• বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬

নির্বাচন

ঢাকা সিটি নির্বাচন

ভোটের তারিখ পেছানো হচ্ছে?

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ১৮ জানুয়ারি ২০২০

আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় ঢাকার জোড়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে বা এগিয়ে দেওয়ার দাবিতে ঐকমত্য গড়ে উঠেছে। সরকার ও সরকারি দল আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে রাজনীতির মাঠে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ দল বিএনপির মেয়র পদে প্রার্থীরাও ভোটের তারিখ পিছিয়ে বা এগিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। জাতীয় সংসদ ভবন থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচারণার মাঠের আলোচনায়ও একই দাবি উঠছে। সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ভোটের জন্য নির্ধারিত দিনে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা হওয়ায় তারিখ বদলের দাবির সঙ্গে সহমত জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণা, সভা, মিছিল ও জনসংযোগ ছাপিয়ে এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে নির্বাচনের তারিখ পুনর্বিবেচনার বিষয়টি। এমন পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের তারিখ পেছানো বা এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না, এ প্রশ্নই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

সরস্বতী পূজার কারণে নির্বাচন পেছানোর জন্য উচ্চ আদালতে দায়ের করা একটি রিট সম্প্রতি খারিজ হয়ে গেলেও নির্বাচন পেছানোর দাবি থেকে সরে আসেননি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা। দাবি থেকে সরেননি অন্যরাও। সবাই বলছেন, আদালতে রিট খারিজ হয়ে গেলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলে নির্বাচনের ভোট নেওয়ার দিন বা ভোটের তফসিলে কোনো পরিবর্তন আনতে পারে। আবার প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে ভোটের তারিখ পিছিয়ে দিতে পারেন। সরস্বতী পূজা ও সিটি নির্বাচনে ভোট একই দিন হলেও ভোটের তারিখ পরিবর্তনের দাবির বিষয়ে ইসি থেকে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তাতে অনেকেই হতাশ। তারা এখন ভোটের তারিখ পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।

সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র বাংলাদেশের খবরকে জানায়, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার দিনে ভোট হওয়ার বিষয়টি সরকার ও আওয়ামী লীগ সমর্থন করে না। সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিতের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সরকারের মতো দায়িত্বশীল আচরণ অতীতের কোনো সরকার করেনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তনয়া ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভোটের দিন এগিয়ে বা পিছিয়ে দেওয়ার দাবি শিগগিরই জানাতে পারেন। সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের দিকে খেয়াল রেখে তিনি প্রয়োজনে নির্বাহী আদেশ অনুযায়ীও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে ভোটের তারিখ পেছানোর বিষয়টি ‘স্বাধীন’ ইসির এখতিয়ার। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইসিকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হবে দু’একদিনের মধ্যে। চলতি সপ্তাহেই ভোটের তারিখ পুনর্নির্ধারণের ঘোষণা আসতে পারে বলেও সূত্র উল্লেখ করে।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল শুক্রবার দলের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ভোটের তারিখ নিয়ে ‘গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছার’ ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ‘সরস্বতী পূজার কারণে নির্বাচন কমিশন ভোটের তারিখ পরিবর্তন করলে আওয়ামী লীগ বা সরকারের আপত্তি নেই। তারিখ পরিবর্তনের এখতিয়ার সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের। সনাতন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নির্বাচন কমিশন আলোচনাসাপেক্ষে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ নিয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাবে বলে মনে করি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই সঙ্গে সরস্বতী পূজা ও ভোট নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, কাজ করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্বাচন ও সরস্বতী পূজা একই দিন হলেও বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের। এখানে সরকারের কিছু করার নেই। ইসি যেভাবে চাইবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেভাবেই কাজ করবে।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘সরস্বতী পূজার কথা বিবেচনা করে ঢাকা সিটি নির্বাচনের তারিখ পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কারো ধর্মীয় অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে। কোনো ধর্মের মানুষ মনে আঘাত পাক, ধর্মীয় কাজ করতে তাদের কোনো বাধা হোক, সেটা আমরা চাই না। আমরা ইসিকে অনুরোধ করব, নির্বাচনের তারিখটি আপনারা পুনর্বিবেচনা করুন। প্রয়োজনে নির্বাচন এক বা দুই দিন এগিয়ে কিংবা পিছিয়ে দিতে পারেন।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাচনের তারিখ দুই দিন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি গত বৃহস্পতিবার ওঠে জাতীয় সংসদেও। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ সংসদে বলেন, ‘আসন্ন মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষা দুদিন পিছিয়ে দেওয়া হোক। সরস্বতী পূজার দিন ভোটের তারিখ রাখা একটি ষড়যন্ত্র। কারণ, হিন্দুরা নৌকায় ভোট দেন। তাদের ভোটের দিন পূজায় ব্যস্ত রাখা হবে।’

যোগাযোগ করলে গতকাল শুক্রবার পঙ্কজ নাথ বাংলাদেশের খবরকে মুঠোফোনে বলেন, ‘২৯ জানুয়ারি সকাল থেকে সরস্বতী পূজার লগ্ন শুরু হয়ে ৩০ জানুয়ারি বেলা ১১টা পর্যন্ত লগ্ন থাকবে। ভোটের তারিখ পরিবর্তনের জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে। আদালত তা খারিজ করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী আদেশে ভোটের তারিখ দুই দিন পিছিয়ে দিতে পারেন।’

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকা সিটির নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। নির্বাচন হলে পরিণতি ভালো হবে না। যেকোনো মূল্যে নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। পরিস্থিতি খারাপ হলে এর দায়ভার নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে। নির্বাচন না হওয়ার দাবিতে ২০ জানুয়ারি সারা দেশে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করব আমরা।’

যোগাযোগ করলে ডিএনসিসিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র পদে প্রার্থী আতিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমার পক্ষ থেকে, দলের পক্ষ থেকে দাবি জানাচ্ছি, সম্ভব হলে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দিন। কারো ধর্ম পালনে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে। বাংলাদেশে সব ধর্মের সবারই উৎসব পালনের অধিকার আছে।’

ডিএনসিসিতে বিএনপির সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আওয়াল অভিযোগ করেন, ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার দিনে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনের দিন নির্ধারণ করে তাদের অপমান করেছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। হিন্দুরা ভোট বর্জন না করে যেন ধানের শীষে ভোট দিয়ে এই অন্যায়ের জবাব দেন, এ আহ্বান জানাই আমরা।’

অন্যদিকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তারিখ পেছানোর দাবিতে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো আমরণ অনশন পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা। এর আগে মঙ্গলবার এ দাবিতে প্রায় দেড় ঘণ্টা রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখেন তারা। সরস্বতী পূজার কারণে ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন পেছানোর দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গতকাল একাত্মতা প্রকাশ করেন ঢাবির উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। গতকাল বিকালে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান। নির্বাচনের তারিখ দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মনে আঘাত হেনেছে বলে মনে করে ঢাবি শিক্ষক সমিতি। ইসির নির্ধারিত এ তারিখ পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে বিবৃতিও দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads