• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫
ads

সম্পাদকীয়

শিক্ষার্থীদের ফেসবুক আসক্তি উদ্বেগজনক

শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা জরুরি 

  • প্রকাশিত ২৪ মার্চ ২০১৯

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে কিশোর-কিশোরীরা বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা বা অন্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। সম্প্রতি বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত ‘রয়্যাল সোসাইটি অব পাবলিক হেলথ’-এর জরিপে দেখা গেছে, স্ন্যাপচ্যাট ও ইনস্টাগ্রাম ১১-১৫ বছরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে হীনমন্যতা ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করছে। অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহার এর অন্যতম কারণ। সাইবার বুলিং বা অনলাইনে অপমান-হয়রানি করার প্রবণতা দিন দিন গুরুতর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিক্ষণের ছেলেমেয়েরা তাদের দৈহিক পরিবর্তন, গড়ন ও বৈশিষ্ট্যে মানসিক অস্থিরতায় ভুগে থাকে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের কাছে একদল মার্কিন শিশুকল্যাণ বিশেষজ্ঞ ‘মেসেঞ্জার কিডস’ নামক শিশুদের মেসেজিং অ্যাপটি বন্ধ করারও আহ্বান জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) গবেষণায়ও দেখা গেছে, একজন শিক্ষার্থী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৩ ঘণ্টা ফেসবুকে কাটান। ফলে শিক্ষার্থীদের এই ফেসবুক আসক্তি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন গবেষকরা। এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার আওতা বাড়ানো আর অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের বিষয়ে আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

আমাদের অভিভাবকদেরও জানতে হবে নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষাই পারে একজন মানুষকে সঠিক ও সুন্দর পথ দেখাতে। প্রকৃত শিক্ষা আমাদের ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, আলো-অন্ধকার, বৈধ-অবৈধ, পাপ-পুণ্য, জানা-অজানা প্রভৃতি অর্জনের শিক্ষা দেয়। আজকের স্মার্ট ফোন, ইন্টারনেট, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সন্তানের যেমন প্রকৃত জ্ঞানার্জনের সুযোগ রয়েছে, তেমনি খারাপ হওয়ার পথও খোলা রয়েছে। সুতরাং সন্তানকে অসুস্থ প্রতিযোগিতার ভেতরে ঠেলে না দিয়ে তাকে নৈতিক শিক্ষায় আদর্শ মানুষ রূপে গড়ে তুলুন। মনে রাখতে হবে, সামাজিক শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার একটি জাতির উন্নতির অন্যতম পূর্বশর্ত। আর এক্ষেত্রে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগের বিকল্প নেই। এজন্য অভিভাবককে সন্তানের প্রতি মনোযোগ ও সময় দেওয়ার পাশাপাশি তার সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

একসময় স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে লাইব্রেরির গুরুত্ব ছিল সীমাহীন। বাঙালি সংস্কৃতির চর্চায় রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী পালন, রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যেত। এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের চিত্তকে পরিশুদ্ধ করত। কিন্তু আজকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজস্ব লাইব্রেরি খুঁজে পাওয়া দুর্লভ, আর ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন হয়ে গেছে নিয়মরক্ষার কাজ। এখন আর স্কুল-কলেজগুলোতে দেয়াল পত্রিকা বা বার্ষিক ম্যাগাজিনও প্রকাশ হতে দেখা যায় না। বিশেষত দালান ভাড়া করে যেসব স্কুল-কলেজের যাত্রা, সেগুলোতে এসবের পরিবর্তে বরং ক্লাস পার্টির নামে বিজাতীয় সংস্কৃতির আধিক্য লক্ষণীয়। সুতরাং একমাত্র পাঠাভ্যাস ও শুদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাই পারে শিক্ষার্থীদের ফেসবুক-টুইটার আসক্তি কমাতে।

বিজ্ঞানের ভালো-মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব পরিবারের, সমাজের এবং রাষ্ট্রের। সেই দায়বদ্ধতা থেকে সম্মিলিতভাবে আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর যথাযথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে। মনে রাখতে হবে, তরুণ ছেলেমেয়েদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। অভিভাবকদের সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনি রাষ্ট্রেরও উচিত একটি নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে সাইবার ক্যাফেগুলোকেও আইনের আওতায় আনা। আজকাল শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ঘরে ঘরে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় স্কুল-কলেজগামী ছেলেমেয়েদের হাতে স্মার্ট ফোন তো নয়ই; বরং তাদের কম্পিউটার নজরদারিতে রাখা অত্যাবশ্যক। আমাদের ভবিষ্যৎ রক্তাক্ত হয়ে গেলে কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই কাজে আসবে না। বিষয়টি গুরুত্বসহ বিবেচনার দাবি রাখে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads