• শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
নদী, পাহাড় এবং ওয়াসার সুপেয় পানি

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

নদী, পাহাড় এবং ওয়াসার সুপেয় পানি

  • সাঈদ চৌধুরী
  • প্রকাশিত ০৫ মে ২০১৯

পানিই জীবন। জীবনের অপর নাম পানি। কে না জানে এ কথাটি। সেই ছেলেবেলা থেকে পানি সম্পর্কে এমন ধারণা আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে আছে। অথচ আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে সেই পানিই কি না হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার কারণ। সুস্থ জীবন ধারণের ক্ষেত্রে এক ফোঁটা নিরাপদ পানির জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের হাপিত্যেশ। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য যারা নিরাপদ পানি সরবরাহ করবে, এ বিষয়ে তাদের ভাবনা আমাদের ছুঁয়ে যেতে পারছে না। তাই তো সুপেয় পানির শরবত খাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল ওয়াসার এমডিকে। যদি সুপেয় পানির ঘাটতি থেকেই যায় আমাদের দেশে, তবে তা সংগ্রহ ও সংরক্ষণেরও নানা উপায় রয়েছে নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে। আমরা কেন সেদিকে নজর দিচ্ছি না, সেটিও ভাবনার বিষয়।

মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। ওয়াসা গ্রাউন্ড লেভেল থেকে পানি তুলে ব্যবহার করছে। অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০ বছর আগে ঢাকায় ‘সারফেস ওয়াটার’ ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। গত শতকের ষাটের দশকে এসে হঠাৎ করেই ‘গ্রাউন্ড ওয়াটার’ ব্যবহার শুরু হলো। এ যেন আমাদের নেশাগ্রস্ত করেছে। এখনো মাটির নিচের পানিই ব্যবহার করছি আমরা। ভূগর্ভস্থ পানির অধিক ব্যবহারে এরই মধ্যে তার ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। যেমন পানিতে আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়ছে। এই আর্সেনিক কিন্তু হাজার বছর ধরে আমাদের মাটিতে ছিল। হুট করে কেন পানিতে ছড়াল তা বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখছেন। আর্সেনিক যেন পানিতে না মেশে সেজন্য বিজ্ঞানীরা উন্নত প্রযুক্তির খোঁজ করছেন। কিন্তু তারপরও আমাদের জীবন ধারণের জন্য যে পানির প্রয়োজন তাকে নিরাপদ রাখতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। কি খাবার পানি, কি স্নানের পানি অথবা রান্নার কাজের পানি— কোনো কিছুই আর জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শতভাগ নিরাপদ থাকছে না।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা অসম্ভব কিছু নয়। জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম আছে। জাতিসংঘও এর স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০০ সালে ওয়ার্ল্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট কনফারেন্সে বাংলাদেশকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আদর্শ দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘের কাছে প্রস্তাব দিলে তারাও সহযোগিতা দেবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে পুকুর ভরাট করার সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের মন্ত্রীপাড়ার পুকুর ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার খাস পুকুর উদ্ধারের চেষ্টা করছে। এসব পুকুর সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের চেয়ে প্রাকৃতিক পানি বিশেষ করে বৃষ্টির পানি ধারণ করা যেতে পারে। বৃষ্টির পানি সবচেয়ে নিরাপদ। পানির অপচয় রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনসচেতনতা। মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়লে পানির পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সর্বোপরি ওয়াসার কর্মীদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

পাহাড় কাটা, পাহাড়ের পাথর উত্তোলন, শঙ্খ নদী দখল ও দূষণ নিয়ে কথা বলছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং। তিনি বলছিলেন আপনারা বলেন পাথর উত্তোলন হচ্ছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, এ পাথর যখন ট্রাকে করে যায় তখন প্রথমে ইউনিয়নের সামনে দিয়ে, পরে পৌরসভা, জেলা শহর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকলের চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে যায়। তখন কেউ দেখে না? জনপ্রতিনিধিরা কি শুধু ভোট পাওয়ার জন্যই এগুলো এড়িয়ে যান? প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কি শুধুমাত্র দুর্নীতিবাজ কিছু মানুষের মন রক্ষার্থেই কাজ করেন? তিনি একপর্যায়ে বলেন, পাথর অবৈধভাবে উত্তোলিত হলেই সংশ্লিষ্ট থানা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জবাব দিতে হবে। পুনর্বাসন প্রকল্পের নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা অনেক রয়েছে। এগুলো থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নদী পরিব্রাজক দল ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে উদ্দেশ করে মন্ত্রী বলেন, আপনারা সবাই মিলে আমাকে বলুন কোন কোন জায়গায় পানি উন্নয়নে, পরিবেশ উন্নয়নে এবং পাহাড়ের উন্নয়নে নতুন নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করা যায়। কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কী ধরনের কাজে বেশি সফলতা আসবে। আমি তাই করব। প্রয়োজনে আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সকলের কাছে যাব। তবুও আমি আমার পাহাড়কে সুন্দর, সবুজ ও নির্মল দেখতে চাই ।

মন্ত্রীর এমন কথা শুনে গতানুগতিক রাজনীতিবিদদের বিপরীত আচরণ আমাকেসহ অনুষ্ঠানের সবাইকে মুগ্ধ করে। তিনি বারবার বলছিলেন, যারা অভিযোগ নেবেন তারাই যদি অভিযোগ করতে চান তার মানে সরাসরি দায় এড়ানো। এ দায় এড়ানো সহ্য করা হবে না। প্রতিটি স্থানে এমন রাজনীতিবিদের খুব বেশি প্রয়োজন। আশা করি পাহাড়ে মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার চেষ্টায় আরো সুন্দর পরিবেশ ফিরে আসবে।

পক্ষান্তরে ওয়াসার এমডির কথাটির কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করতে পারলাম না। তিনি বলেছেন ওয়াসার পানি সম্পূর্ণ সুপেয়। আবার তিনিই বলেছেন তিন প্রকারের পানি তিনি নিজেই পান করেন। ফুটানোর কারণে কোটি কোটি টাকার গ্যাস পুড়ে যায় টিআইবির এমন অভিযোগের বিপরীতে ওয়াসার এমডির এমন কথা আমাদের হতাশায় ডোবায়। একটি সিস্টেমে অনেক ধরনের সমস্যা থাকতে পারে। তার মধ্যে ঢাকার ওয়াসার লাইন, সুয়ারেজের লাইন, ড্রেন লাইন সব একসাথে হওয়ায় কোথাও কোথাও লিকেজ হয়ে সমস্যা সৃষ্টি হতেই পারে আর এর বিপরীতে শতভাগ সুপেয় পানির নিশ্চয়তা কতটুকু গ্রহণযোগ্য তাও ভাবতে হবে।

সিস্টেমের সমস্যা থাকতে পারে এটা স্বীকার করে নিয়ে তার সমাধানের জন্য কাজ করাই যেখানে প্রধান কাজ সেখানে দোষ ঢেকে রাখার মানে হচ্ছে এখানে আর নতুন কোনো কাজ না হওয়া এবং বর্তমান পরিস্থিতির উন্নয়ন না হওয়া। এ বিষয়গুলো এখন নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থায় কোথায় কোথায় ত্রুটি আছে সেগুলো বের করার জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন অন্যান্য দেশের ব্যবস্থাগুলো নিয়ে গবেষণা করা। প্রয়োজন পানির ব্যবহার সীমিত করা। বৃষ্টির পানি বৃহৎ আকারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করা। ওয়াসার সামনের দিনগুলোতে আরো বেশি চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। পাহাড়েও পানির চ্যালেঞ্জ বাড়বে। যারা পাহাড়ে আছেন তারা পানির যথেষ্ট কষ্টে রয়েছেন। বান্দরবানের পর্যটনসমৃদ্ধ শঙ্খ নদীও বর্তমানে দূষণের শিকার, যা পাহাড়িদের একমাত্র সুপেয় পানির উৎস। যেখানে পাহাড়ের মানুষ নদী নিয়ে আক্ষেপের জায়গা দেখছেন, সেখানে ওয়াসার আরো বেশি প্রায়োগিক কাজের জায়গা খুঁজে বের করে তা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। নদীর পানি দ্বিতীয়বার ব্যবহারের পরিকল্পনাকে আরো বেশি করে সামনে আনা প্রয়োজন। ওয়াসার লাইনের লিকেজগুলো শনাক্ত করার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাস্তা খুঁড়ে দেখতে হয়। এতে করে রাস্তার যেমন ক্ষতি হয় তেমনি লাইন মেরামতেও অনেক সময় লেগে যায়। প্রতিটি রাস্তার পাশে বিদ্যুৎ, পানির জন্য আলাদা ড্রেনের মতো করে আর্টিফিসিয়াল স্লাব ব্যবহার করে রাস্তা নির্মাণ করলে সহজেই লিকেজ শনাক্ত করে তা মেরামত করা সম্ভব। এতে জনদুর্ভোগও কম হবে। এ বিষয়েও নগরপরিকল্পনাবিদদের আরো বেশি ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করি।  

নদী পরিব্রাজক দল, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ সকল সংগঠন যারা ভবিষ্যতের পানি নিয়ে, নদী নিয়ে, নাব্যতা নিয়ে, পানির বিশুদ্ধকরণ নিয়ে ভাবছে তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং ওয়াসার সকলের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি পানি ব্যবস্থাপনায় আপনাদের যে সফলতাগুলো আছে তা তুলে ধরার পাশাপাশি সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করুন।

লেখক : সদস্য, উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads