• রবিবার, ৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত

ফাইল ছবি

নির্বাচন

গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপির বর্জন, এরপর স্থানীয় সরকারের কয়েকটি নির্বাচনে দলটির অংশ না নেওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে ভোটের প্রতি মানুষের এক ধরনের অনাগ্রহ তৈরি হতে থাকে। দিন দিন তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে নানা অনিয়ম ও জবরদখলের অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগে নির্বাচনব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফল নির্ধারণে ভোটারদের গুরুত্ব নেই— এমন একটি ধারণা মানুষের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে। কখনো কখনো বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের কৌশলগত প্রচারণার কারণে ভোটারদের বড় অংশের মধ্যে ভোটবিমুখতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে গণতন্ত্রের র্চচা।

ভোটের প্রতি আগ্রহ দিন দিন কমে যাওয়ার নানা কারণ ব্যাখ্যা করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা শঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন গত বেশ কয়েক বছর ধরে। মানুষের আগ্রহ কমার পেছনে মূল কারণ হিসেবে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড, আচরণ ও দায়িত্বশীল সাংবিধানিক সংস্থার যথাযথ ভূমিকার অভাবকে বেশি দায়ী করে আসছিলেন। তবে রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যের ওপর দায় চাপানোর বক্তব্য দিয়ে আসছিল। সদ্য অনুষ্ঠিত ঢাকার জোড়া সিটির নির্বাচনে ভোটার অনুপস্থিতির পর বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিষয়টি স্বীকার করে বক্তব্য দেওয়া হলেও মূলত সরকারবিরোধী দল বিএনপিকে এজন্য বেশি দায়ী করা হয়।

তবে এবার সরকারি দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ভোটে মানুষের অনীহা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয় বলে মন্তব্য করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশে নির্বাচনব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ গন্তব্য কোথায়— এ প্রশ্ন উঠেছে। ভোটকেন্দ্রে বিরোধীপক্ষের দৃশ্যমান অনুপস্থিতি নির্বাচন-প্রক্রিয়ার সংস্কার ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে উঠছে কি না— এমন প্রশ্ন এক নির্বাচন কমিশনারেরও।

গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর  সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম মোট ভোটারের মাত্র ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশের সমর্থন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়রের চেয়ারে বসেছেন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মোট ভোটারের ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশের সমর্থন নিয়ে মেয়রের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস। ভোট পড়ার হার উত্তরে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং দক্ষিণে ২৯ শতাংশ। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এবার কমসংখ্যক ভোটারের সমর্থন নিয়ে মেয়রের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রার্থীকে। সর্বশেষ এই ভোটের হার নিয়ে শঙ্কা-সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো বলছে, ঢাকা সিটি নির্বাচনে এত কম ভোটারের উপস্থিতি আর কখনো দেখা যায়নি। ইসির তথ্য অনুসারে স্বাধীনতার পর প্রথম দুই দশকে জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতির হার ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে ছিল। নব্বই-পরবর্তী সময়ে সেই হার ৭৪ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৮৭ শতাংশ পর্যন্তও উঠেছিল। ভোট দেওয়ার ব্যাপারে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর উল্টো চিত্র দেখা যায় বাংলাদেশে। বেশিরভাগ মানুষ এদেশে ভোট দিতে যান। দেশের ইতিহাসে সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচন হচ্ছে উৎসবের মতো। অবশ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা এবারের নির্বাচনে কম ভোটারের উপস্থিতির জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের দায়ী করছেন।

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘দেশে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী-ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন এ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ভোটকেন্দ্রে বিরোধীপক্ষের দৃশ্যমান অনুপস্থিতি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই নির্বাচন-প্রক্রিয়ার সংস্কার ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।’

লিখিত বক্তব্যে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে গতকাল দুপুরে নিজ দপ্তরে মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচনব্যবস্থা ব্যর্থ হলে ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সব রাজনৈতিক দল আলোচনার টেবিলে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে। তা না হলে অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে পা বাড়াবে বাংলাদেশ।’

মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত যেভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তাতে আচরণবিধি রাখা না-রাখা সমান। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো যাচাইয়ের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। আচরণবিধি না-মানা এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়া ফ্রি-স্টাইল নির্বাচনের মূল উপাদান।’

তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনবিমুখতা গণতন্ত্রহীনতার নামান্তর। এই নির্বাচনে ভোটের প্রতি জনগণের অনীহা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, জাতি কি ক্রমান্বয়ে গণতন্ত্রহীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?’

তার মতে, ‘ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অস্বাভাবিক কম ভোট পড়া আমার কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। এটা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত হতে পারে; কিন্তু এটাই বাস্তব চিত্র। জনগণ নির্বাচন বা ভোটের প্রতি নিরাসক্ত হলে নানা ধরনের ব্যাখ্যা বা অপব্যাখ্যা দিয়ে এই বাস্তব অবস্থার চিত্রটি খণ্ডন করা যাবে না। গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রয়োজন—  কোনো কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তি এমন বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু গণতন্ত্র আপন মহিমায় বিকশিত ও উদ্ভাসিত হতে পারে, যদি অবাঞ্ছিত উপায়ে তাকে বন্দি করা না হয়।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ভোটের রাজনীতির প্রতি মানুষের অনীহা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহ আরো বেশি হওয়া উচিত। আওয়ামী লীগের এত জনসমর্থন, সেখানে আরো বেশি ভোট আশা করেছিলাম। আওয়ামী লীগের যে ভোটের হার, সে তুলনায় উপস্থিতি আশানুরূপ নয়।’

তিনি বলেন, ‘দুই-তিনদিন ছুটি থাকার কারণেও অনেকে চলে (ঢাকার বাইরে) গেছেন। পরিবহনসংকটও কিছুটা দায়ী। আগেভাগে শঙ্কা তৈরির কারণেও ভোটের প্রতি কিছু মানুষের আগ্রহ কমে থাকতে পারে। ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে, এই অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলো জনমত সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য সংগঠন শক্তিশালী করা দরকার। আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য অবিলম্বে কেন্দ্রীয় কমিটি বৈঠক করবে।’

ঢাকার সদ্য নির্বাচিত দুই মেয়রকে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মেয়র’ বলা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন ড. কামাল হোসেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘তাদের এটা (সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে মেয়র) মোটেই বলা যাবে না। সরকার, নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর বাংলাদেশের জনগণ ও যুবসমাজ অনাস্থা প্রকাশ করেছে। নির্বাচিত মেয়ররা শতকরা মাত্র ৫ থেকে ৭ ভাগ মানুষের রায় পেয়েছে। বাকি ফলাফল ইভিএমের জাল ভোট। বর্তমান সরকারের আমলে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। এই সরকার চায় ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে না যাক। তারা ভোটারদের ভয় পায়। জনগণ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার অর্থ তারা মনে করে তাদের ভোটে এই সরকারের পরিবর্তন হবে না। এটা দেশ ও জাতির জন্য একটা অশনিসংকেত।’

ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘সরকার দায়িত্বহীনভাবে সংবিধানের পরিপন্থী কাজ করে গোটা নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে ধবংস করে ফেলেছে। যার ফলে এই ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে। এভাবে দেশ চলতে পারে না। জনগণকে নিয়ে আমাদের পরিবর্তন আনতে হবে। এদেশের মানুষ সচেতন, তারা কখনো স্বৈরতন্ত্রকে গ্রহণ করেনি, এখনো করবে না।’

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের হার এক-তৃতীয়াংশের কম হওয়ায় নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিএনপির সাংসদ হারুনুর রশীদ। সেই সঙ্গে তিনি নির্বাচন কমিশনকে ‘অযোগ্য’ ও ‘অপদার্থ’ আখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার দাবি জানান। তার দাবি, ‘এই সরকারের আমল ছাড়া অতীতে কোনো নির্বাচনে ৫০ শতাংশের কম ভোট পড়েনি। সংবিধান প্রণয়নের সময় যদি ভাবা হতো ৩০ শতাংশের কম ভোট পড়বে, তাহলে হয়তো তখন সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া হতো যে অন্তত ৫০ ভাগ ভোটার উপস্থিতি ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads