• সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬
ads

সম্পাদকীয়

নদীদখল ও নদীশাসন

নিঃশেষিতপ্রায় নদী বাঁচিয়ে রাখুন

  • প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বাংলাদেশের নদীপ্রবাহ ও নদী-সংস্কৃতি আজ বিলীয়মান, নিঃশেষিতপ্রায়। আমাদের ছিল তেরো শতাধিক নদী ও নদ। এখন কোনোমতে বেঁচে আছে মাত্র সাতশ নদী। ছোট-বড় সব নদীরই এখন মরণদশা। যখনই বিষয়টি সামনে আসে, তখনই আমাদের মনে পড়ে উজানের বাঁধের কথা। এ কথা ঠিক যে, উজানে ফারাক্কাসহ আরো অনেক বাঁধ দেওয়ার ফলে ভাটির বাংলাদেশের নদীমালায় নাব্য হ্রাস পেয়েছে নিদারুণভাবে। তবে এটি বড় কারণ হলেও একমাত্র নয়। উন্নয়ন পরিকল্পনার অযথার্থতা, একশ্রেণির মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা এক্ষেত্রে কাজ করে চলেছে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো। তারই নিদর্শন আমরা দেখতে পাই পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সন্ধ্যা নদী দখলের মহোৎসবে।

দৈনিক বাংলাদেশের খবরে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, নদীর সঙ্গে সঙ্গে ভূমিদস্যুরাও গিলে খাচ্ছে স্থানীয়দের বসতভিটা। বছর বছর ধরে উপজেলার জগৎপট্টি, ইন্দেরহাট, মিয়ারহাট, বরচাকাঠি, জগন্নাথকাঠি বন্দরসহ বেশকিছু এলাকায় চলছে সন্ধ্যা নদীর দখল-বাণিজ্য। এখানে গড়ে উঠছে ডকইয়ার্ড, বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য দোকানপাট। এর প্রতিবাদ করলে দখল হয়ে যাচ্ছে প্রতিবাদকারীর বসতভিটাও। অথচ নির্বিঘ্ন প্রশাসন। ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য ছাড়া এ কাজ কখনোই সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক হিসাবে বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, সুরমা, কীর্তনখোলা, রূপসার ভূমি আগ্রাসনে পড়েছে শহরতীরবর্তী প্রায় ৭০টি নদী। কেবল নদী নয়, শহরের ভেতর বা পাশের খালগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। নদীর ওপর আগ্রাসনের কারণে আগামী দিনগুলোতে পরিবেশসহ সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটবে। ফলে বহু আগে থেকেই সামান্য বৃষ্টি ও বর্ষণে জলাবদ্ধতা, পানি-বর্জ্য নিষ্কাশনে সমস্যার সৃষ্টি হতে আমরা দেখছি। সেই সঙ্গে শহর-বন্দরে মারাত্মক নদীভাঙনও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ ছাড়া নৌচলাচল পথ সংকুচিত হয়ে আসছে নদীমাতৃক বাংলাদেশের। ফলে অদূর ভবিষ্যতে শহর বা বন্দর গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যক্রম। মূলত দ্রুত নগরায়ণ নদীদখলের অন্যতম কারণ।

কাগুজে হিসেবে আমাদের নদীপথের দৈর্ঘ্য ২৪ হাজার কিলোমিটার। তবে এই দীর্ঘ নৌপথে নৌযান চলতে পারে কত কিলোমিটার পর্যন্ত, সেটাই প্রশ্ন। নদীবিধৌত বাংলাদেশ; এ ছিল এদেশের গৌরব করার মতো বিষয়। সেই গৌরব আজ হারানো স্মৃতির মতো বেঁচে আছে গানে, কবিতায়, কথা ও কাহিনিতে। বাংলাদেশে এখনো ক্ষীণধারায় হলেও প্রবহমাণ বিশ্বের অন্যতম প্রধান দীর্ঘ নদ ব্রহ্মপুত্র। সারা বিশ্বে দৈর্ঘ্যের বিচারে এই নদের স্থান ২২তম। উল্লেখ্য, ব্রহ্মপুত্রের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৮৫০ কিলোমিটার। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা বাংলাদেশের বৃহত্তম নদীপ্রণালিও বটে। বলে নেওয়া ভালো যে, আমাদের চারটি নদীপ্রণালি থেকে ছোট-বড় শত শত শাখা নদী বেরিয়ে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে দেশজুড়ে। আরো আছে উপনদী। এই শাখা ও উপনদীগুলো মূল স্রোত বাঁচিয়ে রাখতে পালন করে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা।

বাস্তবিকপক্ষেই এমন অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা আমরা বাস্তবায়ন করেছি, যা মোটেও নদীবান্ধব নয়। নদীখননের মহাপরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সুতরাং সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা নদীবিধৌত বাংলাদেশের জীবনপ্রবাহ ধরে রাখতে বেআইনিভাবে নদীদখল ও নদীশাসন বন্ধ করা জরুরি। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অসাধু ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদান করবে বলে আশা রাখি। পাশাপাশি ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছি। বিষয়টির প্রতি আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads