• শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
এনটিআরসিএ’র সুপারিশ করা শিক্ষকদের উদ্দেশে কিছু কথা

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

এনটিআরসিএ’র সুপারিশ করা শিক্ষকদের উদ্দেশে কিছু কথা

  • সোলায়মান মোহাম্মদ
  • প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারি ২০১৯

শত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অতিসম্প্রতি এনটিআরসিএ থেকে সুপারিশ করা ৪০ হাজার শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ৭ লাখ নিবন্ধনধারীর কাছ থেকে মোট ৩১ লাখ আবেদনের প্রেক্ষিতে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়। পানি ঘোলা করে হলেও অবশেষে যে এনটিআরসিএ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পেরেছে, সেজন্য অবশ্য এনটিআরসিএ ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। যদিও এ তালিকা প্রকাশ নিয়ে অনেকে অভিযোগ করেছেন। কাজ করলে ভুল হতে পারে এটা স্বাভাবিক হিসাব। তবে আগামী দিনগুলোতে ভুলগুলো শুধরে নিয়ে সম্পূর্ণ আধুনিক নিয়মে অর্থাৎ একজনের শুধু একটি আবেদনের প্রেক্ষিতেই সুপারিশ করা তালিকা প্রকাশ করবে এমনটাই এখন নিবন্ধনধারীরা আশা করছেন। যেহেতু চলতি মাসে আরো ৬০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে এনটিআরসিএ।

শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। টাকা বা অন্য কোনো পেশার সঙ্গে এর তুলনা হয় না। হতাশায় নিমজ্জিত অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া যুবসমাজকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে এই শিক্ষার অগ্রভূমিকায় রয়েছেন শিক্ষক। বলা যায় জাতির মেরুদণ্ড সোজা বা বাঁকা করার মূল কেরামতি শিক্ষকদের হাতেই রয়েছে।

একটা সময় ছিল যখন শিক্ষক যে রাস্তা ধরে সাইকেল চালিয়ে আসতেন, সে রাস্তায় শিক্ষার্থীরা ভুলেও যেতেন না। অভিভাবক পর্যন্ত দাঁড়িয়ে শিক্ষকদের সম্মান জানাতেন। এলাকার নানা সমস্যা শিক্ষকরাই সমাধান করতেন। সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানের জায়গায় একজন শিক্ষককে রাখা হতো।

সুতরাং এমন একটি মহান পেশায় যারা নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন বা নতুন করে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের মন-মানসিকতা বা আচার-আচরণ কেমন হওয়া উচিত? নতুন যে ৪০ হাজার শিক্ষক এ মহান পেশায় নিয়োগ পেলেন, তাদের প্রায় সবাই ইয়ং। শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা যে একেবারে নেই এমনটা নয়। অধিকাংশই আগে হয়তো কোনো না কোনো স্কুল-কলেজে অতিথি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। তবে অতিথি শিক্ষকদের তাদের শিক্ষার্থীদের ফলাফল যে কোনো মূল্যে ভালো করার একটি প্রবণতা থাকে। যে কারণে শিক্ষার্থীদের মৌলিক লেখাপড়ার দিকে না এগুতে দিয়ে শুধু কীভাবে শর্টকাটে ভালো রেজাল্ট করা যায়, সেই প্রক্রিয়া প্রয়োগের চিন্তায় ডুবে থাকে। এজন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিশেষ করে ইংরেজি, বাংলা, অংক, বিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিষয়ের শিক্ষকদের অধিক পারদর্শী করে গড়ে তুলতে হবে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বুঝতে হবে তাদের কাজ শুধু শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ পেতে দিন-রাত খেটে যাওয়া নয়, এর বাইরেও রয়েছে মূল কাজ। তাদের স্কুলে বা কলেজে নিয়োগ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজেদের মনের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ের মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। প্রথমে তাদের ভাবতে হবে জাতি গড়ার এক বিশাল দায়িত্বভার তাদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে— যা জীবনের সর্বোচ্চটুকু দিয়েই পালন করতে হবে। প্রতিনিয়তই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ভাবনা তৈরি করে দিতে হবে। ক্লাসের পড়া ক্লাসেই শেষ করতে হবে। হোমওয়ার্ক দিলে পরের দিন অবশ্যই তা গুরুত্ব দিয়ে আদায় করতে হবে। মুখস্থবিদ্যা এবং গাইড থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে হবে। প্রতি ক্লাসেই নৈতিকতার ওপর কথা বলতে হবে। একজন আদর্শবান শিক্ষক হতে হলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তবে এখানে অনেকটা জটিলতাও রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে সীমানা অতিক্রম করে ফেলেন। দু-চারটা ঘটনা এমনও জেনেছি শিক্ষক আর শিক্ষার্থী একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসে কার্ড খেলছে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে; অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অনৈতিকতার পাঠও শেখানো হচ্ছে। একজন শিক্ষককে অবশ্যই বাবার ভূমিকায় থেকে তার শিক্ষার্থীর সঙ্গে মিশতে হবে। একজন বাবা চাইলে তার সন্তানের বন্ধুও হতে পারেন। এক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়কে উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। খুব আক্ষেপের সুরেই বলতে হয়, বর্তমানে পত্রপত্রিকায় প্রায় সময়ই অনেক শিক্ষকের নীতিবিবর্জিত কার্যকলাপের সংবাদ প্রকাশ হয় যা সমগ্র শিক্ষক জাতিকেই লজ্জায় ফেলে দেয়। এসব ব্যক্তির কাছ থেকে শিক্ষকতা পেশাকে রক্ষা করতে হবে। সঠিক প্রমাণসহ তাদের চিরতরে শিক্ষকতা পেশা থেকে ছাঁটাই করাই শ্রেয় বলে মনে করি।

সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে শিক্ষকদের বিষয়ে আরো উদার হতে হবে। যথাসময়ে তাদের বেতনাদির ছাড়পত্র দিতে হবে। কেবল উপযুক্ত সুযোগ রেখেই শিক্ষকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। কাঠামোগত বেশকিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। বিগত দশ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থার কী হাল হয়েছে তা কারো অজানা নয়। পরীক্ষায় অনৈতিকতার আশ্রয়, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সবচেয়ে ভয়ানক যে বিষয়টি তা হলো শতভাগ পাস করানোর যে প্রবণতা। শতভাগ পাস আর জিপিএ-৫ পাওয়ানোর যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তাতে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া না করলেও চলে। সৃজনশীল পদ্ধতির নামে যে এমসিকিউ পদ্ধতি করা হয়েছে তাতে শিক্ষার্থীদের মূল বিষয় না পড়ে শুধু ভাসা ভাসা জ্ঞান থাকলেও চলে। এমসিকিউ নিয়ে এমনও হাস্যকর ঘটনা হয়েছে যে শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তোমার বাবার নাম কী? উত্তরে শিক্ষার্থী বলেছে- চারটি বলুন, আমি একটি বলে দিচ্ছি। কাজেই নিয়মে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ইতোমধ্যে আশার আলো জাগিয়েছেন। আসছে এসএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে কোচিং সেন্টার বন্ধ ও বিশেষ পদ্ধতিতে প্রশ্ন সরবরাহ কিছুটা আলোর পথ দেখিয়েছে। অতিসম্প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুদকের অভিযান বেশ প্রশংসা অর্জন করেছে, এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে।

সর্বোপরি নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন শিক্ষকরা দেশগড়ার মহান উদ্দেশ্যে নিজেদের নিয়োজিত করুক। মহান আদর্শে নিজেদের তৈরি করুক এবং সে অনুযায়ী আমাদের সন্তানদেরও ন্যায়পরায়ণ মানুষ হওয়ার শিক্ষায় শিক্ষিত হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করুক- সেই প্রত্যাশায় শুভ কামনা থাকল।

 

লেখক : সাংবাদিক

sulaymansir87@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads