• শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads

সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সঙ্কট

প্রত্যাবাসন জরুরি

  • প্রকাশিত ১৫ মার্চ ২০১৯

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লাখো ভয়ার্ত ও বিপন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় বাংলাদেশের সীমান্তে, যাদের মধ্যে ৬০ শতাংশই ছিল শিশু। নারী ও বয়স্ক মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না। মিয়ানমার সেনাদের হিংস্রতা ও নৃশংসতার শিকার হয়ে তারা জীবন বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এ খবর বিশ্ব মিডিয়ায় মানবিক বিষয় হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পায়। শুধু মুসলমান হিসেবেই নয়, মানুষ হিসেবে তাদের পাশে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। এ ঘটনায় বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছে মানবতার নজির স্থাপন করে প্রশংসা অর্জন করে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সহযোগিতার হাত বাড়ায়। বাংলাদেশ স্বল্প সময়ের মধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে বিরল নজির সৃষ্টি করেছে।

মিয়ানমারের জন্মভিটা থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে নন্দিত হলেও একই স্থানে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা সব মিলিয়ে দশ লক্ষাধিক মানুষের চাপ বাংলাদেশের ওপর বড় বোঝা হিসেবে আরোপিত হয়। জন্ম নেয় আরো অনেক শিশু। আশ্রিত রোহিঙ্গারা পাহাড়ের গাছ কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করে। সব মিলিয়ে অর্থনীতি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি দেখা দেয় নিরাপত্তার সঙ্কট।

এরই মধ্যে সরকার নোয়াখালীর ভাসানচরে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বাদ সেধেছে স্বয়ং নোয়াখালীবাসী। তাদের মতে, এই বিপুল রোহিঙ্গা শরণার্থীকে এ অঞ্চলে বসবাসের সুযোগ দিলে এ জনপদ ধ্বংস হবে। ইয়াবা, সন্ত্রাস আর মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে তাদের এ শান্তির জনারণ্য। তাদের এ যুক্তিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও চলে না। কেননা অতীতে দেখা গেছে, অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে যেতে সক্ষম হয়। আবার মাদক ব্যবসার মতো বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক কার্যক্রমেও জড়িয়ে পড়েছে। ফলে সমাজে খুন, রাহাজানি, সন্ত্রাস বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

বর্তমানে এই ১১ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত ৩০টি ক্যাম্পে। এই অসহায় শরণার্থী মানুষগুলো শুধু একটু ছাদহীন আশ্রয় পেয়েছে। যেখানে তাদের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসার মতো অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে যুদ্ধ করতে হবে এই পরবাসেও। আর তার জন্য প্রয়োজন একটি কর্মসংস্থানের। সেই লক্ষ্যপূরণে স্থানীয় দালালদের প্ররোচনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে শুরুও করেছে তারা। তার প্রমাণও মিলেছে অতীতে। বিগত সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে ৫৮ হাজার ৩৬১ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে ক্যাম্পে পাঠিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে ধরা পড়েছে ৫৩৬ দালাল। সুতরাং শুরু থেকেই এ ব্যাপারে সতর্ক ও সজাগ না থাকলে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। বিভিন্ন সময়ে সংঘাতের কারণে যারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তারা যদি চিহ্নিত ও তালিকাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা সামগ্রিক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সঙ্কট নিরসনে সহায়ক হবে।

এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় গড়িয়ে ২০১৯ সালের যাত্রা শুরু হলেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের দৃশ্যত কোনো উদ্যোগ ও আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যেতে হবে। অন্যত্র নয়, বরং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনই জরুরি। একমাত্র ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনের মাধ্যমে তাদের বৈধ নাগরিক হিসেবে মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে এ সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান সম্ভব। এখন সে লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে বিশ্বনেতাদের।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads