• বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৫
ads
শবেবরাত মুক্তির রজনী

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

শবেবরাত মুক্তির রজনী

  • মুহাম্মদ আবদুল হামিদ
  • প্রকাশিত ২২ এপ্রিল ২০১৯

শবেবরাত একটি মহিমান্বিত রজনী। ‘শব’ অর্থ রাত, আর ‘বারাআতুন’ অর্থ মুক্তি। সুতরাং শবেবরাত অর্থ হলো ‘মুক্তির রাত’। এ রাতে আল্লাহতায়ালা তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন, পাপী-তাপী বান্দাদেরকে উদারচিত্তে ক্ষমা করেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, এজন্য এ রাতকে শবেবরাত বলা হয়। হাদিস শরিফে এ রাতটিকে ‘নিসফে শাবান’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রজনী, তথা ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রী। মুসলিম উম্মাহের কাছে এ রাতটি খুবই গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ।

শাবান মাস হলো বিশেষ মর্যাদাবান। মোবারক মাহে রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে এ মাসটি। রমজানের প্রস্তুতির জন্য এ মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রসুল (সা.) এ মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদত করতেন। অন্যান্য মাসের চেয়ে এ মাসে নফল রোজা বেশি রাখতেন। হজরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেছেন, ‘আমি রসুলকে (সা.) রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা রাখতে দেখিনি। কিন্তু তিনি শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রেখেছেন।’ (সহিহ মুসলিম)

এ মাসের ফযিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান হলো উম্মতের মাস। রসুল (সা.) রজব, শাবান মাসের অত্যধিক গুরুত্ব ও তাৎপর্যের প্রতি লক্ষ রেখে ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শা’বান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদ্বান’ দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন এবং উম্মতকে পড়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। যার অর্থ হচ্ছে, ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে রজব ও শাবানের সকল বরকত দান করুন এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন’। এ মাসে রয়েছে বিশেষ ফজিলতময় শবেবরাত।

বিভিন্ন হাদিসে শবেবরাতের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেন, কোন এক শাবানের অর্ধরাতে রসুলকে (সা.) বিছানায় পাওয়া যাচ্ছিল না। খুঁজে দেখা গেলো তিনি জান্নাতুল বাকিতে কবর জিয়ারত করছেন। (সহিহ মুসলিম) আরেক হাদিসে হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত রসুল (সা.) বলেছেন, যখন অর্ধশাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে ইবাদত করো এবং পরের দিনটিতে রোজা রাখো। কেননা এ রাতে আল্লাহতায়ালা সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিজিক প্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দান করব। কোনো বিপদগ্রস্ত আছে কি? আমি তাকে বিপদমুক্ত করব। আর সুবহে সাদিক পর্যন্ত এ ডাক অব্যাহত থাকে। (ইবনে মাজাহ)

হজরত ইকরিমাসহ (রা.) প্রমুখ তাফসিরবিদের মতে আল কোরআনে সুরায়ে দোখানের প্রথম আয়াতগুলোতে শবেবরাতের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় এ রাতকে ‘লাইলাতুসসফ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং এর বরকতময় হওয়া ও রহমত নাজিল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কেউ কেউ শবেবরাত সম্পর্কিত কিছু হাদিসকে দুর্বল বলে একেবারেই অস্বীকার করে ফেলেন। এটা মোটেই উচিত হবে না। কারণ, একই বিষয়ে একাধিক হাদিস বর্ণিত হলে এর গ্রহণযোগ্যতায় আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় শবেবরাতের বরকত ও ফজিলত বর্ণিত হয়ছে। ঢালাওভাবে সব হাদিসকে দুর্বল বলে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া হাদিসশাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী ফজিলতের হাদিসগুলো দুর্বল হলেও পালনযোগ্য।

মুসলিম উম্মাহর তিনটি স্বর্ণোজ্জ্বল যুগ তথা সাহাবা, তাবেঈন ও তাবেঈ তাবেঈনের যুগেও এ রাতের ফজিলত থেকে উপকৃত হওয়ার বিশেষ গতি ও গুরুত্ব ছিল। সেই যুগের মানুষেরাও এই রাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করেছেন। এ রাতটি বিশেষ ফজিলতময় ও গুরুত্ববহ। তাই এ রাতে দীর্ঘক্ষণ জেগে থাকা ও ইবাদত করা সোওয়াবের ওসিলা হিসেবে গণ্য হবে নিঃসন্দেহে।

শবেবরাত বিশেষ ফজিলতময় হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসলামানগণ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল হন। নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ পাঠ, জিকির-আজকার, তাওবা-ইস্তেগফার করে নিজেদের পাপ পঙ্কিলতা থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করেন এবং তাদের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। অধিক নফল নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত করা, তাসবিহ পড়া, দোয়া করা; এসব ইবাদত এই রাতে করা যায়। কোনো কোনো হাদিসের আলোকে শাবান মাসের পনেরো তারিখ অর্থাৎ, বরাত রজনীর পরের দিন নফল রোজা রাখা অনেক সোয়াবের কাজ।

এই রাতে আরেকটি বিশেষ আমল রয়েছে, যা একটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তা হলো, রসুল (সা.) এই রাতে একবার জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন। যেহেতু রসুল (সা.) জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন এই রাতে, তাই মুসলমানরাও এই রাতে কবরস্থানে যাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। নবী (সা.) থেকে যে কাজটি যেভাবে এবং যে স্তরে প্রমাণিত, সেটাকে সে স্তরে রাখাই বাঞ্ছনীয়। সেই সীমারেখা অতিক্রম করা কিছুতেই উচিত নয়। এই রাতের বিশেষ কোনো ইবাদত ও ইবাদতের বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। নেই নামাজের কোনো নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা, নেই ভিন্ন কোনো পদ্ধতি। এই রাতে যেসব ইবাদত করা হবে সবই নফল ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। আর নফল ইবাদত নীরবে আপন আপন ঘরে একাগ্রচিত্তে করা উত্তম। তবে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত ইবাদতের স্থান হিসেবে মসজিদে সমবেত হয়ে গেলে কোনো আপত্তির কারণ নেই।

এই রাতে যতটুকু ইবাদতের তাওফিক হবে, করে নেওয়া চাই। তবে হালুয়া-রুটি ইত্যাদি পাকানোর যেসব আয়োজন করা হয়, তার সঙ্গে শবেবরাতের ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। তাছাড়া এ রাতকে কেন্দ্র করে অনেকে অজ্ঞতাবশত শয়তানের প্ররোচনায় বিদআতসহ বিভিন্ন প্রকার গোনাহের কাজে লিপ্ত হন। যেমন- ফটকাবাজি, আতশবাজি, আলোকসজ্জা, স্বজনদের বাড়িতে পিঠা বিতরণ, কবরস্থানে পুষ্প অর্পণ, কবরে বাতি জ্বালানো, কবরে গিলাফ বা চাদর টানানো, মাজারে ভক্তি করা, কবরে সেজদা দেওয়া ইত্যাদি। এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। কোন ফযিলত, বরকত তো নয়ই; বরং কুসংস্কার ও গর্হিত গোনাহের কাজ। এসব কুসংস্কার পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। উপাসনায় ধর্মপ্রাণ মুসলামানগণকে সচেতন হতে হবে। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ইবাদত যাতে নিষ্ফল হয়ে না যায়।

লেখক : শিক্ষক, জামেয়া ইসলামিয়া আনওয়ারে মদিনা মাদরাসা, সিলেট

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads