৮ হাজারের বেশি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। প্রধান দুই দলের জোট শরিক দলগুলো মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে আরো ২ হাজারের বেশি। সব মিলিয়ে ৩০০ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আওয়ামী লীগ বড় ও গণতান্ত্রিক দল। দলে ত্যাগী, আদর্শবান, জনপ্রিয় ও যোগ্য নেতার অভাব নেই। এসব কারণে বিভিন্ন আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক। তবে জোটের রাজনীতির কারণে জোটের স্বার্থও সবাইকে দেখতে হবে। যারা জোটের জন্য ছাড় দেবেন, দলে তারা অন্যভাবে মূল্যায়ন পাবেন।

এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ২০-দলীয় জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান বলেন, ফ্রন্ট ও জোটের শরিক দলের নেতাদের বৈঠক হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে পরাজিত করতে যে জোট হয়েছে শরিক দলের নেতারা বিষয়টি মাথায় রেখে আসন বণ্টন নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়াবেন না। তাছাড়া বিএনপি একটি বড় দল হিসেবে অনেক ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে আসন বণ্টন নিয়ে খুব একটা সমস্যা হবে না বলে মনে করেন বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য।

নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগ, ১৪-দলীয় জোট, জাতীয় পার্টি ও যুক্তফ্রন্ট অন্তত মোটা দাগে ৯টি আসন নিয়ে চরম সঙ্কটে। নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের জেরে ‘ঝুঁকির’ মুখে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ও নীতিনির্ধারক অনেক নেতা। এ সঙ্কট আরো বাড়তে পারে।

সিলেট-১ ও ৬ : জোট ও মহাজোটের আসন বণ্টনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সিলেট-৬ আসনও জটিলতায়। এ আসন থেকে প্রার্থী মহাজোটের শরিক যুক্তফ্রন্টের নেতা ও সাবেক বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরী। আবার সিলেট-১ থেকেও মনোনয়ন চাচ্ছেন শমসের মবিন। এ আসনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী বলে অনেকে এখনো মনে করছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রার্থী না হলে সিলেট-১ আসনে শমসের মবিনের প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি অনেকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

ঢাকা-১ : জাতীয় পার্টির বিশেষ দাবি ঢাকা-১ আসনটি। এ আসনে দলটির প্রার্থী সালমা ইসলাম। অথচ এ আসনেই মনোনয়ন চাচ্ছেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। বিশিষ্ট এ শিল্পপতি ছাড়াও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুল মান্নান খানও এ আসনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

কুষ্টিয়া-২ : এ আসন থেকে এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী দলের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের অন্যতম নেতা রশিদুল আলম। তিনি দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের বড় ভাই। অথচ এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ১৪ দলের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। দলের প্রভাবশালী নেতা মনোনয়ন পাবেন, নাকি জোটের শরিক দলকে ছাড় দেওয়া হবে এ নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে।

ঢাকা-৮ : এ আসনে এবারো প্রার্থী হতে চাচ্ছেন ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। এ আসনে তাকে অনেকটাই ‘ঝুঁকিতে’ ফেলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন। তিনিও এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী।

মানিকগঞ্জ-২ : প্রার্থী নিয়ে মানিকগঞ্জ-২ সংসদীয় আসনেও ১৪-দলীয় জোটে আছে জটিলতা। আসনটি জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের কাছে জোরালোভাবে দাবি জানানো হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, এ আসনে দলের প্রার্থী কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম খুব জনপ্রিয়। ২০১৪ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও এখন ভোটারের কাছে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে দলীয় প্রধানের জরিপেও উঠে এসেছে।

নোয়াখালী-৪ : এ আসনে এবার মনোনয়ন চান সরকারের সম্ভাব্য শরিক ও বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। যুক্তফ্রন্ট মহাজোটে যোগ দিলে এ আসনও দলের প্রার্থীর জন্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ছাড় দিতে নারাজ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, আসনটিতে অ্যাডভোকেট সানজিদা খানমকে দলের প্রার্থী করা হোক।

চট্টগ্রাম-৯ : প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে প্রার্থী করে আসনটি চায় আওয়ামী লীগ। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে এখন সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। জাতীয় পার্টি এবার আসনটি চাচ্ছে।

চট্টগ্রাম-৮ : গত নির্বাচনে এ আসনটি আওয়ামী লীগ ছেড়ে দেয় জোট শরিক জাসদকে। মাঈনুদ্দিন খান বাদল এ আসনের সংসদ সদস্য। এবার এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রভাবশালী অন্তত সাত নেতা।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বিএনপি ও ২০-দলীয় জোট সমস্যার মুখে ৮ আসন নিয়ে। এসব আসনে একাধিক প্রার্থী আছেন বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০-দলীয় জোটের। এসব আসনে প্রার্থী নির্ধারণে হিমশিম খাচ্ছে দলটি।

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে মনোনয়ন চান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। একই আসন থেকে প্রার্থী হতে চান জামায়াতে ইসলামীর নেতা শাহদাতুজ্জামান। সবশেষ ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচন করেছিলেন অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান। তিনি এবারো মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। 

ঢাকা-২ (দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ) আসন থেকে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ঢাকা-৩ থেকে নির্বাচন করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমান উল্লাহ আমান। সবশেষ ২০০৮ সালে এই দুই আসন থেকে তারা নির্বাচন করেছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দুই আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ফ্রন্টের নেতা ও গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু। 

কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) থেকে নির্বাচন করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তবে এ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান ছাত্রদল নেতা এএমএম নিয়াজ মাকদুম মাসুম ও চৌদ্দগ্রাম থানা বিএনপির সভাপতি কামরুল হুদা।

নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনে সবশেষ ২০০৮ সালে নির্বাচন করেছিলেন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। এবারো তিনি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এদিকে এই আসনে দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা আবদুল করিম আব্বাসী।

চট্টগ্রাম-১৪ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) আসন থেকে মনোনয়ন চান বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তিনি এই আসনে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। মন্ত্রীও হয়েছিলেন বিএনপি সরকারের। একই আসনে মনোনয়ন চান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। বিএনপিরও প্রার্থী আছেন এ আসনে।

চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) থেকে মনোনয়ন চান বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ ইব্রাহিম। এই আসন থেকে সবশেষ নির্বাচন করেছিলেন সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম। তিনি মারা যাওয়ার পর এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ করেন তার মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। এছাড়া এ আসনে দলের মনোনয়ন চান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মীর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, তার ছেলে মীর মোহাম্মাদ হেলাল ও বিএনপি নেতা এসএম ফজলুল হক।

পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসন থেকে সবশেষ নির্বাচন করেছিলেন জামায়াতে ইসলামী নেতা মরহুম মতিউর রহমান নিজামী। এবার এই আসন থেকে মনোনয়ন চান তার ছেলে ব্যারিস্টার নাজিউর রহমান ও স্থানীয় জামায়াত নেতা ডা. আবদুল বাসেত। একই আসন থেকে মনোনয়ন চান কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এমএম আমিনুর রহমান।

কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এমএম আমিনুর রহমান গতকাল বাংলাদেশের খবরকে বলেন, তারা ৪০টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছেন। লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বলেন, তারা ৭০টি আসনে ফরম বিক্রি করেছেন। এভাবে জোট ও ফ্রন্টের শরিক দলগুলোর নেতারা তাদের দলের নেতাদের আসনসহ তালিকা বিএনপির কাছে জমা দেবেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads