• মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
ধর্ষণ সামাজিক ব্যাধি

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

ধর্ষণ সামাজিক ব্যাধি

  • মাসুদ কামাল হিন্দোল
  • প্রকাশিত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

পত্রিকার পাতা উল্টালে প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়ছে হূদয়বিদারক সব ধর্ষণ সংবাদ। কোনোটা শহরে, কোনোটা বন্দরে, কোনোটা গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, আবার কোনোটা লোকালয়ে আকাশচুম্বী অট্টালিকায়। অবোধ শিশু, নাবালিকা, সাবালিকা, কিশোরী, তরুণী, গৃহবধূ, গৃহপরিচারিকা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, উপজাতি, বিদেশিনী, বোবা কিংবা প্রতিবন্ধী কেউ বাদ নেই। পার্থক্য নেই কোনো বয়সের। সব নারীই এখন ধর্ষকদের টার্গেট। ভোট দেওয়ার কারণেও ধর্ষিত হতে হয় এদেশের নারীদের। ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪...। পাঠক এগুলো গাণিতিক বা জ্যামিতিক কোনো সংখ্যা নয়। পত্রিকায় প্রকাশিত ধর্ষিতাদের বয়স। সামরিক-বেসামরিক মানুষের পাশাপাশি পিতৃতুল্য শিক্ষকরাও ধর্ষক হিসেবে নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। শুনতে খারাপ লাগে বাবাদের নামও আছে এ তালিকায়। দেবর-ভাসুর কেউই বাদ যাচ্ছে না। আমাদের সমাজের এ এক নতুন দর্শন! অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দেশ এখন ধর্ষণের রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়েছে।

ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতি বছরই। সম্প্রতি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে ধর্ষণের ঘটনা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় নব্বই শতাংশের বেশি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয় না। অনেকেই পারিবারিক সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতেও দ্বিধান্বিত হয়। তারপরও যেসব ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে, তাতেই আমরা শিউরে উঠছি। সমাজে ধর্ষণ মহামারী আকার ধারণ করেছে। গত প্রায় এক যুগে ধর্ষণ মামলা হয়েছে আট হাজার। আর বিচার বা সাজা হয়েছে মাত্র ১১০টি মামলার। শতকরা হিসাবে ৩ শতাংশ। এ থেকেই একটি চিত্র পাওয়া যায়, যা দেশের মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা যাচ্ছি কোথায়? শিথিল হয়ে যাচ্ছে সব সামাজিক বন্ধন। বদলে যাচ্ছে মানুষের রুচি, অভ্যাস ও জীবনবোধ। ভোগবাদের চর্চায় আমরা দিশাহারা। বেপরোয়া জীবন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।

দিন দিন মানুষের সভ্যতা ও রুচির যেমন পরিবর্তন হচ্ছে, সেই সঙ্গে ধর্ষণের স্বরূপ প্রকৃতি ও পরিবেশ পরিবর্তিত হচ্ছে এদেশে। আধুনিক (?) পাশ্চাত্যের ভায়োলেন্সের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই এগিয়ে চলছে ধর্ষণসংস্কৃতি। এখন ধর্ষণ করা হয় স্বামীর সামনে স্ত্রীকে। পিতার সামনে কন্যাকে। কখনো ভাই-বোন, মা-বাবার হাত বেঁধে তাদের সামনে। কখনোবা পালাক্রমে রাতভর। ইয়াবা খাইয়ে ধর্ষণ। দিনের পর দিন আটকে রেখে ধর্ষণ। ধর্ষিতার মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয় যাতে চিৎকার করতে না পারে। ধর্ষণের পর পুড়িয়ে ফেলা হয় ধর্ষিতার পরিধেয় কাপড় আলামত নষ্ট করার জন্য।  ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করা হয় এবং হুমকি দেওয়া হয় মুখ খুললে সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার। আগুনে পুড়িয়ে, গলা টিপে বা গলা কেটে হত্যা করা হয় ধর্ষিতাকে। ধর্ষণের সাক্ষীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ধর্ষণের পর বিবস্ত্র করে গোপন অঙ্গের ভেতর বাটা মরিচ ও ফ্যান কচুর ডাঁটা ঢোকানো হয়। এ অবস্থায় যাদের আকুতি ধর্ষকদের কাছে মনজুর হয়, তারা প্রাণে বেঁচে যায়। এ যেন হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর নির্যাতনকেও হার মানিয়েছে। নারীর আর্তনাদে খোদার আরশ কেঁপেছে তবু পিশাচ ধর্ষকদের হূদয় টলেনি। তখন মনে পড়ে শবমেহেরের করুণ কাহিনি। এভাবেই চলছে। চলবে... (?)

দেশ আজ ধর্ষণের জন্য উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে। যৌনক্ষুধায় এ ভূমি গদ্যময়। এদেশের অনেক মানুষ সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলারাম খেলে যা’ উপন্যাসের নায়কের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে। বিশ শতকের আধুনিক সভ্যতার যুগে আমরা প্রাগৈতিহাসিক গল্পের মাধ্যমে ভিখু নামক চরিত্রের কথা জানতে পেরেছি। ভিখুদের সংখ্যা এখন অনেক। গল্পের ভিখু পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতো। আর একুশ শতকের ভিখুরা পুলিশের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে ঘুরে বেড়ায় ধর্ষক সেঞ্চুরিয়ান মানিকের যোগ্য উত্তসূরি হয়ে। ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘আমাদের লজ্জা ও বেদনার বিষয় যে বাংলাদেশে গণধর্ষণ হচ্ছে। আজকের বাংলাদেশে যে হারে ধর্ষণ হচ্ছে তা ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। সংঘবদ্ধ গণধর্ষণ হচ্ছে। নারীদের ধর্ষণ করে হত্যা করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদাররা এসব করেছিল। রূপাকে একা পেয়ে বাসে ধর্ষণ করে মুরগির মতো গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। এটা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ না। এই বাংলাদেশকে আমরা চিনি না। এই বাংলাদেশ পুঁজিবাদী বাংলাদেশ।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ১৮ নভেম্বর ২০১৭)

এদেশের নারীদের জন্য নিজের বাড়িও আজ নিরাপদ নয়। বছর কয়েক আগে যৌন সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধকল্পে ঢাকা জেলার ধামরাই থানার ডউটিয়া গ্রামের মেয়েরা বালিশের নিচে দা-বঁটি রেখে রাত কাটাতো আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায়। আধুনিক বাংলাদেশে কোথাও নারীদের নিরাপত্তা নেই। একুশ শতকের শুরুতে এদেশের নারীরা ধর্ষকদের দ্বারা ভীষণ ভীত। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে নারীরা নিজেদের আর নিরাপদ ভাবতে পারছে না। রক্ষক এখন ভক্ষকের ভূমিকায় সর্বত্র। তানিয়া-সীমাদের মতো অনেকেই এই ভক্ষকদের হাতে সব হারিয়ে জীবন দিয়েছে। দস্তয়ভস্কির উপন্যাসে ধর্ষিত সোনিয়ার ক্রন্দন সমগ্র বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করেছিল। আর এদেশের  জাতির বিবেক বলে পরিচিত মানুষগুলো মুখে কুলুপ এঁটে থাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। সোনিয়া আর তানিয়াদের মধ্যে পার্থক্য অনেক। এ সত্য বাস্তব সত্য থেকেও অধিকতর সত্য।

বুদ্ধিজীবীরা মুখে কুলুপ এঁটে থাকলেও এবার মুখ খুলেছেন সাধারণ জনতা। ভুক্তভোগীরা সামাজিক ট্যাবু ভেঙে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছেন। মূলধারার মিডিয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা সরব। প্রকাশ্যে খুলে বলছেন এফএম রেডিও কিংবা ইউটিউবে সব অত্যাচারের অবমাননা বঞ্চনার কথা। একে একে মুখোশ উন্মোচিত হচ্ছে সমাজের ভদ্রবেশী ক্ষমতাধর চরিত্রগুলোর। বেরিয়ে আসছে এতদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলো। যেগুলো শুনে আমরা শিউরে উঠছি বার বার। অবিশ্বাস্য মনে হলেও ঘটনাগুলো সত্য।

আর এভাবেই দিন দিন ধর্ষণের ব্যাপকতা বাড়ছে। সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে ধর্ষণ। গত এক দশকে বেড়েছে ভয়াবহভাবে। অনেকের দাবি, ধর্ষকদেরও জিরো টলারেন্সের আওতায় আনতে হবে। দমন করতে হবে এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারের নামে। হারকিউলিস নিজ হাতে আইন তুলে নিয়েছে। ধর্ষকদের মেরে গলায় চিরকুট ঝুলিয়ে দিচ্ছে। ধর্ষকদের যমদূত হারকিউলিস দিয়ে এ ধরনের সমস্যার সমাধান হবে না। আসলে এর জন্য প্রয়োজন আইন আদালতের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সে ধারাবাহিকতা বিরতিহীনভাবে চলমান রাখা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এবং সামাজিকভাবেই ধর্ষকদের প্রতিরোধ করতে হবে। তবেই পুরুষের দেশ নারীরও হবে। 

আমাদের চৈতন্য কবে জাগবে? নারী নিরাপদে চলাচল করতে না পারলে এ দেশকে সভ্য দেশ বলা যাবে না। নারী বা মেয়েদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ কি শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে?

 

লেখক : সাংবাদিক ও রম্যলেখক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads