• শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
প্রধানমন্ত্রীর চা-চক্র বনাম বিএনপির ভাগ্যচক্র

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

প্রধানমন্ত্রীর চা-চক্র বনাম বিএনপির ভাগ্যচক্র

  • মহিউদ্দিন খান মোহন
  • প্রকাশিত ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

এ লেখাটি যেদিন প্রকাশিত হবে, সে দিনটি ধার্য করা আছে প্রধানমন্ত্রীর চা-চক্রের জন্য, যেটিতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, এ চা-চক্র প্রহসনের সরকারকে গ্রহণযোগ্য করতেই আয়োজন করা হয়েছে। তারা বলেছেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই সে নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়েছেন, তাদের বৈধতা দেওয়ার জন্য গণভবনে চা-চক্রে অংশ নেওয়া ঠিক হবে না। এমনটা করলে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে’ (দেশ রূপান্তর, ২৮ জানুয়ারি ২০১৯)। তারা দাবি করেছিলেন— ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচনের বিষয়ে সংলাপ। কিন্তু সরকারপক্ষ তাতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। বরং সরকারি দলের নেতারা বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নিয়ে সংসদে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। তারা বলছেন, বিএনপি যদি শপথ না নেয়, তাহলে মারাত্মক ভুল করবে। এমনকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও বিএনপিকে সংসদে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারি দলের এসব পরামর্শকে বিএনপি দেখছে ভিন্ন চোখে। তার বলছে— নির্বাচনে ব্যাপক ‘ভোট ডাকাতি’র পর সরকার বিএনপিকে সংসদে নিয়ে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্যতা দিতে চাচ্ছে। বিএনপি মহাসচিব পরিষ্কার করেই বলেছেন— তারা নির্বাচনী ফলাফল মানেন না। তাই এ মুহূর্তে সংসদে যাওয়ার বা শপথ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। গত ২৫ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের পর সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায়ও তিনি একই মন্তব্য করেছেন। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার যে আহ্বান জানিয়েছেন, বিএনপির তাতে সাড়া না দেওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর এ চা-চক্রের বিষয়টি বেশ আলোচিত হচ্ছে গণমাধ্যমগুলোতে। টিভি টক শো’র আলোচনায় বিশিষ্টজনরা এ উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। তারা বলছেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্কের উন্নতিতে এ চা-চক্র অবদান রাখতে পারে। তাদের মতে, আলোচনার টেবিলেই বেরিয়ে আসতে পারে সমস্যার সমাধান। কিন্তু সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি বলছে, এ ধরনের আমন্ত্রণে গিয়ে কোনো লাভ নেই। কেননা এ বিষয়ে তাদের রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। বোঝা যাচ্ছে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্য গড়ার আহ্বান এবং চায়ের আমন্ত্রণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অবশ্য রাজনৈতিক সচেতন মহলে এ প্রশ্নও উঠেছে যে, নির্বাচনোত্তর এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর চায়ের নিমন্ত্রণ ও ঐক্যের আহ্বান কতটা যৌক্তিক। কেননা একমাত্র ক্ষমতাসীন দল ও তাদের জোটসঙ্গীরা ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোনো দল নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি। তারা পুনর্নির্বাচনও দাবি করেছে। ফলে বিদ্যমান অনৈক্যের এ পরিবেশে জাতীয় ঐক্য গড়া কতটা সম্ভব তা নিয়ে সংশয় জাগতেই পারে। তাছাড়া কী কারণে প্রধানমন্ত্রী এ মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন অনুভব করলেন-সে প্রশ্নও উঠেছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে যেসব ইস্যুতে ঐক্যের কথা বলেছেন, এ বিষয়ে রাজনৈতিক সচেতন মহলের বক্তব্য হলো— প্রধানমন্ত্রীর উত্থাপিত ইস্যুগুলোতে দলমত নির্বিশেষে সবাই একমত পোষণ করে। কারণ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়ন-অগ্রগতির প্রশ্নে কারো কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। তাই ওই ইস্যুগুলোতে নতুন করে ঐক্য গড়ার কিছু নেই।

সর্বত্র যখন প্রধানমন্ত্রীর চা-চক্র নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন কেউ কেউ বিএনপির ভাগ্যচক্র নিয়ে কথা বলছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির যে করুণ হাল হয়েছে, তাতে মনে হয় দুর্ভাগ্যই যেন ঘিরে ধরেছে দলটিকে। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বিএনপি তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আবার আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। গত ২২ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে সমকাল লিখেছে-নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আবারো আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে দলটি। একদিকে আইনি লড়াই, অন্যদিকে রাজপথের কর্মসূচি দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। এর বাইরে নির্বাচনের ফলাফল বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে হতাশাগ্রস্ত নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার জন্যও নতুন কর্মসূচিতে যেতে চাইছেন তারা। কিন্তু এরই মধ্যে উদ্ভব হয়েছে নতুন সমস্যার। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুই সদস্য এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানামুখী আলোচনা। বলা হচ্ছে, বিএনপির বিরোধিতা সত্ত্বেও গণফোরামের নির্বাচিত দুই সদস্য শেষ পর্যন্ত শপথ নিতে পারেন। যদি তা-ই ঘটে, তাহলে বিএনপি বড় রকমের একটি ধাক্কা খাবে। কেননা সংসদ নির্বাচন ও শপথ প্রশ্নে তা হবে তাদের সিদ্ধান্তের ঠিক উল্টো। যদিও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এখনো এতে সম্মতি দেননি। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে এমন আভাসও দেওয়া হয়েছে, গণফোরাম থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহাম্মেদ এমপি হিসেবে শপথ নিয়ে তার পুরনো ঠিকানা আওয়ামী লীগে ফিরে যেতে পারেন। এমনকি আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেলকে জয়ী করতে তাকে বিশেষ দায়িত্বও দেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে তিনি সম্প্রতি একটি পত্রিকাকে বলেছেন, ‘আমি তো ছাত্রলীগের প্যানেল থেকেই ভিপি নির্বাচিত হয়েছি। নেত্রী (শেখ হাসিনা) আমাকে নেতা বানিয়েছেন। ছাত্রলীগের প্যানেলকে নির্বাচিত করার কোনো দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব এলে তা অবশ্যই গ্রহণ করব।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার নেত্রী। আমার শেষ ঠিকানা বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা। এখানে কোনো আপস নেই।’ আর শপথ নেওয়া সম্পর্কে সুলতান বলেছেন, ‘শপথের বিষয়ে আমি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করি। কারণ আমি আমার নির্বাচনী আসনের ভোটারদের অসম্মান করতে পারি না’ (দেশ রূপান্তর, ২৮ জানুয়ারি ২০১৯)।

সুলতান মনসুর শেষ পর্যন্ত কী করবেন তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে তিনি এবং মোকাব্বির হোসেন যদি শপথ নিয়ে সংসদে যান, তাহলে সেটা হবে বিএনপির জন্য বড় রকমের ক্ষতি। কেননা এ দুজনের জিতে আসার পেছনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বিএনপির প্রতীক ও ভোট ব্যাংক। যদিও মোকাব্বির লড়েছেন গণফোরামের প্রতীক নিয়ে। তবে ওই আসনে বিএনপির ভোটই ছিল তার বিজয়ের মূল শক্তি।

এদিকে নির্বাচনের পরে বিএনপি নেতাকর্মীদের আরো হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ার খবরও আসছে। দশ বছর ধরে সরকারের জুলুম নির্যাতনের শিকার বিএনপি নেতাকর্মীরা ভেবেছিল নির্বাচনে দল জয়লাভ করলে তাদের কষ্টের দিন শেষ হবে। কিন্তু সেটা হয়নি; বরং এখনো মামলা গ্রেফতার অব্যাহত আছে। মামলা-হামলা ও গ্রেফতার আতঙ্কে দিশাহারা তারা। তাদের একটি অংশ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাকিরাও আগের মতো সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন না। নির্বাচন-পরবর্তী দলীয় কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে। এমন স্থবিরতা কাটাতে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপও নিতে পারেনি দলটি। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের হতাশা কতটা ঘিরে ধরেছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের খবর-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে। ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলা বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন আনু পত্রিকাটিকে বলেছেন, ‘নেতারা নিজেরাই দৌড়ের ওপর আছেন।... এমপি (প্রার্থী) সাব থাকেন ঢাকায়। তার মোবাইল ফোন বন্ধ। পরিবার ছাড়া কারো খবর রাখেন না তিনি। পুলিশে খোঁজে, প্রতিপক্ষ ধাওয়া করে, আদালতেও হাজিরা থাকে। মাথার ওপর কেউ না থাকলে যা হয় তা-ই হচ্ছে। এক-দুই বছর হলে তো সহ্য হয়, একে একে ১২ বছর। মনে হচ্ছে হাশরের ময়দানে আছি।’ আনুর বর্ণনামতো ‘হাশরের ময়দান’ই যেন। রোজ হাশরে শেষ বিচারের দিন কেউ কারো দিকে তাকাবে না, সবাই শুধু ‘ইয়া নফসি’ ‘ইয়া নফসি’ জপতে থাকবে।

দুর্দশাগ্রস্ত বিএনপি সম্পর্কে প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকায় প্রতিবেদন বেরুচ্ছে। সেই সঙ্গে দলটির বর্তমান দুরবস্থা এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে বিশিষ্টজনদের অভিমতও প্রকাশিত হচ্ছে। গত ২৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ প্রতিদিন ‘কোন দিকে যাবে গতিহারা বিএনপি’ শিরোনামে যে বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, তাতে ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘বিএনপির ঘাপটি মেরে বসে থাকলে চলবে না। দ্রুত কাউন্সিলের মাধ্যমে দলে নতুন নেতৃত্ব আনতে হবে। যখনই দলের নতুন কমিটি হবে, তখন নেতাকর্মীরা মিটিং মিছিল শুরু করবেন। তিনি কাউন্সিলে গঠনতন্ত্রে সংশোধনী এনে বর্তমানে দলের চেয়ারপারসনকে দেওয়া ক্ষমতার কিছুটা হ্রাস করার কথাও বলেছেন। তিনি দলের নেতৃত্ব থেকে তারেক রহমানের দুই বছরের জন্য সরে যাওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন। আর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ‘ইমিরেটাস চেয়ারম্যান’ করে তার কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন। কিন্তু তিনি কাউকে বহিষ্কার করতে পারবেন না, নিতেও পারবেন না। ডা. জাফরুল্লাহর এ পরামর্শ বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেননা বিএনপিতে এখনো খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান অবিকল্প নেতা। এ মুহূর্তে তাদের দুজনকে কার্যত মাইনাস করার ফর্মুলা যে কেউই গ্রহণ করবে না তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাছাড়া বিএনপি নেতারা সহসাই দলের কাউন্সিল করার কথাও ভাবছেন না।

তবে এটা ঠিক যে, বারো বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির এখন সংগঠন জোরদার করার চেষ্টায় রত হওয়া জরুরি। একটি রাজনৈতিক দলের দশ-বিশ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। নানা কারণে তা ঘটতে পারে। আওয়ামী লীগ একুশ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল না। কিন্তু তারা তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ক্রমাগত দলকে সংগঠিত করেছে। বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন যেভাবে হতাশার সাগরে নিমজ্জিত, তা যদি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারে, তাহলে দলটি আরো বেশি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং একসময় তা অস্তিত্ব সঙ্কটে নিপতিত হতে পারে।

বিএনপির ভাগ্যচক্র বোধকরি ভালোর দিকে ঘুরছে না। একটার পর একটা সঙ্কট ঘিরে ধরছে বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট এ রাজনৈতিক দলটিকে। ভাগ্যের সে চাকা ঘোরাতে হলে যে পথে তাদের যেতে হবে, সহসাই তার সন্ধান তারা পাবেন কি-না কে জানে।

 

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads