• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
নাটকীয় মোড় নিচ্ছে ভেনিজুয়েলার সঙ্কট

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

নাটকীয় মোড় নিচ্ছে ভেনিজুয়েলার সঙ্কট

  • অলোক আচার্য
  • প্রকাশিত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ভেনিজুয়েলার পরিণতি গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে পারে কি-না তা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা চলছে। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতিতে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে যে দেশগুলো গৃহযুদ্ধের কারণে বিপর্যস্ত, সেসব দেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে একথা অনুমান করা যায়। ভেনিজুয়েলায় রাজনৈতিক সঙ্কট দীর্ঘ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে সবচেয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট যাচ্ছে। এই অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভেনিজুয়েলা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত মাদুরো এবং গুয়াইদোকে সমর্থনকারী কোনো দেশ সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিতর্কিত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা মাদুরো এরই মধ্যে বর্তমান সঙ্কট গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মাদুরোকে অন্তর্বর্তী নির্বাচনের সময় ঘোষণার কথা জানালেও মাদুরো তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখন আছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো দেশগুলো। অপরদিকে রাশিয়া, তুরস্ক ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলো সমর্থন করছে মাদুরোকে। ভেনিজুয়েলাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে নতুন বিষয় নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিচ্ছে। দৃশ্যত পরাশক্তিগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। ভেনিজুয়েলার ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে পক্ষ-বিপক্ষ জোটগুলোর মধ্যে বেশ উত্তেজনা শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় মাদুরো যে নাখোশ তা তার বক্তব্যে বোঝা যায়। মাদুরো যুক্তরাষ্ট্র ক্যু করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রবল সমালোচনা ও নিন্দা করেছেন। হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর দেশটিতে ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসেন নিকোলাস মাদুরো। কিন্তু গত বছরের নির্বাচনে মাদুরোর বিজয় নিয়েই যত ঝামেলা তৈরি হয়। এই নির্বাচনে মাদুরোর জয় নিয়ে দেশটির জনগণও বিভক্ত। বিরোধীরা তার পদত্যাগের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। দেশটির বিভিন্ন শহরের রাস্তায় রাস্তায় মানুষ বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। এর মধ্যে মাদুরোর সমর্থকরা তার সমর্থনেও রাস্তায় নেমেছেন। এই বিভক্তকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ আমেরিকার রাজনীতিতে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন করেছেন দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা গুয়াইদোকে। ভেনিজুয়েলার পক্ষে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, মেক্সিকো, বলিভিয়া ও কিউবার মতো দেশগুলো। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে ব্রাজিল, কানাডা, কলম্বিয়া, চিলি, পেরু, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, কোস্টারিকা, গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস ও পানামা। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকাকে ভালো চোখে দেখছে না। একই দৃষ্টিভঙ্গি চীনেরও। দেশের এই সঙ্কটকাল মাদুরো কীভাবে সামাল দেন তা দেখার বিষয়। গুয়াইদো এত সহজে নিজের অবস্থান বদলাবেন বলেও মনে হয় না।

এই সঙ্কটের মধ্যে ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক অবস্থা সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে হয়। কারণ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অর্থনৈতিক সঙ্কটে ফেলার পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছে। এদিকে ভেনিজুয়েলায় চলা সঙ্কটের মধ্যেই জাতিসংঘ বর্তমান পরিস্থিতির তদন্ত দাবি করেছে। ভেনিজুয়েলায় বর্তমান অবস্থায় এক দেশে দুই প্রেসিডেন্ট অবস্থান করছেন। একজন রয়েছেন বিতর্কিত এক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে; অন্যদিকে আরেকজন স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করার চেষ্টা করছেন।  ভেনিজুয়েলার মতো বর্তমান সঙ্কটপূর্ণ অবস্থার ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় দেশে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা থেকে যায়। এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান যত দ্রুত হয়, ততই দেশের জন্য মঙ্গল। তবে ঘটনার পক্ষ এবং বিপক্ষ শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। মাদুরো এবং গুয়াইদো উভয় নেতাই বহির্বিশ্বের জোরালো সমর্থন পাচ্ছেন। তাই কেউ একজন নিজের অবস্থান ছেড়ে দেবেন বলেও মনে হয় না। তাছাড়া দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ভ্লাদিমির পাদ্রিনো এবং আটজন জেনারেল মাদুরোর প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। এতে দেশটিতে সামরিক ক্ষেত্রে মাদুরোর শক্ত অবস্থান রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

গত বছরের মে মাসে নির্বাচন হওয়ার পর ১০ জানুয়ারি মাদুরো দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নেন। যদিও ওই নির্বাচন কারচুপির অভিযোগ তুলে বিরোধী দল বয়কট করে। আশার কথা হলো, নিকোলাস মাদুরো দেশটিতে চলমান সঙ্কট নিরসনে বিরোধী নেতা গুয়াইদোকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে গুয়াইদো সে প্রস্তাবে এখনো সাড়া দেননি। তিনি এ আলোচনার প্রস্তাবকে ভুয়া আলোচনা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর পরিবর্তে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি জানান, যাতে একজন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন। বিশ্লেষকরাও মাদুরোর এই আলোচনার প্রস্তাবকে সময়ক্ষেপণ বলছেন। নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে আরো বড় সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও আলোচনায় বসা ছাড়া ভেনিজুয়েলায় রাতারাতি কোনো পরিবর্তন আসবে কি-না সন্দেহ। মে মাসের নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ওঠার পর থেকেই যে উত্তেজনা চলছে, তাতে ভেনিজুয়েলার অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি মার্কিন ইউনিট সিটগো পেট্রোলিয়ামের নতুন বোর্ড গঠনের প্রচেষ্টা করছেন গুয়াইদো। এই কোম্পানির আয় নিজের কাছেই রাখার পরিকল্পনা করছেন তিনি। এতে সায় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে স্পেন, ফ্রান্স ও জার্মানি। তা না হলে তারাও গুয়াইদোকেই অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতির কথা জানিয়েছে। সবকিছু পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, ভেনিজুয়েলার চলমান সমস্যা খুব দ্রুত সমাধান হচ্ছে বলে মনে হয় না। মাদুরো দ্রুতই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে সম্মত না হলে সমস্যা চলতেই থাকবে। কারণ আলোচনায় গুয়াইদো আগ্রহী নয়। আর মাদুরোও রাস্তা ছাড়বেন বলে মনে হয় না। কারণ তার পক্ষেও রয়েছে বড় বড় সব পরাশক্তি। মোট কথা, মাদুরোকে নিয়ে এখন বিশ্ব দুভাগে বিভক্ত। তবে ভেনিজুয়েলায় গৃহযুদ্ধের কোনো অবস্থা তৈরি হবে কি-না তা এখনই জোর দিয়ে বলা যায় না। কিন্তু কোনো দেশ সামরিক পদক্ষেপের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে সে পরিস্থিতি তৈরি হতে সময়ও লাগবে না। দেশের জনগণ আর যা-ই হোক, বাইরের দেশের সামরিক হস্তক্ষেপ কোনোমতেই মেনে নেবে না। আবার নিজ প্রার্থীকেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চাইবে। তবে সহসাই সে অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। কারণ মাদুরো সমস্যা সমাধানে গুয়াইদোকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। যদিও তিনি রাজি হননি। তবে সেই আলোচনা যে আর হবে না এমন নয়। দেশের স্বার্থ নিশ্চয়ই সবাই আগে বিবেচনা করবেন। দেশকে গৃহযুদ্ধের পথে ঠেলে দেবেন না।

 

 লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads