• রবিবার, ৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads

নির্বাচন

যে কারণে ভোট কম

ইভিএম অনিরাপদ মনে করেছেন ভোটাররা

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট দিতে যাননি দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার। কম ভোটের নির্বাচনে জিতেছে আওয়ামী লীগে মেয়রপ্রার্থীরা। কাউন্সিলর পদেও বেশিরভাগ ওয়ার্ডে জিতেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। তবে ভোটের পর থেকেই সবচেয়ে আলোচনার বিষয়, এত কম ভোট কেন পড়ল। নির্বাচন কমিশন ও বিশ্লেষকরা পর্যালোচনা করছেন, কারণ খু্জছেন মানুষ কেন ভোটকেন্দ্রে যায়নি।

নির্বাচন কমিশন শনিবার রাতেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচিতদের নাম বেসরকারিভাবে ঘোষণা করেছে। দক্ষিণে ভোট পড়েছে ২৯ শতাংশ এবং উত্তরে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। ভোট শেষে সিইসি বলেছিলেন, ভোটার উপস্থিতি ৩০ ভাগেরও কম হবে। ইসি মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ২৫ ভাগেরও কম হবে। নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীতে নির্বাচনে নানা অনিয়ম, প্রচারে পাল্টাপাল্টি হুমকি-ধমকিসহ নানা কারণে ভোট নিয়ে ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব দেখা দিয়েছে। এবারের নির্বাচন শুরু থেকে উৎসবমুখর এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ থাকলেও ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে পারেনি।

উত্তর সিটি করপোরেশনে সাধারণ ওয়ার্ড ৫৪টি, সংরক্ষিত ১৮টি, মোট ভোট কেন্দ্র ১ হাজার ৩১৮টি, মোট ভোটকক্ষ ৭ হাজার ৮৪৬। মোট ভোটার ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন। তাদের মধ্যে ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ জন পুরুষ, ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৭০৬ জন নারী। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭ লাখ ১১ হাজার ৪৩৮ জন ভোটার।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সাধারণ ওয়ার্ড ৭৫টি, সংরক্ষিত ২৫টি, মোট ভোটকেন্দ্র ১ হাজার ১৫০টি, মোট ভোটকক্ষ ৬ হাজার ৫৮৮টি। মোট ভোটার ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন। তাদের মধ্যে ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪১ জন পুরুষ; ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩ জন নারী। দক্ষিণে ভোট দিয়েছেন ৬ লাখ ৬১ হাজার ১০৭ জন।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকায় যারা বসবাস করেন তারা সচেতন ভোটার।

শিক্ষার হারও বেশি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট তিনটি কারণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট কম পড়েছে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা। দ্বিতীয়ত, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএম নিয়ে অনাগ্রহ। আর তৃতীয়ত, নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ, নিরাপদ মনে করেননি সাধারণ ভোটাররা।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশের খবরকে গতকাল টেলিফোনে বলেন, মানুষ ধরেই নিয়েছে ভোট দিয়ে কোনো লাভ হবে না। নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করবে। ফলে ভোটের প্রতিফলন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না বলে অনেকে ধারণা করেছেন।

অন্যদিকে, ইভিএম নিয়েও অনেকের অনাগ্রহ রয়েছে। নতুন এই প্রযুক্তিতে ভোট দিতে আগ্রহ দেখাননি কেউ কেউ। এসব কারণের সঙ্গে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের ভীতিকর মনোভাব তৈরি হয়। অনেকে এই ভীতি থেকে ভোটকেন্দ্রে যেতে চাননি। তাদের ধারণা, জিততে মরিয়া মনোভাব থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো সংঘর্ষ কিংবা হানাহানির ঘটনা ঘটতে পারে যে কোনো সময়। এই ঝুঁকিও নিতে চাননি অনেক সাধারণ ভোটার।

এই বিশেষজ্ঞ বলছেন, কারণ যাই হোক, সাধারণ মানুষের ভোটবিমুখ গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। গণতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়ার বড় খুঁটি হচ্ছে ভোট। ক্ষমতা হস্তান্তর ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট অকার্যকর হয়ে পড়লে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিই দুর্বল হয়ে পড়বে। আমরা সেদিকেই যাচ্ছি। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে সাধারণ মানুষ যাতে মুখ ফিরিয়ে না নেন তা নিশ্চিত করা।    

গতকাল নির্বাচন কমিশন সচিব মো. আলমগীর সাংবাদিকদের তার দপ্তরে বলেছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম ভোট পড়েছে। এর কারণ গবেষণা করতে হবে। ভোটের কাস্টিংয়ের হার উত্তরে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ ও দক্ষিণে ২৯ দশমিক ০২ শতাংশ। গড়ে দুই সিটিতে ভোট পড়েছে ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। আমরা কাস্টিংয়ের এ হারে অসন্তুষ্ট না, তবে আরো ভোট পড়লে খুশি হতাম। ধারণা ছিল, ৫০ শতাংশের মতো ভোট পড়বে। যেহেতু সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়ার জন্য যত রকম কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত তা নির্বাচন কমিশন নিয়েছিল।

অপরদিকে, ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোটার হার কম হওয়ার জন্য বিএনপিকে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এর কারণ বিএনপির নির্বাচনবিরোধী চরিত্র। নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকে বিএনপির নেতৃবৃন্দ ও তাদের প্রার্থীরা ভোটারদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার হয়, এমন ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছেন।

অন্যদিকে, বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতারা দাবি করেছেন, ক্ষমতাসীনদের মহড়া ছিল ভোট কেন্দ্রগুলোতে। তাই সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে চাননি। যারা গেছেন তারাও নিজেদের পছন্দমতো ভোট দিতে পারেনি।

 গত শনিবার ভোট শেষ হওয়ার পরপরই উত্তর সিটির আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম বলেছেন, দেশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে। এর প্রমাণ ভোটার কম হওয়া। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটির আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাঁচ বছর আগে দুই সিটির ভোটে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল উত্তরে ৩৭ ও দক্ষিণে ৪৮ ভাগ।

দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির ‘বিরোধী প্রচারণা’সহ তিনটি কারণে ভোট কম পড়েছে বলে মনে করেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। দুই সিটিতে নির্বাচনের পরদিন রোববার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘টানা তিন দিন ছুটি থাকায় অনেকে গ্রামে চলে গেছে, ইভিএম নিয়ে বিএনপির বিরোধী প্রচারণায় মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে বলে ৮-১০ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে আসেনি এবং বিএনপি বলেছে এ নির্বাচনকে তারা আন্দোলন হিসেবে নিয়েছে। এসব কারণে ভোটে লোক কম এসেছে। তারপরও মোটামুটি ২৫ শতাংশ ভোট পড়েছে।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads