• সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
মাছ নিয়ে মাৎস্যন্যায়ম

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

মাছ নিয়ে মাৎস্যন্যায়ম

  • ফাইজুস সালেহীন
  • প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারি ২০১৯

কুয়াকাটার মহিপুর আড়ত থেকে বড় সাইজের দুটো কোরাল মাছ কিনেছিলেন স্থানীয় নৌ পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক। বড় সাধ করে বাইশ হাজার টাকায় তিনি মাছ দুটো নিয়েছিলেন, ভাইঝির বিয়েতে পাঠাবেন বলে। কিন্তু সেই মাছ বাড়ি নিয়ে যেতে পারেননি। কেননা আড়তে বড় সাইজের দুটি কোরাল মাছ আসার খবর জেনে যান স্থানীয় পৌরসভার মেয়র সাহেব। তিনি থাকতে বাজারের সেরা মাছটি কিনে নিয়ে যাবে অন্য কেউ, এ কেমন করে হয়! তিনি ছুটে এলেন আড়তে এবং মাছ দুটো নিয়ে গেলেন। আড়তদার এই মাছ আগেই বিক্রি হয়ে গেছে বললেও মেয়র সাহেব পাত্তা দেননি। প্রথম ক্রেতা পুলিশকে এই বিপত্তির সংবাদ জানালে তিনি মেয়র মহোদয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বললেন। ভাতিজির বিয়ের কথাও বললেন। কিন্তু তাতে মানবেন কেন মেয়র মহোদয়! মেয়র বলে কথা! উলটো তিনি পুলিশ কর্মকর্তাকে বললেন, ‘এই মাছ প্রধানমন্ত্রীর দফতরে যাবে। আমি কুয়াকাটার মেয়র, এত বড় মাছ পাই না। আর তোমরা পুলিশ হইয়া এত বড় মাছ এইখান থেকে নিয়া যাবা!’

একেবারে চুপচাপ মেনে নেওয়ার পাত্র নন পুলিশের উপ-পরিদর্শক। তিনি ব্যাপারটি জানান স্থানীয় থানার কর্মকর্তা এবং নৌ পুলিশ সুপারকে। এই খবর ছাপা হয়েছে গত রোববার দৈনিক ইত্তেফাকের ১৯ পৃষ্ঠায়। কোরাল মাছ দুটি সত্যিই প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হয়েছে কি-না, তা জানা যায়নি। এই কোরাল কাণ্ড সম্পর্কে মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মন্তব্য : ‘বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। সামান্য মাছ নিয়ে, তাও আবার পুলিশের ক্রয় করা! সেই মাছও যদি রক্ষা না পায়!’— পুলিশ কর্মকর্তার কণ্ঠে আক্ষেপের সুর অপ্রকাশিত নয়।

ঘটনাটি সামান্য মাছ নিয়ে। কিন্তু যা ঘটল তা সামান্য নয়। এর  দার্শনিক মূল্যও রয়েছে। মাৎস্যন্যায়ের এ এক ছোট উদাহরণ। ছোট হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্কৃত ‘মাৎস্যন্যায়ম’  শব্দটি এসেছে চাণক্যের অর্থশাস্ত্র থেকে। সেই অর্থে এটা চাণক্যনীতির অন্তর্ভুক্ত। চাণক্যনীতি সম্পর্কে জনসমাজে যে ধারণাটি চালু রয়েছে, সেটি মোটেও ইতিবাচক নয়। কুটিলতা ও ভণ্ডামির প্রতিভূ হিসেবেই সাধারণত চাণক্যের মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। এই উপমহাদেশের তিনিই সম্ভবত প্রথম রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং অর্থনীতিবিদ। এখন থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ৩৭০ থেকে ২৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মানুষ তিনি। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের শিক্ষক এবং উপদেষ্টা। চন্দ্রগুপ্তের পুত্র রাজা বিন্দুসারের পারিষদেও তিনি ছিলেন। রাজকার্য সুচারুরূপে পরিচালনার জন্যে যেসব দিকনির্দেশনা তিনি দেন, সেগুলোই চাণক্যনীতি হিসেবে পরিচিত। তার অর্থশাস্ত্রে সেই নীতিসমূহের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রয়েছে। ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণ এবং সমৃদ্ধির পথও তিনি বাতলে দিয়েছেন তার অর্থশাস্ত্রে। কেন, কখন তিনি কোন কথাটি বলেছেন, তার কার্যকারণ না জেনে যখন তার কোটেশনটি সামনে নিয়ে আসা হয়, তখন তাকে কুটিল বলেই মনে হয়। সেই জন্যেই তাকে অনেকে ভারতবর্ষের মেকিয়াভ্যালি হিসেবে শনাক্ত করে থাকেন।

রাজার দরবারে কোনো প্রবেশাধিকার না পেয়ে মেকিয়াভ্যালি রাজাকে খুশি করার জন্যে রচনা করেন দ্য প্রিন্স। দ্য প্রিন্স গ্রন্থে মেকিয়াভ্যালি রাজাকে পরামর্শ দেন সিংহের মতো হিংস্র ও শৃগালের মতো ধূর্ত হওয়ার। রাজার জন্যে এটাই সঠিক নীতি বলে তিনি মনে করতেন। মেকিয়াভ্যালির এই বই রাজার হাতে পৌঁছালে রাজা সত্যিই খুব খুশি হয়েছিলেন এবং এই চিন্তানায়ককে ডেকে নিয়েছিলেন। চাণক্যও অনুরূপ ধূর্ততার শিক্ষা দেন বলে মনে করা হয়ে থাকে। আর সেই বোধ থেকেই চাণক্যের আরেক নাম কৌটিল্য। কৌটিল্যের অর্থ কুটিলতাপূর্ণ। অবশ্য কৌটিল্যের সঙ্গে কূটনীতিরও সম্পর্ক রয়েছে। ডিপ্লোমেসিতে চালাকির প্রয়োজন যে রয়েছে, সে কথা ডিপ্লোম্যাটরা অস্বীকার করেন না। তবে চাণক্য বা কৌটিল্য সম্পর্কে সাধারণ্যে প্রচলিত ধারণা যে খণ্ডিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা চাণক্যের নীতিসমূহ কার্যকারণ বিরহিত নয়। কারণ ও ব্যাখ্যা রয়েছে।

মাৎস্যন্যায়ম সম্পর্কে চাণক্য বলেন, দেশে বা সমাজে যখন অরাজকতা দেখা দেয়, আইনের শাসন যখন অকার্যকর হয়ে যায়, তখন মাৎস্যন্যায়মই ন্যায় বলে প্রতীয়মান হয়। মাৎস্যন্যায়ম মানে মাছের নীতি। মাছের রাজ্যের নীতি হলো বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খাবে। এ জন্যে বড় মাছকে কারো কাছে কৈফিয়ত দিতে হয় না। বড় প্রজাতির সব মাছই কমবেশি ছোট মাছ খেয়ে থাকে। রাঘব বোয়ালের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় অতি নিবিড়। এমন কোনো বোয়াল নেই যেটি ছোট মাছ এবং জলে বাস করা ছোট প্রাণীদের খেয়ে না ফেলে। রুই, মৃগেল ও কাতলা মাছ তো আরো ভয়ঙ্কর-নিষ্ঠুর রাক্ষস। এই মাছেরা নিজের ডিম নিজেরাই খেয়ে ফেলে। এ জন্যেই পরিহাস করে বলা হয়, মাছের মায়ের পুত্রশোক! এই বাগধারার আরো একটি ব্যাখ্যাও অবশ্য আছে। সে না হয় বলা যাবে বারান্তরে। বদ্ধপানিতে ডিমখেকো মাছের পোনা জন্মাতে পারে না। প্রবহমান জলে ডিম ছাড়ার পর তা স্রোতের টানে ভেসে যায়। ফলে মাছটি আর নিজের ডিম নিজেই গ্রাস করতে পারে না। দূরে ভেসে গিয়ে ডিম থেকে পোনা জন্মায়। এ হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম। মাৎস্যপ্রকৃতির বিরূপতা প্রকৃতিই আবার রুখে দেয় এইভাবে। চাণক্য মাছের নীতিটাকে বলেছেন মাৎস্যন্যায়ম। তিনি একথা বলেননি যে, মাৎস্যন্যায়ম অনুসরণ করা মানুষের কর্তব্য। বরং তিনি একথাই বলেছেন যে, মানুষের সমাজে, রাজনীতিতে  যাতে মাৎস্যন্যায়মের উদ্ভব না ঘটে তার জন্যে আইনের শাসন জারি রাখা কর্তব্য। কিন্তু যারা জটিল ও কুটিল এবং দুষ্ট স্বভাবের, তারা চেতনে এবং অবচেতনে মাৎস্যন্যায়ম অনুসরণ করে থাকেন। তারা পরস্বহরণ করেন অবলীলায়। সবল দুর্বলের ওপর অত্যাচার করবে, তার সম্পদ ও অধিকার কেড়ে নেবে— এটাকেই তারা নীতি বলে মান্য করেন। চালাকি চাতুর্যের আশ্রয় গ্রহণ করেন। ক্ষমতার দাপট দেখান। যে প্রতিবাদ করতে পারে না, তার ভোট কেড়ে নেওয়া, সেও কিন্তু মাৎস্যন্যায়মেরই শামিল। সভ্যতার ইতিহাসে নানান দেশে, দুনিয়ার নানা প্রান্তে এই মাৎস্যন্যায় কতবার কতভাবে যে ফিরে ফিরে এসেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। পলাশীর আম্রকাননে সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পর এই বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কী ভয়াবহ মাৎস্যন্যায়মের চর্চা করেছে, তা কমবেশি সবারই জানা। বাংলা সাহিত্যে তার বিবরণ এসেছে নানাভাবে— গানে, কবিতায় এবং উপন্যাসে। কেবল এই বাংলায় নয়, বস্তুত গোটা উপমহাদেশে চলেছে মাৎস্যন্যায়। প্রবল-প্রতাপশালী বেনিয়া ইংরেজ একের পর এক গ্রাস করেছে ছোট ছোট দেশীয় রাজ্যগুলো। রাজ্য গ্রাস করার পর এরা এদেশে চালু করেছিলে সবলের দুর্বলকে গ্রাস করার নীতি। অন্যায়ের যূপকাষ্ঠে কত পরিবার যে নিঃস্ব হয়ে গেছে, কত জীবন গেছে, অত্যাচারের লোনাসমুদ্রে হাবুডুবু খেয়েছে এদেশের কত প্রান্তিক মানুষ- তার লেখাজোখা নেই।

সময়-সময়ান্তরে মাৎস্যন্যায়মের সাক্ষাৎ পাওয়া গেলেও বাংলার ইতিহাসে মাৎস্যন্যায় বলে একটি বিশেষ কালপর্ব চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর এই বাংলায় দেখা দেয় চরম বিশৃঙ্খলা। নির্বাসিত হয়ে গিয়েছিল ন্যায়ধর্ম। বড় ও শক্তিমানরা রাজ্যের পর রাজ্য দখল করে নিয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে বহু উপাসনালয়। ছোট রাজ্যগুলোর কোনো নিরাপত্তা ছিল না। প্রতাপশালী রাজা দখল করে নিয়েছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও ছোট রাজ্য। কেড়ে নিয়েছে সাধারণের সুখ-শান্তি। ভেঙে পড়েছিল আইনের শাসন-বারণ। সেই সময়টাকে ইতিহাস শনাক্ত করে বাংলার মাৎস্যন্যায়মের কাল হিসেবে। পালবংশের অভ্যুদয়ের পূর্বপর্যন্ত এই মাৎস্যন্যায় অব্যাহত ছিল। পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল আইনের শাসন নিশ্চিত করে মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটান।

মাৎস্যন্যায় বলে বিশেষভাবে চিহ্নিত সময় বহু শতাব্দীকাল আগের কথা হলেও বাস্তবে এখনো বিচ্ছিন-বিক্ষিপ্তভাবে মাৎস্যন্যায়ম জেগে রয়েছে অনেকের মনের প্রাসাদে। এটা আছে দেশে-সমাজে এবং বিশ্ববলয়ে। রাজনীতিতেও আছে। বিশ্বের শক্তিমান দেশগুলো ছোট দেশগুলোর সম্পদ গ্রাস করতে উদগ্রীব। তাদের তঞ্চকতার শেষ নেই। কখনো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধ, কখনো বা অবরোধ। সামাজিক জীবনেও দেখা যাচ্ছে প্রবল দুর্বলের ওপর অত্যাচার করতে বাধাহীন। পরের সম্পদ ও অধিকার কেড়ে নিতে বাধে না অনেকেরই। জমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে। যারা প্রবল তারা রাষ্ট্রের তথা জনগণের সম্পদ গ্রাস করতেও কুণ্ঠিত নয়। বাজার থেকে পছন্দ করে একটি বা দুটি মাছ কেনার অধিকার কেড়ে নেওয়ার ঘটনাটিকে মাৎস্যন্যায়ম ছাড়া আর কীইবা বলা যায়।

 

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক
saleheenfa@gmail.com         

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads